মায়ের খোঁজে আসা ছানাটি এখন মানুষকেই মা ভাবে

সময়ের আলো ডেস্ক

বিবিধ

নাইজেরিয়ার ওকমু ন্যাশনাল পার্কের ঘন অরণ্যে একদিন হঠাৎ দেখা গেল এক অস্বাভাবিক দৃশ্য। একা একা ঘুরে বেড়াচ্ছে একটি হাতিশাবক। পাশে

2026-09-04T05:40:19+00:00
2026-09-04T05:40:19+00:00
 
  শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২০ ভাদ্র ১৪৩৩
শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বিবিধ
মায়ের খোঁজে আসা ছানাটি এখন মানুষকেই মা ভাবে
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৫:৪০ এএম 
নাইজেরিয়ার ওকমু ন্যাশনাল পার্কের ঘন অরণ্যে দেখা মেলে এই হাতিশাবকের। ছবি : ন্যাটজিও.
নাইজেরিয়ার ওকমু ন্যাশনাল পার্কের ঘন অরণ্যে একদিন হঠাৎ দেখা গেল এক অস্বাভাবিক দৃশ্য। একা একা ঘুরে বেড়াচ্ছে একটি হাতিশাবক। পাশে নেই মা, নেই পরিবারের অন্য কোনো সদস্য। মাত্র কয়েক মাস বয়সি সেই শাবক তখনও মায়ের দুধ ছাড়েনি। সেদিন থেকেই শুরু হয় তার বেঁচে থাকার এক অসম্ভব লড়াই।

শাবকটির নাম পরে রাখা হয় আগবাইবর— ইজাও ভাষায় যার অর্থ ‘সাহস’, ‘শক্তি’ বা ‘যে বেঁচে যায়’। আর এই নাম যেন তার জীবনের গল্পেরই প্রতিচ্ছবি।

Advertisement
নভেম্বরের শেষ দিকের এক সকালে ওকমু অয়েল পাম প্লান্টেশনের এক কর্মী দেখতে পান, একটি ছোট হাতি একা ঘুরে বেড়াচ্ছে। প্লান্টেশনটি ওকমু ন্যাশনাল পার্কের সীমানার কাছেই। খবরটি পৌঁছায় পার্কে কাজ করা এএনআই ফাউন্ডেশনের কর্মীদের কাছে। সংস্থাটির প্রধান টুন্ডে মোরাকিনিয়ো প্রথমে যেন বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না—‘হাতিশাবক?’

এর আগে পার্কের কর্মীদের কাজ ছিল মূলত চোরাশিকার ঠেকানো এবং অবৈধ গাছ কাটা বন্ধ করা। এত ছোট একটি হাতিশাবকের দেখভাল করার অভিজ্ঞতা তাদের কারও ছিল না। তবু সামনে তখন একটাই প্রশ্ন— শাবকটিকে কীভাবে বাঁচানো যায়? রেঞ্জাররা দিনের পর দিন ঘন জঙ্গলে তার পরিবারকে খুঁজেছেন। কিন্তু কোনো সন্ধান মেলেনি।

কোথায় তার পরিবার?
আগবাইবর যখন উদ্ধার হয় তখন তার বয়স আনুমানিক আট মাস। সে তখনও মায়ের দুধের ওপর নির্ভরশীল। কীভাবে সে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হলো তা নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। তবে উদ্ধারকারীদের ধারণা, হাতির পাল হয়তো শিকারিদের মুখোমুখি হয়েছিল। বন্দুকের গুলির শব্দ, দা কিংবা লোহার ফাঁদের আতঙ্কে পালটি ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলে ছোট্ট আগবাইবর কোনোভাবে সবার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে।

বন্য পরিবেশে এত কম বয়সি একটি হাতির একা বেঁচে থাকা প্রায় অসম্ভব। খাবার জোগাড়ের পাশাপাশি তাকে চোরাশিকারি ও অন্যান্য বিপদের মুখোমুখি হতে হতো। তাই পরিবারের সন্ধান না পেয়ে শেষ পর্যন্ত তাকে মানুষের তত্ত্বাবধানে নেওয়া হয়।

ছোট্ট হাতিটিকে একটি পিকআপ ট্রাকে করে নিয়ে আসা হয়। তখন তার উচ্চতা ছিল প্রায় একটি গাড়ির টায়ারের সমান। কিন্তু উদ্ধারের পর পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে।

আগবাইবর খুব দুর্বল হয়ে পড়ছিল। খাবার খেতে চাইছিল না, নড়াচড়ার শক্তিও হারাচ্ছিল। অভিজ্ঞ বন্যপ্রাণী চিকিৎসকরা তখন পরামর্শ দিয়েছিলেন, এখনই তাকে কোনো নাম না দিতে— কারণ তাকে বাঁচানো সম্ভব হবে কি না সেটিই তখন অনিশ্চিত।

একপর্যায়ে পরীক্ষায় তার রক্তে শর্করার মাত্রা বিপজ্জনকভাবে কমে যাওয়ার বিষয়টি ধরা পড়ে। কাছের চিকিৎসকদের আনতে প্রায় এক ঘণ্টার পথ পাড়ি দিতে হয়। চিকিৎসকরা তাকে শিরায় তরল ও ডেক্সট্রোজ দেন। পরবর্তী দুদিন প্রায় সারাক্ষণ তার রক্তে শর্করার মাত্রা পরীক্ষা এবং চিকিৎসা সামঞ্জস্য করতে হয়েছে। হাতিশাবকের দেখভালে পরামর্শ দিতে যুক্ত হন জাম্বিয়ায় অনাথ হাতি পরিচর্যায় বিশেষজ্ঞ লিজ ও’ব্রায়েন।

তার ভাষায়, কোনো হাতিশাবক যখন এমনভাবে ‘ভেঙে পড়ে’, তখন সাধারণত ক্লান্তি, মায়ের দুধ হারানো এবং তীব্র মানসিক চাপ— সবকিছু একসঙ্গে কাজ করে। তখন প্রাণীটির যেন দাঁড়ানো, খাওয়া কোনো কিছুরই শক্তি থাকে না।

মানুষই হয়ে উঠল তার পরিবার
বন্য পরিবেশে একটি হাতিশাবক কখনোই সত্যিকার অর্থে একা থাকে না। তার চারপাশে থাকে মা, খালা, বোন কিংবা পালের অন্য সদস্যরা। আগবাইবরের সেই সামাজিক পৃথিবীটি আর ছিল না। তাই মানুষকে শুধু তাকে খাবার দিলেই চলত না; তাকে দিতে হতো নিরাপত্তা, সঙ্গ এবং মানসিক আশ্রয়ও।

পার্কের কর্মীরা পালা করে দিনরাত তার পাশে থাকতেন। রাতে শরীরের তাপমাত্রা ঠিক রাখতে তাকে কম্বলের নিচে শুইয়ে রাখা হতো। তার খাবারের জন্য তৈরি করা হয়েছিল বিশেষ মিশ্রণ— দুধের গুঁড়া, নারকেল, রান্না করা ওটসসহ বিভিন্ন উপাদান দিয়ে। কয়েক সপ্তাহ পর ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করল পরিস্থিতি। আগবাইবর দ্রুত খাবার খেতে শুরু করল। খেলাধুলা করতে লাগল। তার মধ্যে ফিরে এলো আত্মবিশ্বাস। তখনই কর্মীরা বুঝতে পারলেন— এই ছোট্ট হাতিটি বাঁচতে চায়। আর তখনই তার নাম রাখা হলো আগবাইবর।

এখন সে দুষ্টু, খেলুড়ে এক ‘শিশু’
উদ্ধারের কয়েক মাস পর আগবাইবর আর সেই দুর্বল শাবকটি নেই। প্রায় ১৭ মাস বয়সে সে এখন অনেক বেশি চঞ্চল। তার উচ্চতা প্রায় তিন ফুট এবং দৈর্ঘ্য সাড়ে চার ফুট। তার ওজন মাপার মতো বড় কোনো যন্ত্রও পার্ক কর্মীদের কাছে নেই।

কাদা দিয়ে নিজের শরীর ঢেকে ফেলা তার প্রিয় কাজগুলোর একটি। শুঁড় দিয়ে পিঠে কাদা ছুড়ে শরীর ঠান্ডা করে সে।

আর পানির কল? সেটিও তার প্রিয় খেলনা। কল থেকে পানি বের করার কৌশল সে খুব দ্রুত শিখে ফেলেছিল। এমনকি পানি ছিটিয়ে নিজের শরীর ভেজাতে গিয়ে কল ভেঙেও ফেলত। বারবার মেরামত করার পর একসময় কর্মীরা হাল ছেড়ে দিয়েছেন! তার প্রধান পরিচর্যাকারী জোশুয়া আরিবাসোয়ের সঙ্গে আগবাইবরের সম্পর্কটিও বেশ গভীর। আগবাইবর তাকে দেখলেই আনন্দে দৌড়ে আসে— এক পা কিছুটা টেনে, মাথা উঁচু করে, শুঁড় পেছনে সরিয়ে, কান দুদিকে মেলে।

কখনো কখনো সে এখনও জোশুয়ার কোলে মাথা রাখতে চায়। কিন্তু এখন সে এতটাই বড় ও ভারী হয়ে গেছে যে সেটি আর সম্ভব নয়।

‘তার মা এখন একজন ৩০ বছরের নাইজেরীয় মানুষ’
আগবাইবরের সঙ্গে পরিচর্যাকারীদের এই গভীর সম্পর্কের কারণও স্বাভাবিক। বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ লিজ ও’ব্রায়েনের কথায়, একটি হাতিশাবকের এমন একজনকে দরকার, যার কাছে ভয় পেলে সে ছুটে যেতে পারে। আগবাইবরের সেই মানুষটি এখন তার পরিচর্যাকারী।

অর্থাৎ যে শাবকটির দৌড়ে যাওয়ার কথা ছিল তার মায়ের কাছে, সে এখন দৌড়ে যায় একজন মানুষের কাছে।

লক্ষ্য মানুষ নয়, আবার হাতিদের কাছে ফেরা
তবে আগবাইবরকে সারাজীবন মানুষের কাছে রেখে দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই। বরং উল্টোটা। তার সুস্থ হয়ে উঠার পর তাকে ধীরে ধীরে বন্য পরিবেশে ফিরিয়ে দেওয়াই উদ্ধারকারীদের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য।

ফরেস্ট এলিফ্যান্ট সাধারণত দুই থেকে তিন বছর বয়সের মধ্যে মায়ের দুধ ছাড়ে। সেই সময় পার হওয়ার পর আগবাইবরকে ধীরে ধীরে মানুষের ওপর নির্ভরশীলতা থেকে বের করে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

নতুন একটি বড় ঘেরা প্রাকৃতিক আবাসে তাকে নেওয়া হয়েছে। সেখানে সে জঙ্গলে হাঁটতে পারবে, স্থানীয় গাছপালা খেতে পারবে এবং ভবিষ্যতে অন্য বন্য হাতির সংস্পর্শেও আসতে পারে। পরিকল্পনাটি ধীরে ধীরে এগোবে।

আগবাইবর যখন দুধের মিশ্রণ ছেড়ে শক্ত খাবারে অভ্যস্ত হবে, তখন বোতলে করে খাবার দেওয়া বন্ধ করা হবে। মানুষের সঙ্গে যোগাযোগও কমিয়ে দেওয়া হবে। একসময় আশা করা হচ্ছে, সে নিজে থেকেই মানুষের কাছে ফিরে আসার প্রবণতা কমিয়ে দেবে। উদ্ধারকারীদের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন— আগবাইবর যেন একদিন মানুষকে ভুলে গিয়ে আবার হাতিদের একজন হয়ে ওঠে।

আগবাইবরের গল্প আসলে শুধু একটি অনাথ হাতির গল্প নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নাইজেরিয়ার বিরল ফরেস্ট এলিফ্যান্টদের ভবিষ্যৎ। নাইজেরিয়ায় বর্তমানে আনুমানিক ৪০০টি ফরেস্ট এলিফ্যান্ট রয়েছে। ওকমু ন্যাশনাল পার্কে আছে মাত্র ৩০ থেকে ৪০টি। এই হাতিরা বিপন্ন এবং তাদের প্রাকৃতিক আবাসস্থলও দ্রুত সংকুচিত হচ্ছে।

৮০ বর্গমাইলেরও কম আয়তনের ওকমু ন্যাশনাল পার্ক কৃষিজমি ও নগরায়ণের বিস্তৃত এলাকার মধ্যে এক টুকরো বনভূমির মতো টিকে আছে। অবৈধভাবে জমি পরিষ্কার করে কৃষিকাজ, বন উজাড় এবং বুশমিটের জন্য চোরাশিকার— সবই হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে এই অরণ্যের জন্য। তাই আগবাইবরকে বাঁচানোর পাশাপাশি তার আবাসস্থলটিকেও বাঁচাতে হবে। কারণ বনই যদি না থাকে, তা হলে উদ্ধার করা হাতিটিকে শেষ পর্যন্ত কোথায় ছেড়ে দেওয়া হবে?

শেষ পর্যন্ত বিদায় দিতেই হবে
আজ আগবাইবর মানুষের যতটা কাছের, ভবিষ্যতে তাকে ততটাই দূরে যেতে হবে। এই ছোট্ট হাতিটিকে যারা রাতের পর রাত জেগে দেখেছেন, অসুস্থ অবস্থায় পাশে থেকেছেন, কম্বলের নিচে শুইয়ে দিয়েছেন, বোতলে দুধ খাইয়েছেন— তাদের কাছ থেকে একদিন তাকে বিদায় নিতে হবে। সেই দিনটি আনন্দেরও হবে, আবার কষ্টেরও। কারণ একজন পরিচর্যাকারীর কাছে আগবাইবর তখন আর শুধু একটি বন্যপ্রাণী থাকবে না, সে হয়ে উঠবে পরিবারের একজন।

কিন্তু ভালোবাসার সবচেয়ে কঠিন রূপটি হয়তো এটাই— যাকে ভালোবাসেন, একদিন তাকে নিজের কাছ থেকে দূরে যেতে দিতে হয়, যদি সেটিই তার সত্যিকারের মুক্তি হয়। আগবাইবরের ক্ষেত্রেও সেই দিন আসবে।

তখন হয়তো সে আর মানুষের কাছে ছুটে আসবে না। হয়তো জঙ্গলের গভীরে অন্য হাতিদের সঙ্গে হাঁটবে। হয়তো কোনো একদিন তার নিজের পরিবারের সন্ধানও মিলবে। তার পরিচর্যাকারীদের আশা, তার পরিবার কোথাও না কোথাও এখনও আছে।

আর আগবাইবর— নামটির মতোই হয়তো সাহস, শক্তি আর বেঁচে থাকার প্রতীক হয়ে নিজের প্রজাতির মধ্যেই ফিরে যাবে।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/আতা
  বিষয়:   নাইজেরিয়া  ওকমু ন্যাশনাল পার্ক  অরণ্য  হাতিশাবক  মা  পরিবার  শাবক  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
বিবিধ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: