ফজলুল হক মহিলা কলেজ সভাপতির যত অনিয়ম

সাব্বির আহমেদ

শিক্ষা

রাজধানীর গেন্ডারিয়ার ঐতিহ্যবাহী ফজলুল হক মহিলা কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতি অধ্যাপক হাফিজ মুজতবা রিজা আহমদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, জাতীয়বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রজ্ঞাপন

2026-09-05T02:35:24+00:00
2026-09-05T02:35:24+00:00
 
  মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬,
৪ কার্তিক ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬
শিক্ষা
ফজলুল হক মহিলা কলেজ সভাপতির যত অনিয়ম
সাব্বির আহমেদ
প্রকাশ: শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ২:৩৫ এএম 
ছবি : সংগৃহীত
রাজধানীর গেন্ডারিয়ার ঐতিহ্যবাহী ফজলুল হক মহিলা কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতি অধ্যাপক হাফিজ মুজতবা রিজা আহমদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রজ্ঞাপন লঙ্ঘন করে আর্থিক সুবিধা গ্রহণ এবং দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত সাবেক অধ্যক্ষকে তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই আর্থিক দায়মুক্তি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। 

সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তিনি বিভিন্ন প্রশাসনিক অনিয়ম ও অনৈতিকভাবে আর্থিক সুবিধা গ্রহণে জড়িয়ে পড়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি বিএনপির গেন্ডারিয়া থানা শাখার আহ্বায়ক ও সাবেক কাউন্সিলর আব্দুল কাদির জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কাছে দেওয়া একাধিক লিখিত অভিযোগে এসব অনিয়মের বিষয় তুলে ধরেছেন।

জানা গেছে, কলেজের সদ্যবিদায়ি সাবেক অধ্যক্ষ দিলারা খানমের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা (সিআর মামলা নং ২৫/২৫), স্বাক্ষর জালিয়াতি, অর্থ আত্মসাৎ এবং জালিয়াতির মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগসহ একাধিক ফৌজদারি মামলা (সিআর মামলা নং ১৭২/২৪) বিচারাধীন। এ ছাড়া ভুয়া ছাত্রী দেখিয়ে তিন শিক্ষককে (সমীর সিকদার, ইসরাত জাহান নূপুর ও গায়ত্রী ভট্টাচার্য) নিয়মবহির্ভূতভাবে এমপিওভুক্ত করা, হিতৈষী সদস্য ইঞ্জিনিয়ার আব্দুর রশিদকে বাদ দিয়ে অন্য সদস্য নিয়োগ এবং তার জমা দেওয়া ৫০ হাজার টাকা কলেজ তহবিলে না দেখানোর অভিযোগও রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এস এম মান্নানের স্বাক্ষর জালিয়াতি করে সাবেক অধ্যক্ষ নজরুল ইসলামকে সাময়িক বহিষ্কারের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

এসব অনিয়ম প্রকাশ্যে আসার পর দিলারা খানম দায়িত্ব ছেড়ে আত্মগোপনে যান। বেসরকারি ডিগ্রি কলেজ শিক্ষকদের চাকরির শর্তাবলি রেগুলেশন, ১৯৯৪-এর ১৩ ধারা অনুযায়ী স্থায়ী শিক্ষক পদত্যাগ করলে দুই মাস আগে নোটিস দিয়ে কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানাতে হবে, অন্যথায় সমপরিমাণ বেতন কর্তনের বিধান রয়েছে। কিন্তু সেই বিধান অনুসরণ না করেই তার পদত্যাগপত্র গ্রহণ করা হয় এবং তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই তার বকেয়া বেতন, প্রভিডেন্ট ফান্ড (পিএফ) ও গ্র্যাচুইটির অর্থ পরিশোধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যাপক হাফিজ মুজতবা রিজা আহমদ সময়ের আলোকে বলেন, ‘সবকিছু নিয়ম মেনেই হয়েছে। নিয়মের বাইরে কিছু হয়নি।’ তিনি দাবি করেন, ‘দিলারা খানমের সঙ্গে সমঝোতা হয়েছিল। তিনি সমঝোতার কাগজে স্বাক্ষরও করেছেন। আমরা রেজুলেশনের মাধ্যমে তার পাওনা অর্থ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। কিন্তু পরে তিনি আর যোগাযোগ করেননি কিংবা টাকা নিতেও আসেননি।’

দুই মাসের নোটিস ও বেতন কর্তনের বিধান সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি সংক্ষিপ্ত জবাবে বলেন, ‘এগুলো নিয়মমতোই হয়েছে।’

কলেজের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আব্দুল ওয়াহাব সময়ের আলোকে বলেন, ‘আমি দায়িত্ব নেওয়ার আগে এসব ঘটনা ঘটেছে। যিনি তাকে অব্যাহতি দিয়েছেন, তিনি নিশ্চয়ই নিয়ম জেনেই দিয়েছেন।’

সভাপতি হিসেবে আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব পাওয়ার আগেই অনুষ্ঠিত এইচএসসি পরীক্ষার কেন্দ্র ফি থেকে তিনি ২০ হাজার টাকা গ্রহণ করেন। এই মর্মে কলেজের একটি দাফতরিক নথির ৮ নম্বর ক্রমিকে তার নাম রয়েছে, যেটি সময়ের আলোর হাতে এসেছে। 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যাপক রিজা আহমদ বলেন, ‘আপনার কাছে যদি নথি থাকে, তা হলে নথি দেখুন। কেন দেওয়া হয়েছে, সেটা কলেজ কর্তৃপক্ষকে জিগ্যেস করুন।’ 

ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আব্দুল ওয়াহাব বলেন, ‘তখনকার পরিচালনা পর্ষদ এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। রেজুলেশন ছিল কি না, আমি নিশ্চিত নই।’


নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও সিটিং অ্যালাউন্স গ্রহণ : জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সুস্পষ্ট নির্দেশনা অনুযায়ী গভর্নিং বডির সভাপতি বা সদস্যদের সিটিং অ্যালাউন্স নেওয়ার সুযোগ না থাকলেও অধ্যাপক রিজা আহমদ প্রতিটি সভা থেকে ১৫ হাজার টাকা করে এই অ্যালাউন্স গ্রহণ করেন। এ ছাড়া কলেজে যাতায়াত ও আপ্যায়নবাবদও অতিরিক্ত অর্থ নেন বলে অভিযোগ রয়েছে। 

এ বিষয়ে অধ্যাপক রিজা আহমদ বলেন, ‘আমি ডিমান্ড করে নিইনি। কলেজ থেকে দেওয়া হয়েছে। কলেজ চাইলে দিতে পারে। এ ধরনের ঘটনা শুধু এই কলেজে নয়, অন্য অনেক কলেজেও হচ্ছে।’

ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আব্দুল ওয়াহাব বলেন, সভাপতি হওয়ার সময় যে রেজুলেশন হয়েছিল, সেটার ভিত্তিতেই সিটিং অ্যালাউন্স দেওয়া হয়েছে।

ঝুলে আছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের তদন্ত : সভাপতি ও সাবেক অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে আনীত এসব অভিযোগের ভিত্তিতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ২০২৫ সালের ৯ অক্টোবর তৎকালীন প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড. মো. নূরুল ইসলামকে এক সদস্যের তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেয়। তবে দীর্ঘসময় পার হলেও তদন্তে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি।

২০২৫ সালের ১১ মার্চ সভাপতি হিসেবে মনোনীত হওয়ার পরও তিনি পূর্ণাঙ্গ গভর্নিং বডি গঠন করেননি। কলেজের শিক্ষকদের দাবি, সাবেক অধ্যক্ষের কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে তিনি নিজের সভাপতির মেয়াদ বারবার বাড়িয়ে নিয়েছেন।

ফৌজদারি মামলার আসামি ও জালিয়াতির অভিযোগে অভিযুক্ত অশোক কুমার সাহা ও মমতাজ উদ্দিনের বকেয়া অর্থ পরিশোধ করা হলেও, বৈধভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষক কামরুজ্জামান সিকদারকে কলেজে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। ওই শিক্ষকের দাবি, সভাপতিকে অনৈতিক আর্থিক সুবিধা দিতে রাজি না হওয়ায় তাকে কলেজের কার্যক্রম থেকে দূরে রাখা হয়েছে।

এ বিষয়ে ভুক্তভোগী সহকারী শিক্ষক কামরুজ্জামান সময়ের আলোকে বলেন, তিনি নিয়োগ পরীক্ষায় মেধাতালিকায় প্রথম স্থান অর্জন করে কলেজে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু পরে রাজনৈতিক কারণে তার দায়িত্ব পালনে বাধা সৃষ্টি করা হয়।

তিনি জানান, বিষয়টি সমাধানের জন্য তিনি গভর্নিং বডির সভাপতির কাছে ৮ থেকে ১০ বার লিখিত আবেদন জমা দিলেও কোনো আবেদনের গ্রহণপত্র (রিসিভ কপি) তাকে দেওয়া হয়নি। এমনকি তার বিষয়টি গভর্নিং বডির কোনো সভার এজেন্ডাতেও তোলা হয়নি।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বক্তব্য : জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এস এম আমানুল্লাহ সময়ের আলোকে জানান, তিনি এই ব্যাপারে অবগত না। তবে এ ধরনের ঘটনার লিখিত অভিযোগ এলে সে ব্যাপারে বিধি অনুসারে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর ভবিষ্যতেও এই ধরনের কাজ বা অভিযোগকে বরদাস্ত করবে না জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

সময়ের আলো/এসএকে
  বিষয়:   ফজলুল হক মহিলা কলেজ  সভাপতি  অনিয়ম  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
শিক্ষা- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: