কূটনৈতিক সম্পর্কে অচলাবস্থা যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে হামলা-পাল্টা হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে আবারও ছড়িয়ে পড়েছে উত্তেজনা। ইরানের বিভিন্ন স্থানে যুক্তরাষ্ট্রের বড় ধরনের হামলার

2026-09-05T02:56:56+00:00
2026-09-05T02:56:56+00:00
 
  শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২১ ভাদ্র ১৪৩৩
শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আন্তর্জাতিক
কূটনৈতিক সম্পর্কে অচলাবস্থা যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ২:৫৬ এএম 
ছবি : সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে হামলা-পাল্টা হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে আবারও ছড়িয়ে পড়েছে উত্তেজনা। ইরানের বিভিন্ন স্থানে যুক্তরাষ্ট্রের বড় ধরনের হামলার পর পাল্টা জবাবে কুয়েত, বাহরাইন ও ইরাকে মার্কিন সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে তেহরান। 

এর মধ্যেই ইরান আগামী ছয় সপ্তাহের মধ্যে আকস্মিক হামলা চালাতে পারে বলে সতর্ক করেছেন তিউনিসিয়ায় দায়িত্ব পালন করা যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত জোয়ে হুড। তার আশঙ্কা, আসন্ন মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের সময়কে হামলার জন্য বেছে নিতে পারে ইরান। এদিকে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি কোনো আলোচনা চলছে না। 

Advertisement
ফলে সামরিক উত্তেজনার পাশাপাশি কূটনৈতিক অচলাবস্থাও আরও গভীর হয়েছে। অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ‘যখন খুশি’ ইরানে আঘাত হানতে প্রস্তুত এবং যুদ্ধ খুব বেশি দিন দীর্ঘ হবে না।

ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুও দাবি করেছেন, ইরানের সরকার আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে দুর্বল এবং তাদের পতন ঘটানোই ইসরাইলের মূল লক্ষ্য। এমন পরিস্থিতিতে সংঘাতের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে উপসাগরীয় দেশগুলো ও জাতিসংঘ। বিশেষ করে বেসামরিক হতাহতের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ জানিয়েছেন জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস।

নির্বাচনের সময় হামলার আশঙ্কা : সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত জোয়ে হুড বলেছেন, আগামী ছয় সপ্তাহের মধ্যে ইরান আকস্মিক কোনো হামলা চালাতে পারে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের সময়টিকে তেহরান সম্ভাব্য হামলার জন্য কাজে লাগাতে পারে বলে মনে করছেন তিনি। শুক্রবার আলজাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে হুড বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্টদের বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলার ইতিহাস রয়েছে ইরানের। নির্বাচনের সময় এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার নজিরও রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। 

হুডের মতে, নভেম্বরের নির্বাচনের সময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল— দুই দেশই রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ সময়ের মধ্য দিয়ে যাবে। এ পরিস্থিতিতে ইরান যদি জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটাতে পারে বা তেলের দাম বাড়িয়ে দিতে পারে, তবে তা মার্কিন প্রশাসনের জন্য বড় রাজনৈতিক চাপ তৈরি করবে। তিনি বলেন, মার্কিন ভোটাররা পেট্রোলের দাম নিয়ে অত্যন্ত সংবেদনশীল। ফলে তেলের বাজারে অস্থিরতা তৈরি করা ইরানের জন্য একটি কৌশলগত সুযোগ হতে পারে।

কূটনৈতিক অচলাবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র-ইরান : এদিকে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি কোনো আলোচনা চলছে না। ফলে সামরিক উত্তেজনার পাশাপাশি কূটনৈতিক অচলাবস্থাও আরও গভীর হয়েছে।


জোয়ে হুড মনে করেন, তৃতীয় কোনো দেশ কার্যকর মধ্যস্থতা নিয়ে এগিয়ে না এলে পরিস্থিতির পরিবর্তন কঠিন হবে। তার মতে, আলোচনার পথ খুলতে হলে মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোকে এমন কোনো উদ্যোগ নিতে হবে, যা দুই পক্ষকেই নতুন করে আলোচনায় বসার সুযোগ তৈরি করে।

তিনি বিশেষভাবে মক্কা চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী দেশগুলোর সম্ভাব্য ভূমিকার কথা উল্লেখ করেছেন। তার প্রস্তাব অনুযায়ী, এসব দেশ উপসাগর ও উত্তর আরব সাগরে নৌশক্তি মোতায়েন করে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। এতে জাহাজে হামলা ঠেকানোর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধের প্রয়োজনীয়তাও কমতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

‘ভয়ে’ ইসরাইলে হামলা করছে না ইরান : এর মধ্যেই ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু দাবি করেছেন, ইরান অন্যান্য দেশের ওপর পাল্টাহামলা চালালেও ইসরাইলের ওপর হামলা করছে না শক্তির ভয়েই। গত বৃহস্পতিবার ইসরাইলি প্রতিরক্ষাবাহিনীর (আইডিএফ) একটি অনুষ্ঠানে নেতানিয়াহু বলেন, ইরান ইসরাইলের সামরিক সক্ষমতা, হামলার তীব্রতা এবং তাদের দৃঢ় সংকল্প সম্পর্কে জানে। ইরানের বর্তমান সরকারের পতন ঘটানোই ইসরাইলের মূল লক্ষ্য বলেও জানান তিনি। 

নেতানিয়াহুর দাবি, ইরান সরকার এখন অত্যন্ত দুর্বল অবস্থায় রয়েছে এবং নিজেদের টিকিয়ে রাখার জন্য লড়াই করছে। তিনি বলেন, ইরানের সরকারের পতন ঘটানো অসম্ভব নয়, বরং ইসরাইল সেই লক্ষ্য পূরণের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।

‘যখন খুশি’ ইরানে হামলার হুমকি ট্রাম্পের : সংঘাতের মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত বুধবার বলেছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ খুব বেশি দিন স্থায়ী হবে না। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী প্রয়োজন হলে ‘যখন খুশি’ ইরানে হামলা চালাতে প্রস্তুত। ট্রাম্পের এমন বক্তব্যের পর নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত আরও বড় আকার ধারণ করতে পারে কি না। সাম্প্রতিক মার্কিন হামলার পর ইরানও পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। 

তেহরান জানিয়েছে, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে থাকা মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। ইরানের দাবি, তাদের জনগণের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার প্রতিক্রিয়াতেই এসব আক্রমণ করা হয়েছে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা আলজাজিরাকে জানিয়েছেন, সবশেষ হামলায় ওই অঞ্চলের কোনো মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের হামলা সফল হয়নি। কুয়েতেও কোনো মার্কিন ঘাঁটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি বলে দাবি করেছেন তিনি।

হতাহত বাড়ছে, নিহতদের মধ্যে রয়েছে নারী-শিশু: সংঘাতের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হয়ে উঠেছে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি। ইরানের স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৩০ আগস্ট থেকে ২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় অন্তত ১৮ জন নিহত এবং ১৪২ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে দুজন নারী ও একজন শিশু রয়েছেন। 

আহতদের মধ্যে ৬১ জন নারী এবং ৪৪ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক। ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হোসেইন কেরমানপোর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, প্রতিটি সংখ্যার পেছনে একজন মানুষ এবং একটি পরিবার রয়েছে। এদিকে ইরান জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় তাদের তিন সামরিক পাইলট ও নৌবাহিনীর ছয় সদস্যও নিহত হয়েছেন।

কুয়েতের ওপর হামলায় বাহরাইনের নিন্দা
ইরানের হামলার ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বাহরাইন। কুয়েতকে লক্ষ্য করে ধারাবাহিক হামলা চালানোর মাধ্যমে ইরান দেশটির সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করছে বলে অভিযোগ করেছে দেশটি। বাহরাইনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, এ ধরনের হামলা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন এবং আঞ্চলিক যুদ্ধ বন্ধের প্রচেষ্টাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। একই সঙ্গে এসব আক্রমণ উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য বড় ধরনের হুমকি তৈরি করছে বলেও সতর্ক করেছে তারা। ইরানকে আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলতে বাধ্য করতে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদকে দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে বাহরাইন।

সংঘাত কোন দিকে যাচ্ছে?
সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত এখন কেবল দুই দেশের মধ্যে সামরিক উত্তেজনায় সীমাবদ্ধ নেই। কুয়েত, বাহরাইন, ইরাকসহ উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোও এর প্রভাবের মুখে পড়ছে। একদিকে ইরানের পাল্টা হামলা, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন হামলার হুমকি— দুইয়ের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের আঞ্চলিক সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইসরাইলের ইরান সরকারের পতন ঘটানোর ঘোষণা এবং আসন্ন মার্কিন নির্বাচনের সময় ইরানের সম্ভাব্য আকস্মিক হামলার বিষয়ে সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সতর্কতা। ফলে আগামী কয়েক সপ্তাহই পরিস্থিতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। কূটনৈতিক উদ্যোগ দ্রুত কার্যকর না হলে সামরিক সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে। আর সেই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় আশঙ্কা— নতুন করে প্রাণ হারাতে পারেন আরও বহু বেসামরিক মানুষ।

সময়ের আলো/এসএকে
  বিষয়:   কূটনৈতিক সম্পর্ক  অচলাবস্থা  যুক্তরাষ্ট্র  ইরান  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: