জামায়াত-এনসিপি স্নায়ুযুদ্ধ

নিজস্ব প্রতিবেদক

রাজনীতি

স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে জামায়াত ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মধ্যে শুরু হওয়া দর কষাকষি এবার নতুন মাত্রা পাচ্ছে।

2026-09-08T00:40:35+00:00
2026-09-08T00:40:50+00:00
 
  মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৪ ভাদ্র ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
রাজনীতি
জামায়াত-এনসিপি স্নায়ুযুদ্ধ
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:৪০ এএম  আপডেট: ০৮.০৯.২০২৬ ১২:৪০ এএম
সময়ের আলো গ্রাফিক
স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে জামায়াত ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মধ্যে শুরু হওয়া দর কষাকষি এবার নতুন মাত্রা পাচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে ঘিরে দুই দলের সম্ভাব্য প্রার্থী ও নির্বাচনী কৌশল নিয়ে তৈরি হয়েছে টানাপোড়েন।

এরই মধ্যে আগের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে ঢাকা দক্ষিণে নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারি এবং উত্তরে আসিফ মাহমুদকে সম্ভাব্য প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এনসিপি। আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না এলেও দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এ নিয়ে আলোচনা ও সম্মতি হয়েছে বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে। তবে এনসিপির প্রার্থী ঘোষণা নিয়ে জামায়াতের মধ্যে কোনো উদ্বেগ বা নতুন করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন দেখছে না দলটি।

Advertisement
এনসিপির একটি সূত্র জানায়, দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা অনানুষ্ঠানিকভাবে ঢাকা দক্ষিণে নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারি এবং উত্তরে আসিফ মাহমুদকে মেয়র নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে বলেছেন। সে অনুযায়ী দুই নেতা সংশ্লিষ্ট এলাকায় ভোটারও হয়েছেন। তবে এখনও কাউকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়নি। এনসিপির এক কেন্দ্রীয় নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘দক্ষিণে নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারি এবং উত্তরে আসিফ মাহমুদের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। দলের সর্বোচ্চ পর্যায়েও এতে সম্মতি রয়েছে। আনুষ্ঠানিক ঘোষণা পরে দেওয়া হবে।’

দলীয় নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাজনৈতিক পরিস্থিতি, মাঠের বাস্তবতা এবং বৃহত্তর নির্বাচনি সমীকরণ বিবেচনায় আগের প্রার্থী তালিকায় পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্ত হয়েছে। একই সঙ্গে জোটের ওপর নির্ভর না করে স্থানীয় নির্বাচনে এককভাবে লড়াইয়ের প্রস্তুতিও নিচ্ছে এনসিপি।

দক্ষিণে পাটোয়ারি, উত্তরে আসিফ : ঢাকা দক্ষিণে নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারিকে সামনে আনার পেছনে তার আগের নির্বাচনি অভিজ্ঞতা ও সাংগঠনিক অবস্থানকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। গত ১২ ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের কাছে পরাজিত হলেও মাত্র কয়েক হাজার ভোটের ব্যবধানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন তিনি। মির্জা আব্বাস ৫৯ হাজার ভোট পেলেও নাসীরুদ্দীন পান প্রায় ৫৪ হাজার ভোট। এনসিপি নেতাদের মতে, ঢাকা-৮ কেন্দ্রিক তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড দক্ষিণ সিটিতে একটি ভিত্তি তৈরি করেছে। ফলে দক্ষিণে তাকে প্রার্থী করা হলে সেই পরিচিতি ও সাংগঠনিক অবস্থান কাজে লাগানো সম্ভব হবে।

নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারি বলেন, তিনি নির্বাচন করবেন কি না এখনও নিশ্চিত নন। তবে নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা রয়েছে, তিনি যেন ঢাকা দক্ষিণে প্রার্থী হন। পাশাপাশি ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক চিন্তা থেকেই তিনি দক্ষিণে ভোটার হয়েছেন বলেও জানান।

অন্যদিকে উত্তরে আসিফ মাহমুদকে সামনে আনার পেছনে তরুণ ও জেন-জি ভোটারদের মধ্যে তার গ্রহণযোগ্যতাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এনসিপির অভ্যন্তরীণ জরিপেও ঢাকা উত্তর এলাকায় তার অবস্থান ভালো বলে দাবি করছেন দলটির নেতারা।

আসিফ মাহমুদ বলেন, দলের পরিচালিত কয়েকটি জরিপে উত্তরে তার অবস্থান ভালো এবং দক্ষিণে নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারির অবস্থান ভালো। এ চিন্তা থেকেই ভোটার স্থানান্তর করা হয়েছে। তবে তিনি প্রার্থী হবেন কি না, সেই সিদ্ধান্ত দল নেবে।

জামায়াতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দক্ষিণ : ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নিয়ে জামায়াতের হিসাবও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। দলটির সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী হিসেবে সাদিক কায়েমের নাম প্রাথমিকভাবে চূড়ান্ত করা হয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম ছাত্রনেতা সাদিক কায়েমকে ঢাকার রাজনীতিতে সক্রিয় করার পরিকল্পনাও রয়েছে দলটির।

জোট-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, দক্ষিণ সিটিকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে জামায়াত। ফলে এনসিপি যদি সেখানে নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারিকে এবং জামায়াত সাদিক কায়েমকে প্রার্থী করে, তা হলে একই রাজনৈতিক বলয়ের দুই দলের মধ্যে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে।

সংসদ নির্বাচনের ফলও দুই দলের কৌশলে প্রভাব ফেলছে। ঢাকা উত্তরের অন্তর্ভুক্ত আটটি আসনের চারটিতে জামায়াত জয় পেয়েছে। অন্যদিকে দক্ষিণের সাতটি আসনের মধ্যে দুটি আসনে জয় পেয়েছে দলটি। ফলে দক্ষিণে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করার পরিকল্পনা করছে জামায়াত।

জোট থাকবে, নাকি আলাদা লড়াই?

স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে জামায়াত-এনসিপির মধ্যে দর কষাকষি চললেও এনসিপি এখন এককভাবে নির্বাচনে যাওয়ার প্রস্তুতির কথা প্রকাশ্যেই বলছে।

এনসিপির মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম বলেছেন, ‘আমরা এককভাবে নির্বাচন করব। সেটিকে সামনে রেখে সাংগঠনিক শক্তি বাড়াতে এনসিপি মাঠপর্যায়ে দ্রুততার সঙ্গে কাজ করছে।’ ইতিমধ্যে প্রায় ১০০টি উপজেলা ও পৌরসভায় প্রার্থী ঘোষণা করেছে এনসিপি। আরও ১০০টি উপজেলা ও পৌরসভায় প্রার্থী চূড়ান্ত করা হয়েছে। সেপ্টেম্বরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে এসব প্রার্থীর নাম ঘোষণার পরিকল্পনা রয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেও প্রায় ৪ হাজার ৬০০ ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে দলটি।


এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও মিডিয়া উপকমিটির প্রধান সারোয়ার তুষার অবশ্য বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। দলের ভেতরে ও বাইরে নানা আলোচনা চলছে।

পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নির্বাচন কমিশনের পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী নভেম্বর থেকে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের মাধ্যমে স্থানীয় নির্বাচন শুরু হওয়ার কথা। এরপর ধাপে ধাপে পৌরসভা, উপজেলা ও সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ফলে সিটি নির্বাচনের আগে ইউনিয়ন ও পৌরসভা নির্বাচনকে এক ধরনের পরীক্ষার মঞ্চ হিসেবেও দেখছে রাজনৈতিক দলগুলো।

জোট সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সরকার ও সরকারি দলের আচরণ কেমন হয়, তা দেখেও পরবর্তী সময়ে জামায়াত ও এনসিপি জোটগতভাবে নির্বাচন করবে কি না, নাকি আলাদা প্রার্থী দেবে— সে সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।

জামায়াতের প্রতিক্রিয়া

এনসিপির প্রার্থী ঘোষণা নিয়ে জামায়াতের মধ্যে কোনো উদ্বেগ বা নতুন করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন দেখছে না দলটি। জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ সময়ের আলোকে বলেন, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ১১ দলীয় জোটের শরিক দলগুলো আলাদাভাবে নির্বাচন করবে— এমন সিদ্ধান্ত আগেই নেওয়া হয়েছে। এনসিপি তাদের প্রার্থী ঘোষণা করেছে, এতে জামায়াতের করণীয়ও পরিবর্তন হয়নি। জোটের সিদ্ধান্তে এখনও কোনো পরিবর্তন আসেনি। জামায়াতের প্রার্থীরা মাঠে কাজ করছেন; সময় হলে তাদের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হবে।

জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের সময়ের আলোকে বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন রাজনৈতিক পরিচয়ে হবে না এবং এখানে দলীয় প্রতীকও থাকবে না। তাই জোটগতভাবে সিদ্ধান্ত হয়েছে, যে যার মতো করে স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নেবে।

তিনি বলেন, ‘আলাদাভাবে নির্বাচন করলে আমরা মনে করি, জাতীয় নির্বাচনের চেয়েও স্থানীয় নির্বাচনে ভালো ফল অর্জন করা সম্ভব।’

জুবায়ের আরও বলেন, ১১ দলীয় জোট মূলত জাতীয় নির্বাচনে ঐক্যবদ্ধভাবে ভোট করার উদ্দেশ্যে গঠিত হয়েছিল। বর্তমানে জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ইস্যুতে বিরোধী দল হিসেবে যেসব কর্মসূচি দেওয়া হচ্ছে, সেগুলো ১১ দলীয় ঐক্যের ব্যানারে হচ্ছে।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/টিকে
  বিষয়:   জামায়াত  এনসিপি  স্নায়ুযুদ্ধ  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
রাজনীতি- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: