ভারতের পশ্চিমবঙ্গের প্রতিবেশী রাজ্য সিকিমের মাঙ্গান জেলায় ভূমিধসের ফলে তিস্তা নদীর একটি অংশ অবরুদ্ধ হয়ে বাধের সৃষ্টি হয়েছে। এতে আকস্মিক বন্যার উদ্বেগ তৈরি করেছে। নদীর অববাহিকাসংলগ্ন অঞ্চলে ইতোমধ্যে সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
শনিবার গভীর রাতে উত্তর সিকিমের নাগা বনাঞ্চল থেং টানেল সংলগ্ন এলাকায় এই ভূমিধস দেখা দেয়। চিয়াকুং নদীর ওপর পাহাড়ের একটা বড় অংশ ধসে নদীতে পড়ে। এতে আংশিকভাবে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে চিয়াকুং এবং তিস্তা নদীর জলপ্রবাহ। পাহাড় থেকে নেমে আসা বিপুল পরিমাণ মাটি ও পাথর চিয়াকুং নদীতে জমা হয়ে ওই অংশে একটি বাঁধের মতো তৈরি হয়, যার পেছনের অংশে জল জমতে শুরু করে।
দুর্যোগের কারণে তৈরি হওয়া এই বাঁধ ভেঙে গেলে আশপাশের অঞ্চলে ব্যাপক ক্ষতি হতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। যদিও এখনো পর্যন্ত কোনো হতাহতের খবর মেলেনি। প্রশাসন বলছে, বর্তমানে তিস্তার পানি প্রবাহ স্বাভাবিক রয়েছে।
মাঙ্গানের জেলা শাসকের জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে অপসারণ অভিযান সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত স্থানীয় বাসিন্দাদের সতর্কতা অবলম্বন, নদীর তীরের কাছাকাছি না যেতে এবং সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে স্বেচ্ছায় নিরাপদ ও উঁচু স্থানে চলে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সিকিমের স্টেট ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অথোরিটি এবং স্টেট ইমার্জেন্সি অপারেশন্স সেন্টারের পক্ষ থেকে কন্ট্রোল রুমও চালু করা হয়েছে। অন্যদিকে, পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি এবং কোচবিহারে কিছু অংশে উচ্চ সতর্কতা জারি করেছে প্রশাসন।
উত্তরবঙ্গ উন্নয়নমন্ত্রী নিশীথ প্রামাণিক সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘আমরা পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছি। প্রশাসন সতর্কতামূলক পদক্ষেপ করেছে। সিকিমের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।’
ধসের ফলে কাদা, মাটি বড় পাথর এসে জমে দুই নদীর ওপর একটি প্রাকৃতিক বাঁধ তৈরি করেছে। বাঁধের পেছনে প্রচুর পরিমাণে পানি জমে রয়েছে। অঞ্চলটিতে আবার ভূমিধস হলে বা ভারী বৃষ্টির কারণে তৈরি হওয়া এই বাঁধ ভেঙে গেলে, প্রবল জলচ্ছ্বাস সৃষ্টি করতে পারে। এতে ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
চুংথাং থানা এবং থেং চেক পোস্ট থেকে পুলিশকর্মীদের ঘটনাস্থলে মোতায়েন করা হয়েছে। প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, সঙ্কলং ও ফিদাং এলাকায় তিস্তার জলস্তর আপাতত স্বাভাবিক রয়েছে।
সিকিমে ধসের কারণে একদিকে যেমন নদীর গতিপথ আংশিকভাবে অবরুদ্ধ হয়েছে তেমনই ধসের প্রভাব পড়েছে থেং টানেলের বিপরীতে নাগা বনাঞ্চল এলাকার নাগা-তোসা সড়কেও। নতুন কাটা পাহাড়ি রাস্তার একটা বড় অংশ ধসে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এদিকে, উত্তরবঙ্গের কালিম্পং, জলপাইগুড়ি এবং কোচবিহার জেলায় তিস্তার বিস্তীর্ণ অববাহিকাজুড়ে পানির স্তর ইতোমধ্যে বেড়েছে।
স্থানীয়দের নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রেখে সতর্কতা জারি করা হয়েছে। বাসুসুবা, গজলডোবা, বাগরাকোটসহ তিস্তাসংলগ্ন বিভিন্ন এলাকায় মাইকিং করে স্থানীয় বাসিন্দাদের সতর্ক করা হচ্ছে। নদীর তীর এড়িয়ে চলতে এবং পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ঝুলন্ত সেতু ও নদী সংলগ্ন রাস্তা ব্যবহার না করার কথা বলা হয়েছে।
উত্তরবঙ্গের বাসিন্দা গৌতম সাহা পেশায় গাড়ি চালক। বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি বলেছেন, ‘মালবাজার অঞ্চলে হাই অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে। সকাল থেকে প্রশাসনের তরফ থেকে নদী সংলগ্ন অঞ্চলে মাইকিং করা হচ্ছে।’
পরিস্থিতি কতটা উদ্বেগের সে বিষয়ে উত্তরবঙ্গের বাসিন্দা এবং প্রবীণ সাংবাদিক গৌতম সরকার বলেছেন, ‘ভূমিধসের কারণে আংশিকভাবে অবরুদ্ধ হয়ে আছে নদীর জলপ্রবাহ। অল্প অল্প করে জল আসছে এবং সেই জল যাতে বেরিয়ে যেতে পারে তার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। কিন্তু আশঙ্কা রয়ে যাচ্ছে, কারণ ধসের যে অংশটা আটকে আছে সেখানে যদি প্রচুর পরিমাণে জল জমে যায় তাহলে সেগুলো নেপালের মতো কাদা, বোল্ডার নেমে আসতে পারে।’
সিকিম বা উত্তরবঙ্গে ভূমিধ্বস এবং বন্যা পরিস্থিতি নতুন নয়। তাই এখনো তেমন ক্ষয়ক্ষতি না হলেও উদ্বেগ রয়ে যাচ্ছে বলেই জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
উত্তরবঙ্গ সংবাদের অ্যাসোসিয়েট এডিটর গৌতম সরকার ব্যাখ্যা করেছেন, ক্যাচমেন্ট এরিয়াতে ভারী বৃষ্টি হলে, প্রচুর জল আসে। এর আগেও তিস্তা বাজার এলাকাকে এভাবে কয়েকবার ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। তিস্তা বাজারের ডাউন স্ট্রিমে সেবকের পর যে এলাকা রয়েছে- গজলডোবা থেকে বাংলাদেশ সীমান্ত মেখলিগঞ্জের দুপাশে অনেকটাই প্রতিবারই প্রভাবিত হয়। সেখানকার গ্রাম ডুবে যায়, সাধারণ মানুষকে অন্যত্র সরে যেতে হয়। এটা প্রায় প্রতিবছরই দেখা দেয়।
তিনি বলেন, ‘যে ক্ষয়ক্ষতি এখানে হবে, সেটা বাংলাদেশেও দেখতে পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। নেপালের ক্ষেত্রে যেমন আমরা দেখেছি ওই ধস যত এগিয়েছে, তত দুপাশের বাড়িঘর সবকিছু নিয়ে এগিয়েছে। ফলে, এখানে সিকিম এবং পশ্চিমবঙ্গের নদীর পার্শ্ববর্তী এলাকার গ্রাম, গবাদি পশু -সব সঙ্গে নিয়ে নামবে। এই ডেব্রিসও (ভূমিধসের ফলে আকস্মিক বন্যার সঙ্গে ধেয়ে আসা ধ্বংসাবশেষ) বাংলাদেশে ঢুকে যাবে।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, সিকিমে হিমবাহ-সৃষ্ট হ্রদ থেকে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি রয়েছে এবং ওই রাজ্যে একাধিক উচ্চঝুঁকির হিমবাহ-হ্রদ চিহ্নিত হয়েছে। ২০২৩ সালে চুংথাং এলাকাতেই আকস্মিক বন্যার কারণে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল।
পরিবেশবিদ সৌভিক চোঙদার ব্যাখ্যা করেছেন, সিকিমেও এমন ১০০রও বেশি গ্লেসিয়াল লেক আছে। এর মধ্যে পঞ্চাশের বেশি গ্লেসিয়াল লেক উচ্চঝুঁকিপূর্ণর তালিকায় আছে। অর্থাৎ, সিকিমে যদি নেপালের মতো ভুমিধসের ফলে ফ্ল্যাশফ্লাড দেখা যায় তাহলে সিকিম ও উত্তরবঙ্গের যোগযোগ সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে এবং পর্যটন কেন্দ্র জলের তলায় চলে যেতে পারে।
সূত্র : বিবিসি বাংলা
সময়ের আলো/মহু