ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধে নিহত মার্কিন সেনাদের পরিবারগুলো তাদের প্রিয়জনদের প্রাপ্য বেতন ও অন্যান্য সরকারি সুবিধা নিশ্চিত করতে লড়াই করছে। ইরানে হামলায় নিহত এক মার্কিন সেনার স্ত্রী লিবি ক্লিনার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, তার স্বামী ৩৩ বছর মেজর অ্যালেক্স ক্লিনারের মৃত্যুর পর মার্কিন বিমান বাহিনী তাকে অতিরিক্ত সুযোগ-সুবিধার জন্য অযোগ্য হিসেবে গণ্য করেছিল, কারণ কংগ্রেস আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধ ঘোষণা করেনি।
মার্চে পশ্চিম ইরাকে একটি জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান বিধ্বস্ত হয়ে যে ছয়জন ক্রু সদস্য নিহত হন, অ্যালেক্স ছিলেন তাদের একজন। বিমানটি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় সহায়তা করছিল। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর পর ছয় মাসেরও বেশি সময়ে ১৮ জন মার্কিন সেনা নিহত এবং ৭৮০ জন আহত হয়েছেন।
লিবি ক্লিনার বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে বলেন, আমার স্বামী প্রাণ হারিয়েছেন কারণ আমরা একটি যুদ্ধের মধ্যে রয়েছি - আর তারপরে আমাকে বলা হয়েছিল যে, এটি কারিগরিভাবে কোনো যুদ্ধ না হওয়ায় আমরা কিছুটা সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। বিষয়টি শেষ পর্যন্ত নীতির প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অনলাইনে নিজের হতাশার কথা জানিয়ে একটি পোস্ট দেওয়ার পর সেটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে মার্কিন বিমানবাহিনী বিষয়টি পরিষ্কার করে জানায়, অ্যালেক্স ক্লিনারের শেষ বেতন-চেকে ঝুঁকিভাতা এবং যুদ্ধ-সম্পর্কিত কর ছাড় অন্তর্ভুক্ত ছিল।
মার্কিন কর্মকর্তারাও স্বীকার করেন, তাকে শুরুতে ভুল তথ্য দেওয়া হয়েছিল এবং তার স্বামীর শেষ বেতন-চেকে 'যুদ্ধকালীন ভাতা' অন্তর্ভুক্ত ছিল, তবে সেটি ভুলভাবে আলাদা করে দেখানো হয়েছিল। এই ভাতার পরিমাণ মাসে ২২৫ ডলার এবং এটি আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে কি না, তার ওপর নির্ভরশীল ছিল না।
লিবি ক্লিনার পরে এক বিবৃতিতে বলেন, এই অভিজ্ঞতা আমাকে যে বিষয়টি স্পষ্টভাবে বুঝিয়েছে, তা হলো— শোকাহত একটি পরিবারের জন্য শ্রেণিবিন্যাস, পরিভাষা ও সরকারি প্রক্রিয়া বোঝা কতটা কঠিন হতে পারে, ঠিক এমন একটি সময়ে যখন এসব বিষয় সামলানোর জন্য আমরা মানসিকভাবে সবচেয়ে কম প্রস্তুত থাকি।
তিনি আরও বলেন, কোনো গোল্ড স্টার পরিবারকে— অর্থাৎ সামরিক দায়িত্ব পালনের সময় স্বজন হারানো কোনো পরিবারকে— তারা কী কী সুবিধা পাওয়ার অধিকার রাখে, তা বোঝার জন্য সরকারের ব্যবহৃত ভাষার বিশেষজ্ঞ হতে বাধ্য করা উচিত নয়। অ্যালেক্স তার সামরিক দায়িত্ব পালনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ঝুঁকিগুলো সম্পর্কে জানতেন এবং তিনি বিশ্বাস করতেন, সবচেয়ে খারাপ কিছু ঘটলে তার পরিবারের দেখভাল করা হবে।
কোনো মার্কিন সেনাসদস্য বিভিন্ন ধরনের ভাতা ও আর্থিক সুবিধা পাওয়ার যোগ্য কি না, তা নির্ধারণে তার মোতায়েনের স্থান, দায়িত্ব পালনের স্থান এবং অন্যান্য নানা বিষয় বিবেচনা করা হয়।
বাস্তবে এর অর্থ হলো, বছরে বহুবার একজন সেনাসদস্যের বেতন-চেকে পরিবর্তন আসতে পারে। আর এর ফলে বিভ্রান্তি ও ভুলের সৃষ্টি হয়।
লিবি ক্লিনার বলেন, আমি চাই, আলোচনার মূল বিষয় হোক— যে পরিবারগুলো অকল্পনীয় এক ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছে, তাদের প্রত্যেকটি পরিবার যেন শুরু থেকেই একই ধরনের স্পষ্ট তথ্য পায়। পেছনে পড়ে থাকা পরিবারগুলোর জন্য বিষয়টি সঠিকভাবে নিশ্চিত করা কোনো ছোটখাটো আনুষঙ্গিক বিষয় নয়— বরং আমরা যেসব মানুষকে হারিয়েছি, তাদের দায়িত্ব ও আত্মত্যাগকে সম্মান জানানোর জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্সকে লিবি ক্লিনারের ঘটনা সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়।
তিনি বলেন, আমরা যতটা সম্ভব সহযোগিতা করতে চাই এবং নিশ্চিত করতে চাই যে তিনি যা পাওয়ার অধিকারী, তার সবকিছুই যেন তিনি পান।
তিনি আরও বলেন, তার প্রতি আমার বার্তা হবে— আমরা আপনাকে ভালোবাসি, আপনার আত্মত্যাগের জন্য আমরা কৃতজ্ঞ এবং আপনার প্রয়োজনীয় সবকিছু নিশ্চিত করার যে দায়িত্ব আমাদের রয়েছে, আমরা সেটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছি।
অন্য একটি প্রশ্নের জবাবে ভ্যান্স ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানকে বর্ণনা করতে 'যুদ্ধ' শব্দটি ব্যবহার করতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি বলেন, সেখানে 'সক্রিয়ভাবে গোলাগুলি চলছে না'।
যদিও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানকে বারবার যুদ্ধ হিসেবে অভিহিত করেছেন, শুক্রবার তিনি ভ্যান্সের বক্তব্যের প্রতি সমর্থন জানান। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের হামলা 'বিরতিসহ' চলছে।
তিনি বলেন, অনেকেই এটিকে যুদ্ধ বলে না। আমি এটিকে সামরিক সংঘাত বলি, কারণ আমাদের জন্য এটি খুবই সামান্য বিষয়।
মার্কিন সেনাসদস্যদের পরিবারগুলো আরও অভিযোগ করেছে, পেন্টাগন আহত সেনাদের আঘাতের মাত্রা কম করে দেখাচ্ছে এবং তাদের যুদ্ধাহত হিসেবে সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে যথাযথভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে না। তবে মার্কিন সেনাবাহিনী এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
সামরিক বাহিনী সাধারণত আহত সেনাদের আঘাতের বিস্তারিত তথ্য ধীরগতিতে প্রকাশ করছে। এর একটি কারণ হলো, মার্কিন কেন্দ্রীয় কমান্ডকে এ ধরনের তথ্য প্রকাশ করতেই হবে— এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই, বিশেষ করে আহত সেনারা যদি অল্প সময়ের মধ্যেই আবার দায়িত্বে ফিরে আসেন।
ট্রাম্প দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নিহত কয়েকজন মার্কিন সেনার নিকটাত্মীয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। তাদের মধ্যে ২৫ বছর বয়সী লেফটেন্যান্ট টাইলার জেমস ফিহানের বাবা-মাও রয়েছেন।
লেফটেন্যান্ট ফিহানের মা শারি ফিহান বলেন, তিনি আমার সঙ্গে এমনভাবে কথা বলেছেন যেভাবে একজন মা তার ছেলেকে হারিয়ে কথা বলেন। তিনি সেই ধ্বংসলীলা দেখেছেন। তিনি তা প্রত্যক্ষ করেছেন, তাই তিনি তা জানেন।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ