ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধের প্রভাবে গত ছয় মাসে যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ পেট্রোল ও ডিজেলের পেছনে অতিরিক্ত প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছেন। এতে গড়ে প্রতিটি মার্কিন পরিবারের বাড়তি খরচ হয়েছে প্রায় ৭৬৩ ডলার।
ব্রাউন ইউনিভার্সিটির ওয়াটসন ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড পাবলিক অ্যাফেয়ার্সের একটি ট্র্যাকার থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে আনুমানিক ১৩ কোটি ১০ লাখ পরিবার রয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর জ্বালানির দাম বাড়ায় ছয় মাসে তাদের সম্মিলিত অতিরিক্ত ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলারে।
৩৯ শতাংশ বেড়েছে পেট্রোলের দাম
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়। এর প্রভাব পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সব ৫০টি অঙ্গরাজ্যে।
যুদ্ধ শুরুর আগে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন পেট্রোলের গড় দাম ছিল প্রায় ২.৯৮ ডলার। বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪.১৫ ডলারে। অর্থাৎ পেট্রোলের দাম বেড়েছে প্রায় ৩৯ শতাংশ।
ডিজেলের দাম বেড়েছে আরও বেশি। প্রতি গ্যালন ৩.৬৭ ডলার থেকে তা বেড়ে হয়েছে প্রায় ৫.৯০ ডলার, যা ৬০ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি।
ক্যালিফোর্নিয়ায় জ্বালানির দাম সবচেয়ে বেশি
অঙ্গরাজ্যভেদে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দামে বড় পার্থক্য রয়েছে। পশ্চিম উপকূলের রাজ্যগুলোতে দাম সবচেয়ে বেশি।
আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনের (এএএ) তথ্য অনুযায়ী, ক্যালিফোর্নিয়ায় প্রতি গ্যালন পেট্রোলের গড় দাম ৫.৮৫ ডলার। এরপর রয়েছে ওয়াশিংটন ৫.৫১ ডলার, হাওয়াই ৫.৩৯ ডলার, আলাস্কা ৫.০৩ ডলার এবং ওরেগন ৫.০১ ডলার।
অন্যদিকে ইন্ডিয়ানায় দেশটির সবচেয়ে কম দামে পেট্রোল বিক্রি হচ্ছে। সেখানে প্রতি গ্যালনের গড় দাম প্রায় ৩.৪৩ ডলার।
বিশ্লেষকদের মতে, ক্যালিফোর্নিয়ায় যুদ্ধের আগেই তুলনামূলক বেশি জ্বালানি কর এবং কার্বন মূল্য নির্ধারণ কর্মসূচির কারণে পেট্রোলের দাম অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় বেশি ছিল।
বাড়ছে খাদ্যপণ্যের দামও
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব শুধু গাড়ি চালানোর খরচেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। খাদ্য উৎপাদন, সংরক্ষণ, প্যাকেজিং ও পরিবহনের প্রায় প্রতিটি ধাপেই তেল ও গ্যাসের ব্যবহার রয়েছে।
কৃষিতে সার উৎপাদন ও যন্ত্রপাতি চালানো থেকে শুরু করে হিমাগারে খাদ্য সংরক্ষণ, প্লাস্টিকের প্যাকেজিং এবং ট্রাকে করে পণ্য পরিবহন—সব ক্ষেত্রেই জ্বালানির প্রয়োজন হয়।
ফলে তেলের দাম বাড়লে উৎপাদন থেকে শুরু করে ভোক্তার হাতে পণ্য পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে খরচ বাড়ে। শেষ পর্যন্ত সেই বাড়তি ব্যয় খাদ্যপণ্যের দামের ওপর গিয়ে পড়ে।
বিশেষ করে নিম্নআয়ের দেশগুলোতে এর প্রভাব আরও গুরুতর হতে পারে। এসব দেশের মানুষ আয়ের বড় অংশ খাদ্যের পেছনে ব্যয় করে। একই সঙ্গে অনেক দেশ শস্য ও সার আমদানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে তেলের দাম দীর্ঘ সময় বেশি থাকলে খাদ্যের দাম দ্রুত বাড়ার পাশাপাশি খাদ্যসংকটের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
যুদ্ধ নিয়ে বাড়ছে মার্কিনদের অসন্তোষ
ইরান যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও অসন্তোষ বাড়ছে। জ্বালানির দাম বৃদ্ধির জন্য দেশটির অধিকাংশ মানুষ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দায়ী করছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে জ্বালানির দাম নিয়ে উদ্বেগ উড়িয়ে দিয়েছেন ট্রাম্প। রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “দাম বাড়লে বাড়ুক।”
একই সঙ্গে তেল কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে অতিরিক্ত মুনাফার জন্য দাম বাড়ানোর অভিযোগও তুলেছেন তিনি।
যুদ্ধ শুরুর সময় ট্রাম্প বলেছিলেন, এটি চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ স্থায়ী হতে পারে। কিন্তু যুদ্ধ ইতোমধ্যে ষষ্ঠ মাসে গড়িয়েছে। এখনো কোনো কূটনৈতিক সমাধানের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
ফলে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জ্বালানির বাড়তি দাম মার্কিন পরিবারগুলোর ব্যয় বাড়ানোর পাশাপাশি খাদ্য ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামেও চাপ তৈরি করছে।
সূত্র : আল-জাজিরা
সময়ের আলো/ইউএমএইচ