ভারতের রাজধানী দিল্লির সত্য নিকেতন এলাকায় একটি বহুতল ভবন ধসে ছয়জন নিহত হয়েছেন। দুর্ঘটনার মুহূর্তের সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশ্যে এসেছে। ভবনটি ধসে পড়ার পর সেখানে ব্যাপক উদ্ধার অভিযান শুরু হয়।
রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) দুপুর দেড়টার দিকে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাউথ ক্যাম্পাসের কাছে ছেলেদের জন্য পরিচালিত একটি পেইং গেস্ট (পিজি) আবাসনের ভবনটি ধসে পড়ে। ওই সময় ভবনটিতে মেরামত ও নির্মাণকাজ চলছিল।
সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, হঠাৎ করেই ভবনটি ধসে পড়ে এবং বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ সড়কের ওপর ছড়িয়ে পড়ে। এরপর ধ্বংসস্তূপের নিচে কেউ আটকা পড়ে আছেন কি না, তা খুঁজে দেখতে রাতভর উদ্ধার অভিযান চালানো হয়।
দিল্লি পুলিশ, দিল্লি ফায়ার সার্ভিস, ন্যাশনাল ডিজাস্টার রেসপন্স ফোর্স (এনডিআরএফ) এবং দিল্লি ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অথরিটিসহ একাধিক সংস্থা উদ্ধার অভিযানে অংশ নেয়।
দক্ষিণ-পশ্চিম দিল্লির ডেপুটি কমিশনার অব পুলিশ (ডিসিপি) অমিত গোয়েল বলেন, রাতে আরও একজনকে উদ্ধার করা হয়েছিল। তবে হাসপাতালে নেওয়ার পর তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়। এতে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ছয়জনে দাঁড়ায়।
আহত ১০ জনকে ট্রমা সেন্টারে নেওয়া হয়
অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্সেস (এইমস) জানিয়েছে, ভবন ধসের ঘটনায় আহত ১০ জনকে জেপিএন অ্যাপেক্স ট্রমা সেন্টারে নেওয়া হয়। তাদের মধ্যে পাঁচজনকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়। পরে সংকটাপন্ন অবস্থায় থাকা আরও একজনের মৃত্যু হয়।
তিনজন বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তাদের মধ্যে একজনের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। আরেকজন সামান্য আহত হওয়ায় পর্যবেক্ষণে রাখার পর তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
ভবনের বেসমেন্টের নির্মাণকাজ নিয়ে তদন্ত
ভবন ধসের ঘটনায় তদন্তকারীরা বেসমেন্টে চলা নির্মাণকাজ ভবনটির ধসে পড়ার পেছনে ভূমিকা রেখেছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছেন।
প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, ভবনটির বেসমেন্টে পানি জমার প্রবণতা ছিল। এতে কাঠামো দুর্বল হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নির্মাণকাজের কারণে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছিল কি না, সেটিও তদন্ত করা হচ্ছে।
দিল্লি মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন (এমসিডি) বিষয়টি তদন্ত করছে। বেসমেন্টে নির্মাণকাজ, পানি জমে থাকা এবং ভবনের কাঠামোগত দুর্বলতা নিয়েও প্রাথমিক তদন্তে উদ্বেগের বিষয় উঠে এসেছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, নির্মাণকাজের জন্য প্রয়োজনীয় অনুমতি নেওয়া হয়েছিল কি না এবং বর্ষাকালে কেন সেখানে নির্মাণকাজ চলছিল, তা খতিয়ে দেখা হবে।
এক তদন্তকারী বলেন, ভবনের মালিক, ঠিকাদার ও শ্রমিকদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
তবে ভবন মালিক নির্মাণকাজের অনুমতি নিয়েছিলেন কি না কিংবা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের যোগসাজশে অবৈধভাবে কাজ চলছিল কি না, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
বিপজ্জনক ভবন ভেঙে ফেলার নির্দেশ
এমসিডি জানিয়েছে, সত্য নিকেতনের ১৩ নম্বর ভবনটি পরিদর্শনের পর সেটিকে ‘জীর্ণ ও বিপজ্জনক অবস্থায়’ পাওয়া গেছে। ভবনটি সেখানে বসবাসকারী, দর্শনার্থী, পথচারী এবং আশপাশের মানুষের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
১৯৫৭ সালের ডিএমসি আইনের ৩৪৮ ধারা এবং ৪৯১ ধারার আওতায় ভবনটি ভেঙে ফেলার নির্দেশ দিয়েছে এমসিডি। নির্দেশ পাওয়ার তিন দিনের মধ্যে ভবনটি ভেঙে ফেলার কথা বলা হয়েছে।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মালিক ভবনটি না ভাঙলে এমসিডি নিজ উদ্যোগে সেটি ভেঙে ফেলবে এবং এর ব্যয় কর বকেয়া হিসেবে মালিকের কাছ থেকে আদায় করবে।
দিল্লিতে ভবন নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন
এই দুর্ঘটনার পর দিল্লির ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় পেইং গেস্ট আবাসনে বসবাসকারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা এবং নির্মাণ ও অগ্নিনিরাপত্তা বিধিমালা কার্যকর করার বিষয়টি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
কংগ্রেস নেত্রী ও অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস কমিটির (এআইসিসি) উত্তরাখণ্ডের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা কুমারী সেলজা শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে বিজেপি সরকারের সমালোচনা করেছেন।
তিনি বলেন, বিজেপি সরকার কী করছে? কোচিং সেন্টারে যা ঘটেছিল, তারা তা ভুলে গেছে। দিল্লিতে একটি মাফিয়া কাজ করছে। এসব সন্তান অনেক আশা নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে। তারাই তাদের বাবা-মায়ের একমাত্র ভরসা। তাদের নিরাপত্তার দায়িত্ব কার?
দিল্লির সাবেক মুখ্যসচিব ওমেশ সাইগালও ঘটনাটিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে না দেখার আহ্বান জানিয়েছেন। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অনুমোদনহীন নির্মাণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।
সাইগাল বলেন, দিল্লিতে কী ধরনের ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে, তা দেখুন। আমি বলব, কিছু এলাকায় প্রতি পাঁচটি ভবনের একটি অনুমোদনহীন। হয় নকশা অনুমোদিত হয়নি, অতিরিক্ত তলা নির্মাণ করা হয়েছে, অথবা নির্মাণের মান নিম্নমানের।
অতিরিক্ত ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় নতুন নির্মাণে বিধিনিষেধ আরোপেরও দাবি জানান তিনি। তার মতে, যেসব এলাকা ইতোমধ্যে অতিরিক্ত ঘনবসতিপূর্ণ ও অতিরিক্ত নির্মাণে ভারাক্রান্ত, সেখানে নতুন নির্মাণ বন্ধ করা বা নতুন ভবনের নকশা অনুমোদন না দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ