জীবনযাপনের ধরন অনেকটাই নির্ভর করে মানুষের আয়, প্রয়োজন ও ব্যক্তিগত পছন্দের ওপর। কারও কাছে আরামদায়ক জীবন মানে দামি পোশাক, নিয়মিত রেস্টুরেন্টে খাওয়া কিংবা নতুন নতুন জিনিস কেনা। আবার কারও কাছে স্বস্তির জীবন মানে প্রয়োজন মিটিয়ে কিছু টাকা সঞ্চয় করা এবং পরিবারকে সময় দেওয়া। তাই সুন্দর জীবনযাপনের জন্য বেশি খরচ করাই একমাত্র উপায় নয়, বরং নিজের সামর্থ্য বুঝে খরচ করাই হতে পারে বুদ্ধিমান জীবনযাপনের পরিচয়।
প্রয়োজন আর শখের পার্থক্য
জীবনে প্রয়োজনীয় জিনিসের পাশাপাশি শখও থাকে। নতুন পোশাক, প্রসাধনী, ঘর সাজানোর সামগ্রী কিংবা বাইরে খাওয়ার ইচ্ছা সবই স্বাভাবিক। তবে প্রতিটি ইচ্ছাকে প্রয়োজন মনে করলে খরচ দ্রুত বেড়ে যায়। শখের জন্য খরচ করা যাবে না বিষয়টি এমন নয়, বরং শখের জন্যও একটি নির্দিষ্ট বাজেট রাখা যেতে পারে। এতে নিজের পছন্দের জিনিস কেনার আনন্দ যেমন থাকবে, তেমনি মাসের প্রয়োজনীয় খরচেও চাপ পড়বে না।
আয় অনুযায়ী জীবনধারা
আয় বাড়লে জীবনযাত্রার মান কিছুটা উন্নত হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু আয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যদি খরচও একই হারে বাড়তে থাকে তা হলে আর্থিক স্বস্তি আসে না। অনেক সময় দেখা যায়, আগে যে জীবনযাপন স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ মনে হতো, আয় বাড়ার পর সেটিই আর যথেষ্ট মনে হয় না। নতুন চাহিদা তৈরি হতে থাকে। তাই আয় বাড়লেও সব ক্ষেত্রে খরচ বাড়ানো জরুরি নয়, বরং বাড়তি আয়ের একটি অংশ ভবিষ্যতের জন্য রাখা ভালো। এতে প্রয়োজনের সময় অন্যের ওপর নির্ভর করতে হয় না। একই সঙ্গে নিজের জীবনযাপনও থাকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে।
ছোট খরচের বড় প্রভাব
বড় কেনাকাটার হিসাব আমরা সাধারণত মনে রাখি। কিন্তু প্রতিদিনের ছোট ছোট খরচ অনেক সময় হিসাবের বাইরে থেকে যায়। প্রতিদিনের বাইরে খাওয়া, অপ্রয়োজনীয় অনলাইন কেনাকাটা, অতিরিক্ত ডেলিভারি চার্জ কিংবা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি সাবস্ক্রিপশন মাস শেষে এগুলো মিলিয়ে বড় অঙ্ক দাঁড়াতে পারে। তাই মাসের শুরুতে প্রয়োজনীয় সবকিছুর জন্য আলাদা করে আনুমানিক বাজেট করা ভালো। মাস শেষে সেই তালিকার সঙ্গে বাস্তব খরচ মিলিয়ে দেখলে কোথায় বেশি টাকা যাচ্ছে তা সহজেই বোঝা যায়।
কেনাকাটায় একটু বিরতি
কোনো কিছু পছন্দ হলেই সঙ্গে সঙ্গে কিনে ফেলার অভ্যাস অনেক সময় বাজেট নষ্ট করে। বিশেষ করে অনলাইন কেনাকাটার ক্ষেত্রে বিষয়টি বেশি দেখা যায়। পছন্দের কোনো জিনিস দেখলে কয়েক ঘণ্টা বা এক দিন অপেক্ষা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে। এই সময়ের মধ্যে অনেক সময় বোঝা যায়, জিনিসটি আসলে প্রয়োজন কি না। একইভাবে ছাড় বা অফার দেখেও সবকিছু কেনার প্রয়োজন নেই। কারণ কোনো জিনিসের দাম কম হলেও সেটি যদি প্রয়োজন না হয় তা হলে সেই খরচও অপ্রয়োজনীয়।
জীবন উপভোগ মানেই বেশি খরচ নয়
অনেকের ধারণা, ভালো জীবনযাপন করতে হলে নিয়মিত অর্থ খরচ করতে হয়। আসলে বিষয়টি এমন নয়। পরিবারের সঙ্গে ছাদে বসে চা খাওয়া, বিকালে হাঁটতে বের হওয়া, ঘরে পছন্দের খাবার রান্না করা কিংবা বই পড়ার মতো কাজও আনন্দ দিতে পারে। বিনোদনের জন্য প্রতিবার বড় বাজেট প্রয়োজন হয় না, বরং নিজের পছন্দের ছোট ছোট মুহূর্তকে উপভোগ করার অভ্যাস জীবনকে আরও স্বস্তিদায়ক করে তুলতে পারে। অর্থ খরচের চেয়ে সময়ের সুন্দর ব্যবহার অনেক সময় বেশি আনন্দ দিতে পারে।
সঞ্চয়ও জীবনযাপনের অংশ
সঞ্চয়কে অনেকেই ভবিষ্যতের বিষয় মনে করেন। কিন্তু এটি বর্তমান জীবনেও মানসিক স্বস্তি দেয়। হঠাৎ কোনো প্রয়োজন দেখা দিলে সঞ্চয় করা টাকা কাজে আসে। তাই আয় থেকে সামর্থ্য অনুযায়ী একটি নির্দিষ্ট অংশ আলাদা করে রাখার অভ্যাস করা ভালো। অল্প পরিমাণ হলেও নিয়মিত সঞ্চয় একসময় বড় সহায়তা হয়ে উঠতে পারে। সঞ্চয়ের পাশাপাশি জরুরি প্রয়োজনের জন্য আলাদা একটি তহবিল রাখা যেতে পারে। এতে হঠাৎ কোনো খরচ এলে দৈনন্দিন বাজেট এলোমেলো হওয়ার আশঙ্কা কমে।
বাজেট মানে জীবনকে আটকে রাখা নয়
অনেকে বাজেট শব্দটি শুনলেই মনে করেন, এতে জীবনের আনন্দ কমে যাবে। আসলে বাজেটের উদ্দেশ্য জীবনকে কঠিন করা নয়, বরং খরচকে সহজভাবে নিয়ন্ত্রণ করা। কোথায় কত টাকা খরচ করা যাবে তা আগে থেকে জানা থাকলে প্রয়োজনীয় কাজ করার পরও নিজের পছন্দের বিষয়গুলোর জন্য অর্থ রাখা সম্ভব। জীবনযাপনে তাই ভারসাম্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সবসময় খরচ কমিয়ে রাখা যেমন প্রয়োজন নেই, তেমনি প্রয়োজনের বাইরে খরচ করাও বুদ্ধিমানের কাজ নয়। সুন্দর জীবনযাপনের অর্থ শুধু বেশি খরচ করা নয়; বরং প্রয়োজন বুঝে খরচ করা, শখের জন্য সামান্য জায়গা রাখা, ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করা এবং সামর্থ্যরে মধ্যে আনন্দ খুঁজে নেওয়াই হতে পারে স্বস্তির জীবনযাপনের মূল চাবিকাঠি। আয় ও খরচের মধ্যে ভারসাম্য থাকলে জীবন যেমন সহজ হয়, তেমনি ভবিষ্যৎ নিয়েও দুশ্চিন্তা কিছুটা কমে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে