বাংলা টাইপ ডিজাইনের ইতিহাস, বিবর্তন, নান্দনিকতা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা হয়েছে ‘লিপিকলা টাইপটক–২০২৬’ সম্মেলনে। সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর বাংলামোটরের বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে স্বাধীন টাইপ ডিজাইন স্টুডিও ও গবেষণাভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম লিপিকলা টাইপ ফাউন্ড্রি এ সম্মেলনের আয়োজন করে।
সম্মেলনে টাইপ ডিজাইন, গবেষণা ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞরা বাংলা টাইপের ইতিহাস, বর্তমান চ্যালেঞ্জ এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে নিজেদের মতামত ও অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানে মূল আলোচনা উপস্থাপন করেন নিউ এজ-এর ডেপুটি এডিটর এবং বাংলা টাইপোগ্রাফি বিষয়ক সাময়িকী ‘হরফচর্চা’-এর সম্পাদকীয় সহযোগী আবু জার মো. আককাস এবং টাইপ ডিজাইনার ও গবেষক, বাংলা টাইপ ফাউন্ড্রির প্রতিষ্ঠাতা জ্যাকব থমাস।
আবু জার মো. আককাস তার বক্তব্যে বাংলা টাইপ ডিজাইনের ইতিহাস তুলে ধরেন। প্রাচীন ব্রাহ্মী লিপি থেকে আধুনিক বাংলা টাইপ ডিজাইনে ফন্টের বিবর্তনের বিভিন্ন ধাপ নিয়েও আলোচনা করেন তিনি।
জ্যাকব থমাস বাংলা টাইপ ডিজাইনের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নিয়ে আলোচনা করেন। একই সঙ্গে বৈশ্বিক মানদণ্ড অনুসরণ করে বাংলা টাইপ ডিজাইনের মানোন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
বাংলা অক্ষরের আকৃতি, স্টাইলাইজেশন ও রেখার ব্যবহার টাইপফেস তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ—এ কথা তুলে ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাফিক ডিজাইন বিভাগের অধ্যাপক মাকসুদুর রহমান বলেন, বাংলা অক্ষরের গঠনগত বৈশিষ্ট্যকে গুরুত্ব দিয়েই টাইপফেস তৈরির কাজ এগিয়ে নিতে হবে।
আলোচক শিল্পী আনিসুজ্জামান সোহেল নিজের পেশাগত অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, টাইপফেস ডিজাইনারদের কাজের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে পর্যাপ্ত সুযোগ ও পরিসর এখনো তৈরি হয়নি। এ সময় তিনি ‘সমকাল’ পত্রিকার লোগো তৈরির সময় প্রয়াত শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরীর কাছ থেকে প্রশংসা পাওয়ার একটি স্মৃতিও তুলে ধরেন।
ইবিএলআইসিটি প্রকল্পের উপদেষ্টা মামুন অর রশীদ ফন্ট পাইরেসি প্রতিরোধে টাইপ ও মেধাস্বত্বের কপিরাইট বিষয়ে টাইপ ডিজাইনারদের সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান।
আলোচনায় আরও অংশ নেন অভ্র টিমের অন্যতম ডেভেলপার তানভিন আহমেদ সিয়াম, প্রযুক্তিবিদ ও ‘একুশে’ প্রজেক্টের প্রতিষ্ঠাতা অমি আজাদ, টাইপফেস ডিজাইনার ও ডেভেলপার মুহাম্মদ শহিদুল ইসলাম এবং কোডপত্রের প্রতিষ্ঠাতা ও ডেভেলপার জায়েদ আহসান সাদসহ টাইপ ডিজাইন ও টাইপোগ্রাফি কমিউনিটির অনেকে।
আলোচনায় উঠে আসে, বাংলা টাইপের ভবিষ্যৎ শুধু নতুন ফন্ট তৈরির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বাংলা লিপির ইতিহাস, ব্যবহার, প্রযুক্তি, নান্দনিকতা ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটকে সমন্বিতভাবে বোঝার পাশাপাশি এ নিয়ে নিয়মিত গবেষণা ও আলোচনা প্রয়োজন।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন লিপিকলা টাইপ ফাউন্ড্রির ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর ও প্রতিষ্ঠাতা কাজী যুবাইর মাহমুদ।
তিনি বলেন, ‘লিপিকলার যাত্রা শুরু হয়েছিল বাংলা টাইপকে শুধু একটি ডিজাইনের বিষয় হিসেবে নয়, ভাষা, সংস্কৃতি ও ভিজ্যুয়াল পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখার জায়গা থেকে।’
তিনি আরও বলেন, ‘লিপিকলা টাইপটক সেই ভাবনা থেকেই শুরু হয়েছে। আমরা চাই, এখানে অভিজ্ঞ টাইপ ডিজাইনার ও গবেষকদের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের ডিজাইনার, শিক্ষার্থী এবং বাংলা টাইপ নিয়ে আগ্রহী মানুষেরাও তাদের ভাবনা ও প্রশ্ন নিয়ে অংশ নিক। বাংলা টাইপের ভবিষ্যৎ আরও সমৃদ্ধ করতে আমাদের প্রয়োজন সম্মিলিতভাবে শেখা, প্রশ্ন করা এবং নিজেদের কাজকে সমালোচনার মধ্য দিয়ে এগিয়ে নেওয়া।’
লিপিকলা টাইপটকের যাত্রা শুরু হয় ২০২৫ সালে লিপিকলা টাইপ ফাউন্ড্রির প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে। ওই সময় বাংলা বর্ষপঞ্জির ১২ মাসের নামে ১২টি নতুন টাইপফেস উন্মোচন করা হয়েছিল।
সময়ের আলো/কেএইচও