ডাকসুর ১ বছর : প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন কতটা

ফাইয়াজ উদ্দিন স্মরণ, ঢাবি

শিক্ষা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনের এক বছর পূর্ণ হচ্ছে আজ। গত বছরের ৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বাংলাদেশ ইসলামী

2026-09-09T00:58:53+00:00
2026-09-09T00:58:53+00:00
 
  বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৫ ভাদ্র ১৪৩৩
বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শিক্ষা
ডাকসুর ১ বছর : প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন কতটা
ফাইয়াজ উদ্দিন স্মরণ, ঢাবি
প্রকাশ: বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:৫৮ এএম 
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)-এর ভবন। ছবি : সংগৃহীত
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনের এক বছর পূর্ণ হচ্ছে আজ। গত বছরের ৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির-সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট’ ২৮টি পদের মধ্যে ২৩টিতে জয় পায়। নির্বাচনের আগে ‘১২ মাস, ৩৬ সংস্কার’ স্লোগানে ঘোষিত ইশতেহারে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধান ও বিশ্ববিদ্যালয় সংস্কারে ৩৬টি অঙ্গীকার করা হয়েছিল। তবে এক বছর পর ইশতেহারের সব অঙ্গীকার বাস্তবায়িত হয়নি বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের।

ইশতেহার বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, বেশ কিছু অঙ্গীকার বাস্তবায়িত হলেও এখন পর্যন্ত কিছু প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়নি কিংবা বাস্তবায়নের বিভিন্ন পর্যায়ে রয়েছে। বিশেষ করে খাদ্যের মানোন্নয়ন, শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকট, ক্যাম্পাসের নিরাপত্তাসহ শিক্ষার্থীদের মৌলিক চাহিদা সংশ্লিষ্ট কয়েকটি অঙ্গীকার নিয়ে রয়েছে অপূর্ণতা। তবে ডাকসু নেতাদের দাবি, ইশতেহারের সব অঙ্গীকার বাস্তবায়নের দায়িত্ব কেবল ডাকসুর হাতে নেই। প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারের অসহযোগিতার কারণে কিছু প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।

Advertisement
নিশ্চিত হয়নি স্বাস্থ্যকর খাদ্য : ডাকসু নির্বাচনে ‘ঐক্য শিক্ষার্থী জোটের’ চার নম্বর ইশতেহারে হল ও ক্যাম্পাসের ক্যান্টিনে পুষ্টিকর খাবারের মেন্যু প্রণয়ন, তিন মাস অন্তর খাবারের মান পরীক্ষা, মানসম্মত ক্যাফেটেরিয়া এবং আর্থিক সংকটে থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য ‘মিল ভাউচার’ চালুর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। তবে এক বছরেও খাবারের মানে দৃশ্যমান পরিবর্তন আসেনি।

হাজী মুহাম্মদ মুহসীন হলের শিক্ষার্থী নিয়ামুল ইসলাম সময়ের আলোকে বলেন, ক্যান্টিন মালিক পরিবর্তনের পর কয়েক দিন মান ভালো থাকলেও পরে আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়। এ বিষয়ে ডাকসুর জিএস এস এম ফরহাদ সময়ের আলোকে বলেন, ‘খাবারের মান পুরোপুরি নিশ্চিত করতে পারিনি, এটি আমি অ্যাগ্রি করি। তবে আমাদের দিক থেকে যা যা করা দরকার, তার প্রায় বেশিরভাগই করেছি।’

খাবার পরীক্ষার ব্যয় ও প্রশাসনিক বাধার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ফুড সেফটি অথরিটি দিয়ে প্রতিটি পরীক্ষা করতে প্রায় দেড় লাখ টাকা খরচ হয়। সব হলে নিয়মিত পরীক্ষা করতে বড় অঙ্কের অর্থ প্রয়োজন, যা বিশ্ববিদ্যালয় দিতে রাজি নয়। ‘মিল ভাউচার’ চালুর বিষয়ে ফরহাদ বলেন, মেস সিস্টেম ও ম্যানুয়াল ব্যবস্থাপনার কারণে এটি বর্তমানে বাস্তবায়নযোগ্য হয়নি।

দূর হয়নি আবাসন সংকট : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমান শিক্ষার্থী সংখ্যা ৪২ হাজারের বেশি হলেও মোট শিক্ষার্থীর ৫৩ শতাংশেরও বেশি হলের সিট থেকে বঞ্চিত। ডাকসুর তিন নম্বর ইশতেহার ছিল প্রথম বর্ষ থেকেই প্রত্যেক শিক্ষার্থীর বৈধ সিট নিশ্চিত করা। আবাসন সংকটের অস্থায়ী সমাধানে অস্থায়ী হোস্টেল বা মাসিক আবাসন ভাতা এবং স্থায়ী সমাধানে নতুন হল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়ার প্রতিশ্রুতিও ছিল। তবে আবাসন সংকটের স্থায়ী সমাধান হয়নি বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের।
ডাকসুর জিএস এস এম ফরহাদ বলেন, আবাসন সংকটের স্থায়ী সমাধানে ২ হাজার ৮৪১ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প আনা হয়েছে, যা আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকল্পের অংশ ছিল না। প্রকল্পটি অনুমোদন ও উদ্বোধনের জন্য ডাকসু ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন মিলে বিভিন্ন পর্যায়ে কাজ করেছে। তার দাবি, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে আবাসন সংকটের ৭০ শতাংশের বেশি সমাধান হবে এবং ঢাকার বাইরের শিক্ষার্থীদের সিট নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

নিশ্চিত হয়নি নিরাপদ ক্যাম্পাস : ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা জোরদারে ডাকসু বিভিন্ন উদ্যোগ ও দাবি জানালেও সার্বিক নিরাপত্তা এখনও নিশ্চিত হয়নি। বহিরাগতদের মাধ্যমে নারী শিক্ষার্থী হেনস্থাসহ বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি নির্দিষ্ট সীমানাপ্রাচীর না থাকায় ভবঘুরে, মাদকসেবী ও টোকাইদের অবাধ বিচরণও নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। ডাকসুর জিএস এস‌এম ফরহাদ বলেন, ক্যাম্পাসে নারীর নিরাপত্তা অন্যান্য সময়ের তুলনায় বেটার।

হয়নি ‘গার্ডিয়ান লাউঞ্জ’ : ডাকসুর ছয় নম্বর ইশতেহারে ছাত্রীদের হলে প্রবেশের বিধিনিষেধ শিথিল, পরিচয়পত্র প্রদর্শন সাপেক্ষে অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের প্রবেশের অনুমতি এবং অভিভাবকদের জন্য ‘গার্ডিয়ান লাউঞ্জ’ স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। তবে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে এসব প্রতিশ্রুতির পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে পারেনি ডাকসু।

ডাকসুর জিএস এস এম ফরহাদের দাবি, ছাত্রী হলের গেটে পাঞ্চ মেশিন স্থাপনের মাধ্যমে অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের প্রবেশ নিশ্চিত করতে প্রকল্পটির প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছিল। তবে প্রশাসনের অসহযোগিতার কারণে তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। একইভাবে হলের ভেতরে গার্ডিয়ান লাউঞ্জ স্থাপনের অনুমতিও প্রশাসনের কাছ থেকে পাওয়া যায়নি। 


এ ছাড়া কেন্দ্রীয়, বিজ্ঞান ও হল লাইব্রেরি এবং পাঠকক্ষ সম্প্রসারণ ও লাইব্রেরি ডিজিটালাইজেশন, শারীরিক প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীবান্ধব শ্রেণিকক্ষ, একাডেমিক কার্যক্রম ও বিশেষ ওয়াশরুম নিশ্চিত করা এবং হলের কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ ও কর্মচারী মূল্যায়ন পদ্ধতি চালুর মতো আরও কয়েকটি ইশতেহার এখনও বাস্তবায়িত হয়নি। এদিকে ডাকসুর এক বছরের কার্যক্রমে তাদের দেওয়া ইশতেহারের অধিকার‌ই বাস্তবায়ন করতে পেরেছে বলে দাবি অনেক শিক্ষার্থীদের।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রাফসান আহমেদ সময়ের আলোকে বলেন, কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও আমাদের দৈনন্দিন সংকটগুলোর বড় অংশ এখনও রয়ে গেছে। প্রশাসনের সহযোগিতা না থাকলে ডাকসুর অনেক উদ্যোগ বাস্তবায়ন কঠিন— এটি সত্য।

অভিযোগের বিষয়ে যা বলছে প্রশাসন : ইশতেহার বাস্তবায়নে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পর্যাপ্ত সহযোগিতা পাচ্ছে বলে বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ করে আসছেন ডাকসুর নেতৃবৃন্দরা। এসব অভিযোগের বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী সময়ের আলোকে বলেন, শিক্ষার্থীদের স্বার্থ রক্ষাই আমাদের দায়িত্ব। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতের বিষয়ে তিনি বলেন, ইতিমধ্যেই‌ পুষ্টিবিদদের নেতৃত্বে প্রশাসন কমিটি গঠন করেছে। তারা খাদ্যের মান উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে।

২ হাজার ৮৪১ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্বের অভিযোগের প্রেক্ষিতে তিনি বলেন, এত বড় প্রকল্পের কাজ অবশ্যই সঠিক পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। প্রকল্পটির কাজ খুব দ্রুত‌ই শুরু হবে।

পরবর্তী ডাকসু কবে : বর্তমান কার্যনির্বাহী কমিটি ২০২৫ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করে। সেই হিসেবে চলতি মাসের ১৪ তারিখেই ডাকসুর মেয়াদ শেষ হচ্ছে। তবে ডাকসুর গঠনতন্ত্রের ধারা অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পরবর্তী নির্বাচন সম্পন্ন করা সম্ভব না হলে বর্তমান কমিটি সর্বোচ্চ ৯০ দিন দায়িত্বে বহাল থাকতে পারবে। এর মধ্যে নির্বাচন না হলে সংসদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী সময়ের আলোকে বলেন, আমরা আমাদের জায়গা থেকে এগিয়ে যাচ্ছি। সবকিছু বিবেচনা করে ডাকসুর তফসিল ঘোষণা করা হবে।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি 
  বিষয়:   ডাকসু  প্রতিশ্রুতি  বাস্তবায়ন 


Loading...
Loading...
শিক্ষা- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: