ইতালির ভেনিসে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে যোগ দিতে গিয়ে হেনস্থার শিকার হয়েছেন অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধন। মেস্ত্রে এলাকার একটি পার্কে ভাই ও তার ছোট সন্তানের সঙ্গে অবস্থানকালে এই ঘটনা ঘটে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, কয়েকজন ব্যক্তি নিজেদের ‘ভেনিস ছাত্রলীগ’ ও ‘বঙ্গবন্ধুর সৈনিক’ পরিচয় দিয়ে বাঁধনকে ‘জুলাই জঙ্গি’ আখ্যা দেন। এ সময় তাকে গালাগাল, মারধর ও হেনস্থা করে। ঘটনার পর এক ভিডিও বার্তায় বাঁধন জানান, তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়েছে। তার গায়ে কোক ও পানি ছুড়ে মারা হয় এবং অভিনেত্রীর মোবাইল ফোন ফেলে দেওয়া হয়।
এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অভিনয়শিল্প ও নির্মাতারা। শিল্পীর ওপর হামলা বর্বরোচিত ও দুঃখজনক বলে মন্তব্য করেছেন তারা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চিত্রনায়িকা পরীমণি লিখেছেন, ‘বেশি কিছু না। কতগুলো কুকুরের বাচ্চা রাস্তায় ঘেউ ঘেউ করছে। এদের কাছে মানুষের বাচ্চার কান্না কিছুই ম্যাটার করে না। করেও নাই।’
সাফা কবির বলেন, ‘আমি ভীষণভাবে মর্মাহত, ক্ষুব্ধ এবং লজ্জিত আজমেরী হক বাঁধন আপু ও তার পরিবারকে যে পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। শিল্পী সত্য, ন্যায় ও মানুষের কথা বলবেন এটাই তো শিল্পীর স্বাধীনতা। কিন্তু সেই কণ্ঠের জন্য কেন তাকে বারবার মূল্য দিতে হবে? আমি চাই, এই ঘটনার সুষ্ঠু বিচার হোক এবং তিনি ন্যায়বিচার পান। একজন শিল্পীর কণ্ঠ, সম্মান ও নিরাপত্তা কখনোই রাজনীতির মূল্য হওয়া উচিত নয়।’
মৌসুমী হামিদ জানান, এই দেশে শিল্পী হওয়াটাও পাপের। কোনো শিল্পীর ওপর হামলাই কাম্য নয়। সেটা ৩২ নম্বরে হোক আর ভেনিসে। জীবনে কোনোদিন কোনো রাজনৈতিক দল করি নাই কিন্তু দেশের ভালো-মন্দ পরিস্থিতি নিয়ে সবসময় কথা বলে গেছি। বাঁধনের ওপর হামলার ঘটনায় যারা সমর্থন করছেন কিংবা রাজনৈতিক ঘটনার সঙ্গে তুলনা করছেন, তাদের উদ্দেশেও প্রশ্ন তোলেন এই অভিনেত্রী।
বাঁধনকে হেনস্থার ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে জাকিয়া বারী মম বলেন, শুধু ভেনিস ইস্যু না, কিছুই ঠিক হচ্ছে না! মাজার উচ্ছেদ, মুক্তিযুদ্ধের প্রতি অসম্মান, ঐতিহাসিক মুরাল ভেঙে ফেলা, সিনেমা প্রদর্শনী বন্ধের দাবি, নাচ-গান, শিল্প-সাহিত্য ও নৌকাবাইচের মতো সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে আপত্তি সমাজের জন্য উদ্বেগজনক।
মডেল, অভিনেত্রী ও আইনজীবী পিয়া জান্নাতুল বলেন, মানুষ দিন দিন এতটা নিষ্ঠুর আর সংবেদনহীন হয়ে যাচ্ছে, বিশেষ করে নারী আর শিল্পীদের প্রতি, যেটা সত্যিই ভাবায়। আমার কাছে আসল উন্নতি বোঝা যায় একজন মানুষ অন্যকে কতটা সম্মান করে, কতটা বুঝতে পারে, আর কতটা মানবিক থাকতে পারে, সেখানেই। দুঃখের বিষয়, এই জায়গাগুলোতেই আমরা যেন ধীরে ধীরে পিছিয়ে যাচ্ছি।
নির্মাতা আশফাক নিপুন ফেসবুকে লিখেছেন, ‘এটি অত্যন্ত নিন্দনীয় ও লজ্জাজনক ঘটনা। বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে বাংলাদেশের সিনেমার প্রতিনিধিত্ব করতে যাওয়া একজন শিল্পীর ওপর হামলা সত্যিই বর্বরোচিত ও দুঃখজনক। এমন ঘটনায় শিল্পীর নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। আশা করি, তিনি দ্রুত প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তা পাবেন এবং ঘটনার সুষ্ঠু বিচার হবে।’
নির্মাতা শঙ্খ দাশগুপ্ত বলেন, ‘ভেনিস বুঝি না, কান বুঝি না, সিনেমা বুঝি না, শিল্প বুঝি না, অর্জন বুঝি না, সম্মান বুঝি না! এমনকি দেশও বুঝি না। আমরা বুঝি— আওয়ামী লীগ না বিএনপি, হিন্দু না মুসলমান, আমার লোক না তোমার লোক। আজমেরী হক বাঁধন ভেনিসের মঞ্চে দাঁড়ালে আমরা দেখি না একজন বাংলাদেশি শিল্পী পৃথিবীর অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ চলচ্চিত্র উৎসবে নিজের দেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন। আমরা আগে খুঁজি তিনি কোন পক্ষের? একজন বাংলাদেশি বিদেশের মাটিতে আরেকজন বাংলাদেশিকে অপমান করে, হেনস্থা করে! কী অদ্ভুত আমাদের দেশপ্রেম!
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি