বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক স্বাভাবিক করার আলোচনা চললেও দুই দেশের সম্পর্কে জমে থাকা বরফ এখনও পুরোপুরি গলেনি। ব্রিকসকে ঘিরে যে কূটনৈতিক জল্পনা তৈরি হয়েছিল, আপাতত তার অবসান ঘটছে তারেক রহমানের দিল্লি সফর না করার সিদ্ধান্তে। বরং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিল্লিতে রাজনৈতিক তৎপরতা, তাকে ঘিরে ঢাকার ক্ষোভ এবং ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নিয়ে টানাপোড়েন নতুন করে সেই দূরত্বকে সামনে এনেছে।
ভারতের নয়াদিল্লিতে আগামীকাল শনিবার থেকে শুরু হচ্ছে ব্রিকসের ১৮তম শীর্ষ সম্মেলন। চলবে দুদিন। এতে অন্তত ২১টি দেশের সরকারপ্রধান ও প্রতিনিধিরা যোগ দেবেন বলে আশা করা হচ্ছে। তাদের মধ্যে ১১টি দেশ এই অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক জোটের সদস্য। বাকিরা অংশীদার। বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের সাত দেশের আঞ্চলিক জোট বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকেও সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তিনি যোগ দেবেন না বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। বৃহস্পতিবার তিনি বলেন, ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে অনুকূল পরিবেশ তৈরি হলে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের সম্ভাবনা আছে।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারেক রহমানকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি; আমন্ত্রণটি ছিল বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে একটি আউটরিচ অধিবেশনে অংশ নেওয়ার জন্য। সবশেষ ভারতীয় সংবাদমাধ্যমেও ঢাকার পক্ষ থেকে তারেক রহমানের অংশগ্রহণ না করার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
এর মধ্যেই ঢাকায় ভারতের নবনিযুক্ত হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সৌজন্য সাক্ষাৎ এবং দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বার্তা নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ফলে একদিকে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক টানাপোড়েন, অন্যদিকে যোগাযোগের দরজা খোলা রাখার চেষ্টা— এই দুই বিপরীত প্রবণতার মধ্যেই এগোচ্ছে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক।
ব্রিকস থেকে দূরে ঢাকা : ভারতের আয়োজনে এবার ব্রিকসের শীর্ষ সম্মেলন বসছে নয়াদিল্লিতে। ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বরের এই সম্মেলনে ১১ সদস্য দেশের নেতাদের পাশাপাশি অংশীদার দেশগুলোর প্রতিনিধিরাও থাকবেন। চীন, রাশিয়া, ইরানসহ গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর শীর্ষ নেতারা এই সম্মেলনে উপস্থিত থাকবেন। এ কারণে সম্মেলনটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে সম্মেলনের আউটরিচ পর্বে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল ভারত। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ঢাকা সেই আমন্ত্রণ গ্রহণ করছে না।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে ব্রিকসে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। অনুকূল পরিবেশ হলেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারতে দ্বিপক্ষীয় সফরে যাবেন। তিনি বলেন, ভারতের নয়াদিল্লিতে আসন্ন ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশের কোনো প্রতিনিধিও অংশ নেবেন না।
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ এই অনুপস্থিতি : ব্রিকস এখন কেবল অর্থনৈতিক সহযোগিতার প্ল্যাটফর্ম নয়। বিশ্বরাজনীতিতে উদীয়মান ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রভাব বাড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হিসেবেও এর গুরুত্ব বেড়েছে। ভারত, চীন ও রাশিয়ার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোও এতে যুক্ত হয়েছে।
এবারের সম্মেলন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে পশ্চিম এশিয়ার চলমান যুদ্ধ ও এর অর্থনৈতিক প্রভাবের কারণে। ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত— দুই ব্রিকস সদস্যের অবস্থানের পার্থক্য জোটের অভ্যন্তরেও চাপ তৈরি করেছে। ফলে এবারের সম্মেলনে অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বৈশ্বিক ভূরাজনীতি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হতে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত থাকলে একদিকে ভারতের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হতো, অন্যদিকে চীন, রাশিয়া, ইরান, ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা, মিসরসহ অন্য অংশগ্রহণকারী দেশের নেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের সুযোগও থাকত। কিন্তু ঢাকার বর্তমান সিদ্ধান্ত হলো— দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অনুকূল পরিবেশ তৈরি না হওয়া পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী ভারত সফর করবেন না।
পেছনে হাসিনা ইস্যু : ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে বর্তমান অস্বস্তির সবচেয়ে বড় কারণগুলোর একটি শেখ হাসিনা। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ভারতে অবস্থান করছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার অবস্থান এবং সেখান থেকে বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে তার বক্তব্য দীর্ঘদিন ধরেই ঢাকার জন্য অস্বস্তির কারণ। সাম্প্রতিক সময়ে দিল্লিতে সাংবাদিকদের সঙ্গে শেখ হাসিনার সরাসরি মতবিনিময়ের সুযোগ দেওয়াকে কেন্দ্র করে ঢাকার ক্ষোভ আরও বেড়েছে। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ওই আয়োজনের তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়। ঢাকার অভিযোগ, শেখ হাসিনা ও তার সহযোগীরা ওই মঞ্চ ব্যবহার করে বাংলাদেশের বৈধ সরকার ও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়েছেন।
বাংলাদেশের এই অবস্থানের পর ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়াল বলেছিলেন, ওই মঞ্চ থেকে বাংলাদেশের বৈধভাবে গঠিত সরকারের বিরুদ্ধে যে বক্তব্য দেওয়া হয়েছে, ভারত সরকার তা অনুমোদন করে না।
দিল্লির এই বক্তব্যকে অবশ্য ঢাকার জন্য একটি ইতিবাচক সংকেত হিসেবেও দেখা হচ্ছে। কারণ এর মাধ্যমে ভারত সরকার অন্তত আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার বক্তব্যকে নিজেদের অবস্থান হিসেবে গ্রহণ না করার বার্তা দিয়েছে। তবে তাতে মূল রাজনৈতিক অস্বস্তি কাটেনি।
সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা : সম্পর্কে টানাপোড়েন থাকলেও দুই দেশের কূটনৈতিক যোগাযোগ বন্ধ হয়নি। বরং বিভিন্ন পর্যায়ে যোগাযোগ অব্যাহত আছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। হাইকমিশনার এরই মধ্যে দুই দেশের সমস্যা আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। এটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। কারণ সাম্প্রতিক রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেও উভয় পক্ষই যদি যোগাযোগের পথ খোলা রাখে, তা হলে সম্পর্ক পুরোপুরি সংঘাতের দিকে যাওয়া থেকে ঠেকানো সম্ভব।
সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণেও ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে নতুন করে যোগাযোগ ও আস্থার প্রয়োজনীয়তা উঠে এসেছে। একই সময়ে ভারত-চীন সম্পর্কেও কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টা চলছে, যা দিল্লির বৃহত্তর আঞ্চলিক কৌশলের অংশ।
অর্থনীতিতে রাজনীতির চাপ : দুই দেশের সম্পর্কের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো— রাজনৈতিক সম্পর্ক খারাপ হলেও অর্থনৈতিক ও ভৌগোলিক বাস্তবতা বদলায়নি। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, যোগাযোগ, নদীর পানি এবং আঞ্চলিক সংযোগের মতো বহু বিষয় সরাসরি যুক্ত। ফলে রাজনৈতিক সম্পর্কের টানাপোড়েন দীর্ঘস্থায়ী হলেও তার প্রভাব শুধু কূটনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকার ঝুঁকি নেই।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল মান্নান সময়ের আলোকে বলেন, ভারতের সঙ্গে বর্তমান সরকারের যে পররাষ্ট্রনীতি, তা অনেকটা জনতুষ্টিমূলক বলে আমি মনে করি। ব্রিকস সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণ করা উচিত। তিনি বলেন, ব্রিকস সম্মেলনে ভারত ছাড়াও বিশ্বের আরও অনেক দেশ অংশগ্রহণ করবে। ফলে সেখানে অংশগ্রহণের মাধ্যমে শুধু ভারতের সঙ্গে নয়, অন্যান্য রাষ্ট্রের সঙ্গেও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হওয়ার সুযোগ রয়েছে। একটি রাষ্ট্রের সঙ্গে অন্য রাষ্ট্রের পারস্পরিক সহযোগিতা ও সুসম্পর্ক থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই কোনো একটি দেশের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়কে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের কূটনৈতিক যোগাযোগ ও সম্ভাবনাগুলো সীমিত করা উচিত নয়। বরং জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে সব দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ, পারস্পরিক সহযোগিতামূলক ও কার্যকর পররাষ্ট্রনীতি গড়ে তোলা প্রয়োজন। ভারতের সঙ্গে রাজনৈতিক অস্বস্তি থাকলেও ব্রিকসের মঞ্চে উপস্থিত থেকে অন্য দেশগুলোর সঙ্গেও সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার সুযোগ ছিল।
আওয়ামী লীগের জন্য রাজনৈতিক সুযোগ : বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে টানাপোড়েন দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলছে। শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করায় আওয়ামী লীগের জন্য এটি একটি রাজনৈতিক বাস্তবতা। অন্যদিকে বিএনপি সরকার ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন কাঠামো তৈরি করতে গিয়ে ভারসাম্য কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে রাজনৈতিক অস্বস্তির পুরোনো নজিরও আছে। ২০১৩ সালে ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি বাংলাদেশ সফরে এলে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া তার সঙ্গে নির্ধারিত সাক্ষাৎ বাতিল করেছিলেন। বিএনপির পক্ষ থেকে তখন নিরাপত্তার কারণ দেখানো হয়েছিল। পরে খালেদা জিয়াও হামলার আশঙ্কার কথা জানিয়েছিলেন। সেই ঘটনার পর ভারতীয় মহলে যে অস্বস্তি তৈরি হয়েছিল, সেটি ছিল দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্কের জন্য একটি নেতিবাচক দৃষ্টান্ত। এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। কিন্তু একটি মিল রয়েছে— দুই ক্ষেত্রেই অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ঘটনা ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। তখন প্রশ্ন ছিল, কেন খালেদা জিয়া ভারতের রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করলেন না। এখন প্রশ্ন— শেখ হাসিনার রাজনৈতিক উপস্থিতির কারণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কেন দিল্লির একটি বহুপক্ষীয় সম্মেলনে যাচ্ছেন না।
কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের সামনে এখন তিনটি বড় পরীক্ষা। প্রথমটি শেখ হাসিনা ইস্যু। দিল্লিতে তার অবস্থান ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে ঢাকার আপত্তি কীভাবে সামাল দেওয়া হবে, সেটিই সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়। দ্বিতীয়টি দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সম্পর্ক। রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে বাণিজ্য, জ্বালানি, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ ও সীমান্ত সহযোগিতায় যেন দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি না হয়, সে বিষয়ে দুই পক্ষকেই সতর্ক থাকতে হবে। তৃতীয়টি আঞ্চলিক কূটনীতি। ভারত, চীন, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র এবং দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের সঙ্গে ভারসাম্য রেখে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করাই নতুন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ। ব্রিকস সম্মেলনে না যাওয়ার সিদ্ধান্তে হয়তো সরকারের রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট হয়েছে। কিন্তু এর পরের পদক্ষেপ আরও গুরুত্বপূর্ণ— দিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক কোন পথে নেওয়া হবে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/আতা