সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইনে ড্রোন হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ (জিসিসি), মুসলিম ওয়ার্ল্ড লিগ, ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি), কাতার ও বাহরাইন। তারা হামলাকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর জন্য ‘বিপজ্জনক উসকানি’ হিসেবে উল্লেখ করে সৌদি আরবের প্রতি পূর্ণ সংহতি প্রকাশ করেছে।
শনিবার দেওয়া পৃথক বিবৃতিতে এসব দেশ ও সংগঠন জানায়, ইরাকের ভূখণ্ড থেকে উড়ে আসা কয়েকটি ড্রোন সৌদি আরবের রিয়াদ ও মদিনা অঞ্চলের ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইনে হামলা চালায়। এতে কয়েকজন আহত হওয়ার পাশাপাশি অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি হয়।
জিসিসির মহাসচিব জাসেম মোহাম্মদ আলবুদাইভি হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে এটিকে সৌদি আরবের নিরাপত্তা, ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার ওপর ‘অগ্রহণযোগ্য হুমকি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তাঁর মতে, এ হামলা আন্তর্জাতিক আইনেরও স্পষ্ট লঙ্ঘন।
ইরাক সরকারকে নিজ ভূখণ্ড যাতে সৌদি আরব বা অন্য কোনো প্রতিবেশী দেশের বিরুদ্ধে হামলার ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করতে দেওয়া না হয়, সে জন্য আরও কার্যকর ও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে জিসিসি। একই সঙ্গে সৌদি আরবের নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব, স্থাপনা, নাগরিক ও বাসিন্দাদের সুরক্ষায় দেশটির নেওয়া পদক্ষেপের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছে সংগঠনটি।
কাতারও হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছে, বেসামরিক ও অর্থনৈতিক স্থাপনায় হামলা আন্তর্জাতিক আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন এবং এটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য গুরুতর হুমকি। সৌদি আরব ইরাক সরকারকে পরিস্থিতি মোকাবিলায় সুযোগ দেওয়ার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেটিকে দায়িত্বশীল পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেছে দোহা।
বাহরাইনও হামলার নিন্দা জানিয়ে বলেছে, গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক স্থাপনায় হামলা জ্বালানি সরবরাহের নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলছে। দেশটি সৌদি আরবের প্রতি পূর্ণ সংহতি প্রকাশ করে জানিয়েছে, সৌদি আরবের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা বাহরাইনের নিজস্ব নিরাপত্তার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।
মুসলিম ওয়ার্ল্ড লিগের মহাসচিব শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুলকরিম আল-ইসা হামলাগুলোকে ‘অপরাধমূলক ও বিশ্বাসঘাতকতাপূর্ণ’ আখ্যায়িত করে বলেন, এসব হামলা ধর্মীয় নীতি, আন্তর্জাতিক রীতি ও মানবিক মূল্যবোধের পরিপন্থী। সৌদি আরবের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় দেশটির নেওয়া পদক্ষেপের প্রতি সংগঠনটির পূর্ণ সমর্থনের কথাও জানান তিনি।
ইসলামি সহযোগিতা সংস্থাও (ওআইসি) হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।
এর আগে বৃহস্পতিবার একাধিক হামলার পর সৌদি আরবের জ্বালানি মন্ত্রণালয় ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইনটি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়। হামলায় কয়েকজন আহত হন এবং তাঁদের চিকিৎসা দেওয়া হয়। পাইপলাইনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জরুরি ও বিশেষজ্ঞ দল মোতায়েন করা হয়েছে।
সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ড্রোনগুলো ইরাক থেকে উড়ে এসেছিল। ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জায়েদির অনুরোধে আপাতত পাল্টা হামলা না চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে রিয়াদ। তবে ভবিষ্যতে দেশের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেওয়ার অধিকার সৌদি আরব সংরক্ষণ করছে।
ইরাকও হামলার নিন্দা জানিয়ে দায়ীদের বিরুদ্ধে জরুরি তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে। দেশটির সরকার জানিয়েছে, কোনো দেশের বিরুদ্ধে হামলা চালাতে ইরাকের ভূখণ্ড বা আকাশসীমা ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না।
প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনটি সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলের তেলক্ষেত্র থেকে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে অপরিশোধিত তেল পরিবহন করে। হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে তেল রপ্তানির বিকল্প পথ হিসেবে আঞ্চলিক সংঘাতের মধ্যে পাইপলাইনটির গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
এর আগে ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুতিদের হামলায় সৌদি আরবের আবহা, খামিস মুশাইত, জাজান ও নাজরান এলাকার বেসামরিক ও জ্বালানি অবকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সৌদি জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এসব হামলায় নারী ও শিশুসহ ৭৩ জন বেসামরিক মানুষ আহত হয়েছেন।
সাম্প্রতিক পাইপলাইন হামলার ঘটনায় মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের মধ্যে সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামোর নিরাপত্তা এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল রপ্তানির বিকল্প পথগুলো নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সূত্র : আরব নিউজ
সময়ের আলো/কেএইচ