নয়াদিল্লিতে শুরু হচ্ছে ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন। ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর ভারতের রাজধানীতে বসতে যাওয়া এ সম্মেলন এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন বিশ্ব রাজনীতি গভীর বিভাজন, বাণিজ্যযুদ্ধ, জ্বালানি সংকট ও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে অস্থির। তার ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল ও ইরানের চলমান যুদ্ধ ব্রিকসের ভেতরের সম্পর্ককেও কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলেছে। ভারতের সভাপতিত্বে এবারের সম্মেলনের মূল প্রতিপাদ্য—‘Building for Resilience, Innovation, Cooperation and Sustainabilit’— অর্থাৎ উদ্ভাবন, সহযোগিতা ও টেকসই উন্নয়নের জন্য নির্মাণ। ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ১২-১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লির ভারত মণ্ডপমে সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হবে।
পুতিন-শি, থাকছেন ইরানের প্রেসিডেন্টও : এবারের সম্মেলনের সবচেয়ে আলোচিত দিকগুলোর একটি হলো বিশ্বের বড় শক্তিগুলোর শীর্ষ নেতাদের একই টেবিলে বসা। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান সম্মেলনে যোগ দিচ্ছেন। দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা, মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি এবং ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোয়ো সুবিয়ান্তোরও অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসও উপস্থিত থাকবেন।
তবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিনিধিত্ব হবে ভিন্ন মাত্রায়। ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের কারণে আবুধাবি ও তেহরানের সম্পর্ক মারাত্মকভাবে অবনতি হয়েছে। ফলে একই জোটের দুই সদস্যকে নিয়ে মধ্যপ্রাচ্য সংকটে একটি অভিন্ন ভাষা খুঁজে পাওয়া সম্মেলনের বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রুশ প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভও বলেছেন, ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতপার্থক্য যৌথ ঘোষণা তৈরির ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি করছে। তবে উভয়ের কাছে গ্রহণযোগ্য ভাষা খুঁজে পাওয়ার আশা করছে মস্কো।
ইরান যুদ্ধের ছায়া : এবারের সম্মেলনের ওপর সবচেয়ে বড় ছায়া ফেলেছে ইরান যুদ্ধ। ২০২৪ সালে ব্রিকসের সদস্য হওয়া ইরান এখন সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল সংঘাতের কেন্দ্রে। অন্যদিকে একই জোটের সদস্য সংযুক্ত আরব আমিরাতও ইরানের হামলার শিকার হয়েছে এবং আগস্টে তেহরানের সঙ্গে বাণিজ্য ও আর্থিক লেনদেন স্থগিত করেছে।
এর প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও। হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন প্রায় অচল হয়ে পড়ায় অপরিশোধিত তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরে উঠে গেছে। ফলে জ্বালানি আমদানিনির্ভর ব্রিকস সদস্যদের জন্য যুদ্ধটি শুধু ভূরাজনৈতিক সংকট নয়, বড় অর্থনৈতিক ঝুঁকিও।
এ অবস্থায় সম্মেলনে মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে যৌথ বিবৃতিতে কী ভাষা ব্যবহার করা হবে, সেটিই বিশেষ নজর কাড়ছে। একটি অভিন্ন অবস্থান তৈরি করতে পারলে ব্রিকস নিজেদের ‘গ্লোবাল সাউথ’-এর শক্তিশালী কণ্ঠ হিসেবে তুলে ধরতে পারবে। কিন্তু সদস্যদের মধ্যকার বিরোধ প্রকাশ্যে চলে এলে জোটের ঐক্য নিয়েই প্রশ্ন উঠতে পারে।
ডলারের বিকল্প নয়, বিকল্প লেনদেন ব্যবস্থা : এবার অর্থনৈতিক এজেন্ডাতেও বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত রয়েছে। ব্রিকসের অর্থমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নররা সম্মেলনের আগে আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারের দাবি তুলেছেন। তাদের বক্তব্য, বিশ্ব অর্থনীতিতে উদীয়মান ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর অবদান বাড়লেও আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ কাঠামোয় তাদের প্রতিনিধিত্ব যথেষ্ট নয়।
তারা আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থাকে আরও প্রতিনিধিত্বশীল, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা শুল্ক ও বাণিজ্যিক পদক্ষেপ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
এখানেই আসছে ব্রিকসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক প্রকল্প— সীমান্তপারের লেনদেন সহজ করা। ভারত এবারের সম্মেলনে সদস্য দেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডিজিটাল মুদ্রা বা ঈইউঈ-এর মধ্যে সংযোগ তৈরির প্রস্তাব এগিয়ে নিতে চায়। লক্ষ্য হলো ব্রিকস দেশগুলোর মধ্যে দ্রুত, কম খরচে এবং নিরাপদ আন্তঃদেশীয় লেনদেনের ব্যবস্থা তৈরি করা।
তবে এটিকে সরাসরি ‘ডলার উৎখাতের প্রকল্প’ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। রয়টার্সকে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভারতের অবস্থান হলো— ডলারকে বৈশ্বিক রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে সরিয়ে দেওয়া নয়; বরং নিজেদের মধ্যে লেনদেন আরও সহজ ও কার্যকর করা।
তবে এখানেও সমস্যা আছে। চীন-ভারত অবিশ্বাস, ইরান-আমিরাত দ্বন্দ্ব, বিভিন্ন দেশের ভিন্ন আর্থিক কাঠামো এবং মুদ্রা বিনিময়ের ভারসাম্যহীনতা ঈইউঈ-ভিত্তিক অভিন্ন ব্যবস্থা তৈরিকে কঠিন করে তুলতে পারে।
দিল্লি-বেইজিং বরফ কি কিছুটা গলবে : সম্মেলনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো শি জিনপিং ও নরেন্দ্র মোদির সম্ভাব্য বৈঠক। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ১১ সেপ্টেম্বর জানিয়েছে, শি ও মোদির মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের আয়োজন করছে দুই দেশ। শি বলেছেন, চীন ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে দীর্ঘমেয়াদি ও কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে এগিয়ে নিতে চায়।
শির এই সফর বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। সাত বছর পর তার ভারত সফর হচ্ছে। ২০২০ সালের সীমান্ত সংঘর্ষের পর দুই দেশের মধ্যে যে অবিশ্বাস তৈরি হয়েছিল, তা পুরোপুরি কাটেনি। অর্থনৈতিক সম্পর্কেও এখনও বিনিয়োগ, ভিসা, প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা নিয়ে নানা বাধা রয়েছে। ফলে দিল্লির ব্রিকস সম্মেলন শুধু বহুপক্ষীয় বৈঠক নয়; ভারত-চীন সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার মঞ্চ।
ব্রিকস এখন আর আগের পাঁচ দেশের জোট নয় : ব্রিকসের চেহারাও গত কয়েক বছরে অনেক বদলে গেছে। একসময় ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকাকে নিয়ে গঠিত জোটটি এখন ১১ সদস্যের। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মিসর, ইথিওপিয়া, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইন্দোনেশিয়া।
এই সম্প্রসারণ ব্রিকসের ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব বাড়িয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে সিদ্ধান্ত নেওয়াও কঠিন করেছে। কারণ সদস্য দেশগুলোর রাজনৈতিক স্বার্থ সবসময় এক নয়। ইরান ও আমিরাত একই জোটে থেকেও এখন সংঘাতের বিপরীত প্রান্তে। ভারত ও চীনের মধ্যেও দীর্ঘদিনের সীমান্ত ও কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা রয়েছে। সৌদি আরবের অবস্থানও অনেক ক্ষেত্রে নিজস্ব কৌশলগত স্বার্থনির্ভর। অর্থাৎ ব্রিকস যত বড় হয়েছে, একক কণ্ঠে কথা বলা তত কঠিন হয়েছে।
বাংলাদেশের প্রসঙ্গও আলোচনায় : দিল্লি সম্মেলনের সঙ্গে বাংলাদেশের নামও শেষ মুহূর্তে আলোচনায় এসেছে। ১১ সেপ্টেম্বরের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশকে ইজওঈঝ-এর সদস্য বা অংশীদার দেশ হিসেবে নয়, বিমসটেকের বর্তমান চেয়ার হিসেবে আউটরিচ অধিবেশনে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ব্যক্তিগতভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি; আমন্ত্রণটি ছিল বিমসটেকের চেয়ারম্যানের জন্য। ফলে বাংলাদেশ সম্মেলনে সরকারি প্রতিনিধি পাঠাচ্ছে না।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়ালও আগে জানিয়েছিলেন, বর্তমান চেয়ার হিসেবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে আউটরিচ সেশনে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর জন্য আলাদা দ্বিপক্ষীয় ভারত সফরের আমন্ত্রণ ফেব্রুয়ারি থেকেই রয়েছে।
ব্রিকসের সামনে আসল প্রশ্ন : সব মিলিয়ে এবারের সম্মেলনকে শুধু অর্থনৈতিক জোটের নিয়মিত বার্ষিক বৈঠন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ব্রিকস এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে একদিকে তার সদস্যসংখ্যা ও বৈশ্বিক প্রভাব বাড়ছে; অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ বিভাজনও স্পষ্ট হচ্ছে।
একদিকে তারা আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সংস্কার চাইছে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে একতরফা শুল্কের বিরোধিতা করছে এবং নিজেদের মধ্যে বিকল্প পেমেন্ট ব্যবস্থা গড়তে চাইছে। অন্যদিকে সদস্য দেশগুলোর মধ্যেই রয়েছে যুদ্ধ, কূটনৈতিক বিরোধ, সীমান্ত-অবিশ্বাস ও ভিন্ন ভিন্ন অর্থনৈতিক স্বার্থ।
যদি ইরান-সংযুক্ত আরব আমিরাত সংকটের মধ্যেও একটি যৌথ অবস্থান তৈরি করা যায়, আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার সংস্কার, আন্তঃদেশীয় লেনদেন ও বাণিজ্য সহযোগিতায় বাস্তব সিদ্ধান্ত আসে এবং ভারত-চীন সম্পর্কেও কিছুটা অগ্রগতি হয়— তবে এবারের সম্মেলন ব্রিকসের জন্য একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে। আর যদি সদস্যদের দ্বন্দ্বই সম্মেলনের ঘোষণাকে দুর্বল করে দেয়, তবে সম্প্রসারিত ব্রিকসের সবচেয়ে বড় দুর্বলতাটিও স্পষ্ট হয়ে উঠবে— অনেক শক্তি এক জায়গায় জড়ো হলেই যে একটি অভিন্ন শক্তি তৈরি হয়, তা নয়।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও