১৮তম ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতারা যখন নয়াদিল্লিতে জড়ো হচ্ছেন, তখন ব্রিকসের সদস্য দেশগুলোর কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি তুলে ধরছে ভারত। দিল্লি চাইছে, ব্রিকসের দেশগুলোর বাজারে ভারতীয় পণ্য যেন আরও সহজে প্রবেশ করতে পারে এবং ভারতও যেন এসব দেশে বেশি পণ্য বিক্রি করতে পারে।
কারণ ব্রিকসের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য দ্রুত বাড়লেও সেখানে বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে। ভারত যতটা পণ্য ব্রিকসের দেশগুলোতে রপ্তানি করছে, তার চেয়ে অনেক বেশি পণ্য আমদানি করছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে ব্রিকস দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২২৬.১ বিলিয়ন ডলারে। তবে ব্রিকসের সঙ্গে ভারতের মোট বাণিজ্যও অনেক বেড়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে যেখানে ব্রিকসের সঙ্গে ভারতের মোট বাণিজ্য ছিল প্রায় ২০৩ বিলিয়ন ডলার, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে হয়েছে প্রায় ৪১৭.৫ বিলিয়ন ডলার।
আরেকটি হিসাবে দেখা গেছে, ২০২৫ সালে ব্রিকসের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি ছিল প্রায় ২২৪ বিলিয়ন ডলার। ২০২১ সালে এই ঘাটতি ছিল ১১৭ বিলিয়ন ডলার।
এই ঘাটতির সবচেয়ে বড় কারণ চীন ও রাশিয়া। চীনের সঙ্গে ভারতের ঘাটতি ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি, আর রাশিয়ার সঙ্গে প্রায় ৫৫ বিলিয়ন ডলার।
ভারতের রফতানির তুলনায় আমদানি অনেক বেশি
ব্রিকসের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য বাড়লেও রপ্তানি ও আমদানির মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে।
গত পাঁচ বছরে ব্রিকস দেশগুলোতে ভারতের রপ্তানি ৪৮.৮ শতাংশ বেড়ে ৯৫.৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
অন্যদিকে, এসব দেশ থেকে ভারতের আমদানি বেড়েছে ১৩১.৮ শতাংশ। আমদানির পরিমাণ এখন প্রায় ৩২১.৮ বিলিয়ন ডলার।
এর ফলে ব্রিকস দেশগুলো এখন ভারতের মোট রপ্তানির মাত্র প্রায় ২২ শতাংশ নেয়। অথচ ভারতের মোট আমদানির ৪০ শতাংশের বেশি আসে ব্রিকসের দেশগুলো থেকে।
এই পার্থক্য কমানোই এখন ভারতের অন্যতম বড় লক্ষ্য।
সব ব্রিকস দেশের সঙ্গে পরিস্থিতি এক নয়
ব্রিকসের সব দেশের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি নেই। চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে বড় ঘাটতি থাকলেও মিসর ও ইথিওপিয়ার সঙ্গে ভারত বাণিজ্য উদ্বৃত্তে রয়েছে।
অর্থাৎ, ব্রিকসকে একটি একক বাজার হিসেবে দেখলে ভারতের পুরো বাণিজ্য পরিস্থিতি বোঝা যাবে না। জোটটির প্রতিটি দেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ও বাণিজ্যের ধরন আলাদা।
ব্রিকসের সাম্প্রতিক সম্প্রসারণের ফলে জোটটিতে এখন চীন ও ভারতের মতো বড় অর্থনীতির পাশাপাশি উপসাগরীয় তেল উৎপাদনকারী দেশ এবং আফ্রিকার দেশও রয়েছে।
শুধু বাণিজ্য ঘাটতি দেখলেই পুরো বিষয়টি বোঝা যাবে না
বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্রিকসের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ছে মানেই এই সম্পর্ক ভারতের জন্য খারাপ, এমনটা বলা ঠিক হবে না।
কোয়ান্টিভ অ্যাডভাইজরির প্রতিষ্ঠাতা সোহম ব্যানার্জির মতে, এই ঘাটতি মূলত দেখাচ্ছে যে ব্রিকসের সঙ্গে ভারতের অর্থনৈতিক সম্পর্ক এখনও একপেশে।
ভারত ব্রিকসের দেশগুলোর জন্য ক্রমেই বড় একটি বাজার হয়ে উঠছে। কিন্তু একইভাবে এসব দেশের বাজারে ভারতীয় পণ্য জায়গা করে নিতে পারছে না।
অর্থাৎ, ভারত ব্রিকসের কাছ থেকে অনেক বেশি পণ্য কিনছে, কিন্তু তাদের কাছে সেই তুলনায় কম পণ্য বিক্রি করতে পারছে।
রাশিয়ার সঙ্গে ঘাটতির বড় কারণ তেল
রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য ঘাটতির অন্যতম প্রধান কারণ হলো তেল আমদানি।
ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়া থেকে তুলনামূলক কম দামে বিপুল পরিমাণ তেল কিনছে ভারত। এতে ভারতের আমদানি ব্যয় বেড়েছে এবং রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতিও বড় হয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, রাশিয়া থেকে কম দামে তেল কেনার ফলে ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা কিছুটা শক্তিশালী হয়েছে। তাই রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতিকে শুধু নেতিবাচক হিসেবে দেখলে পুরো বিষয়টি বোঝা যাবে না।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গেও ভারতের ঘাটতির একটি বড় অংশ তৈরি হয়েছে পণ্য ও জ্বালানি বাণিজ্যের কারণে।
চীন নিয়ে ভারতের উদ্বেগ বেশি
তবে চীনের বিষয়টি ভারতের জন্য তুলনামূলক বেশি চিন্তার। চীন থেকে ভারত বিপুল পরিমাণে মেশিন, ইলেকট্রনিক পণ্য, বিভিন্ন যন্ত্রাংশ, রাসায়নিক এবং শিল্পে ব্যবহৃত কাঁচামাল আমদানি করে।
চীন থেকে ভারতের আমদানি ১৩০ বিলিয়ন ডলারের বেশি হলেও দেশটিতে ভারতের রপ্তানি ২০ বিলিয়ন ডলারেরও কম।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চীনের সঙ্গে এই ঘাটতি শুধু শুল্ক বাড়িয়ে কমানো সম্ভব নয়। কারণ চীন থেকে আমদানি করা অনেক পণ্য ভারতের নিজস্ব কারখানা ও শিল্পে উৎপাদনের কাজে ব্যবহৃত হয়।
তাই চীনের ওপর নির্ভরতা কমাতে হলে ভারতকে নিজেদের দেশে ইলেকট্রনিক পণ্য, যন্ত্রাংশ এবং উন্নত শিল্পপণ্য উৎপাদন বাড়াতে হবে।
ব্রিকসের নতুন উদ্যোগে ঝুঁকিও আছে
ব্রিকস দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য আরও সহজ করতে ভবিষ্যতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।
এর মধ্যে রয়েছে দেশগুলোর নিজস্ব মুদ্রায় বাণিজ্য, দ্রুত অর্থ লেনদেনের ব্যবস্থা, ডিজিটাল বাণিজ্য, পণ্য পরিবহনের ব্যবস্থা উন্নত করা এবং সীমান্তে কাস্টমস প্রক্রিয়া সহজ করা।
এসব উদ্যোগ বাণিজ্য বাড়াতে সাহায্য করতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ভারত যদি নিজেদের উৎপাদন ও রপ্তানি সক্ষমতা না বাড়ায়, তাহলে এই সুবিধাগুলো উল্টো ব্রিকসের দেশগুলো থেকে আরও বেশি পণ্য আমদানির পথ তৈরি করতে পারে।
অর্থাৎ, বাণিজ্য সহজ হলেও ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি আরও বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
ব্রিকসের বাজারে আরও বেশি ভারতীয় পণ্য চায় দিল্লি
এ কারণেই ব্রিকস সম্মেলনে ভারত শুধু বাণিজ্য বাড়ানোর কথা বলছে না। দিল্লি চাইছে, ভারতীয় পণ্য যেন ব্রিকসের দেশগুলোর বাজারে সহজে প্রবেশ করতে পারে।
এ জন্য ভারত কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছে।
এর মধ্যে রয়েছে— পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে বাজারে প্রবেশের নিয়ম সহজ করা, বিভিন্ন দেশের পণ্যের মান নিয়ে থাকা জটিলতা কমানো, সীমান্তে পণ্য ছাড়ানোর প্রক্রিয়া দ্রুত করা, অপ্রয়োজনীয় বাণিজ্য বাধা কমানো এবং ওষুধ, গাড়ি, প্রকৌশল পণ্য, খাদ্য, রাসায়নিক ও ডিজিটাল সেবা রফতানি বাড়ানো।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্রিকসের সব দেশের সঙ্গে একই ধরনের বাণিজ্য নীতি নিলে হবে না। বরং প্রতিটি দেশের সঙ্গে আলাদা কৌশল নিতে হবে।
রাশিয়ায় ভারতীয় পণ্য ও সেবা রফতানি বাড়ানো, চীনের সঙ্গে পণ্যের মান ও বাণিজ্যিক নিয়ম নিয়ে সমস্যা সমাধান করা এবং ইন্দোনেশিয়া ও ব্রাজিলের সঙ্গে বাণিজ্য আরও বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
একইভাবে সংযুক্ত আরব আমিরাতকে ব্যবহার করে মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার বাজারে ভারতীয় পণ্য আরও বেশি রপ্তানি করা যেতে পারে।
ভারতের সামনে আসল চ্যালেঞ্জ
ব্রিকসের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক কতটা সফল হচ্ছে, তা শুধু আগামী বছর বাণিজ্য ঘাটতি কমল কি না, এই একটি বিষয় দিয়ে বিচার করা যাবে না।
আসল বিষয় হলো, ভারত ব্রিকসের অর্থনীতিতে নিজের অবস্থান কতটা শক্তিশালী করতে পারছে।
এখন ভারত ব্রিকসের দেশগুলোর জন্য একটি বড় বাজার। কিন্তু ভবিষ্যতে ভারত চাইছে শুধু পণ্য কেনার দেশ হয়ে না থেকে ব্রিকসের উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে। অর্থাৎ, ব্রিকসের দেশগুলো থেকে পণ্য আমদানির পাশাপাশি ভারতীয় পণ্য, প্রযুক্তি ও সেবার রপ্তানিও বাড়াতে চায় দিল্লি।
এবারের ব্রিকস সম্মেলনে ভারতের অন্যতম বড় লক্ষ্য তাই হলো, ব্রিকসের বড় বাজার থেকে ভারত যেন ধীরে ধীরে ব্রিকসের বড় সরবরাহকারী দেশেও পরিণত হয়।
সূত্র : এনডিটিভি
সময়ের আলো/ইউএমএইচ