ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) শত শত কর্মকর্তা ইয়েমেনে অবস্থান করছেন বলে দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে বলা হয়েছে, ইরান-সমর্থিত হুতিদের সঙ্গে কাজ করে এসব কর্মকর্তা বাব আল-মান্দাব প্রণালি বন্ধের লক্ষ্যে সামরিক অভিযান সমন্বয়ে সহায়তা করছেন।
ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলে হুতিদের দ্রুত অগ্রগতির মধ্যেই ইরানের সরাসরি সম্পৃক্ততার এই অভিযোগ সামনে এসেছে। বৃহস্পতিবার কয়েক দিনের লড়াইয়ের পর সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি সরকারি বাহিনীর কাছ থেকে কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মোখা দখল করেছে হুতিরা। বাব আল-মান্দাব প্রণালি থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরের এই শহরটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পাশাপাশি হুতিরা গুরুত্বপূর্ণ হানিশ দ্বীপপুঞ্জের দিকেও অগ্রসর হচ্ছে বলে সামরিক সূত্রের বরাতে জানিয়েছে রয়টার্স।
এতে একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের দুটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ— হরমুজ ও বাব আল-মান্দাব— ঝুঁকির মুখে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের কারণে এরই মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
বাব আল-মান্দাব প্রণালি লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এই জলপথ দিয়েই এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করে এবং সুয়েজ খালের সঙ্গে সমুদ্রপথে যোগাযোগ তৈরি হয়।
প্রণালিটির নিয়ন্ত্রণ বা কার্যত বন্ধ হয়ে গেলে এশিয়া ও ইউরোপগামী জাহাজগুলোকে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হতে পারে। এতে পরিবহন ব্যয় ও যাত্রার সময় উভয়ই বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি পণ্য ও জ্বালানি সরবরাহেও বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
মোখা দখলের ফলে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথের কাছাকাছি হুতিদের সরাসরি অবস্থান তৈরি হয়েছে। জাতিসংঘের ইয়েমেনবিষয়ক দূত হ্যান্স গ্রুন্ডবার্গ এই অগ্রগতিকে সংঘাতের ‘নতুন ও আরও বিপজ্জনক পর্যায়’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
ইয়েমেনে শত শত আইআরজিসি কর্মকর্তার উপস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের এই মূল্যায়ন সত্য হলে, হুতিদের সামরিক অভিযানে তেহরানের সরাসরি সম্পৃক্ততা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে মনে করা হবে।
রয়টার্সের পৃথক এক প্রতিবেদনে ইয়েমেনি সরকারি, ইরানি ও আঞ্চলিক সূত্রের বরাতে বলা হয়েছে, হুতিদের উপকূলীয় অভিযান ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডের সরাসরি নির্দেশনায় পরিচালিত হচ্ছে।
তবে ইরান হুতিদের নিয়ন্ত্রণ করার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। হুতিরাও দাবি করে, তাদের সামরিক সিদ্ধান্ত নিজেদের নেতৃত্বের মাধ্যমেই নেওয়া হয়।
ইরান দীর্ঘদিন ধরে হুতিদের অস্ত্র, প্রযুক্তি ও সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে বিপুলসংখ্যক আইআরজিসি কর্মকর্তা ইয়েমেনে মোতায়েনের বিষয়টি সত্য হলে আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলকে হুমকির মুখে ফেলা অভিযানে ইরানের সরাসরি ভূমিকার মাত্রা আরও স্পষ্ট হবে।
একই সময়ে হরমুজ ও বাব আল-মান্দাব প্রণালিতে সংকট তৈরি হলে বৈশ্বিক জ্বালানি ও নৌবাণিজ্যে বড় ধরনের ধাক্কার আশঙ্কা রয়েছে।
হরমুজ উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল ও গ্যাস রপ্তানির প্রধান পথ। অন্যদিকে বাব আল-মান্দাব ভারত মহাসাগর, লোহিত সাগর ও সুয়েজ খালের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ নৌসংযোগ তৈরি করে।
দুটি নৌপথেই ঝুঁকি বাড়লে জাহাজ চলাচলকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল বিকল্প পথে যেতে হতে পারে। একই সঙ্গে যুদ্ধঝুঁকির কারণে জাহাজের বিমা ব্যয়ও বাড়তে পারে।
ইতোমধ্যে হুতিদের মোখা দখল এবং সৌদি আরবের তেল রপ্তানি নিয়ে উদ্বেগের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়েছে। শুক্রবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৭ ডলারের ওপরে উঠে যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, সংকটের প্রভাব শুধু ইয়েমেন বা মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। আরব উপদ্বীপের দুই পাশে অবস্থিত দুটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে ইরান-সমর্থিত শক্তির প্রভাব বাড়লে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে তেহরানের কৌশলগত চাপ তৈরির সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে।
সূত্র : গলফ নিউজ
সময়ের আলো/কেএইচ