মাত্র দেড় মাস বয়সে পাচারকারীদের হাত থেকে উদ্ধার হয়েছিল দুটি লেপার্ড শাবক। নিয়ম অনুযায়ী, তাদের রাখা হয়েছিল মাত্র তিন সপ্তাহের অস্থায়ী কোয়ারেন্টাইনে। কিন্তু সেই ‘সাময়িক’ বন্দিজীবনই যেন তাদের স্থায়ী ঠিকানা হয়ে গেছে। দেখতে দেখতে কেটে গেছে প্রায় এক দশক। শৈশব পেরিয়ে তারা এখন পূর্ণবয়স্ক। অথচ বদলায়নি তাদের থাকার জায়গা।
গাজীপুরের শ্রীপুরে অবস্থিত গাজীপুর সাফারি পার্কের বন্যপ্রাণী হাসপাতালের সংকীর্ণ কোয়ারেন্টাইন কক্ষেই বছরের পর বছর বন্দি রয়েছে লেপার্ড দুটি। যে প্রাণীর স্বাভাবিক জীবন গাছের ডালে, বিস্তীর্ণ এলাকায় ছুটে বেড়ানো ও শিকারকে ঘিরে— তার জীবন এখন সীমাবদ্ধ লোহার গ্রিলঘেরা ছোট দুটি কক্ষে।
বন বিভাগ ও পার্ক সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালে যশোর থেকে পুলিশ পাচারকারীদের কাছ থেকে লেপার্ডের দুটি শাবক উদ্ধার করে। পরে তৎকালীন খুলনা বিভাগীয় বন কর্মকর্তা শাবক দুটিকে গ্রহণ করে গাজীপুর সাফারি পার্কে পাঠান। বন্যপ্রাণী হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে নিয়ম অনুযায়ী তাদের তিন সপ্তাহের কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়। উদ্দেশ্য ছিল পর্যবেক্ষণ শেষে উপযুক্ত ব্যবস্থাপনার আওতায় নেওয়া। কিন্তু এক দশক পেরিয়ে গেলেও সেই অস্থায়ী ব্যবস্থার পরিবর্তন হয়নি।
সম্প্রতি সাফারি পার্কের কোয়ারেন্টাইন শেডে গিয়ে দেখা যায়, দুটি পৃথক ছোট কক্ষে রাখা হয়েছে লেপার্ড দুটিকে। পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় স্বাভাবিকভাবে চলাফেরার সুযোগ নেই। নেই গাছে ওঠা, দৌড়ানো কিংবা শিকারের অনুশীলনের মতো স্বাভাবিক আচরণের সুযোগও। মানুষের উপস্থিতি টের পেলেই কখনো কখনো ক্ষিপ্ত হয়ে লোহার গ্রিলে আছড়ে পড়ছে প্রাণী দুটি। তাদের আচরণে দীর্ঘদিনের বন্দিত্বের অস্বস্তি ও অস্থিরতার ছাপ স্পষ্ট বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন এমন সংকীর্ণ পরিবেশে রাখলে প্রাণীর স্বাভাবিক আচরণ ও শারীরিক-মানসিক সুস্থতা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ মনিরুল এইচ খান বলেন, জীবাণুমুক্ত রাখার জন্য সাধারণত সর্বোচ্চ চার সপ্তাহ পর্যন্ত কোয়ারেন্টাইনে রাখা যুক্তিযুক্ত। বছরের পর বছর কোয়ারেন্টাইনের মতো ছোট কক্ষে একটি বন্যপ্রাণীকে রাখা কোনোভাবেই স্বাভাবিক ব্যবস্থাপনা হতে পারে না।
তিনি বলেন, সাফারি পার্কের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে প্রাণীদের যতটা সম্ভব প্রাকৃতিক ও উন্মুক্ত পরিবেশে রাখা। অথচ লেপার্ড দুটিকে এভাবে দীর্ঘদিন ছোট ঘরে বন্দি রাখা সেই ধারণার পরিপন্থি। অনতিবিলম্বে বাঘ ও সিংহের মতো লেপার্ডের জন্যও উপযোগী এনক্লোজার তৈরি করা প্রয়োজন।
সাফারি পার্কে আসা দর্শনার্থীদের অনেকেই জানান, দেশের অধিকাংশ চিড়িয়াখানা বা বিনোদনকেন্দ্রে লেপার্ড দেখার সুযোগ খুব বেশি নেই। গাজীপুর সাফারি পার্কে এমন বিরল প্রাণী থাকার পরও যদি তাদের দর্শনার্থীদের চোখের আড়ালে সংকীর্ণ কক্ষে বন্দি থাকতে হয়, তাহলে সেটি যেমন দর্শনার্থীদের জন্য হতাশার, তেমনি প্রাণীগুলোর জন্যও দুর্ভাগ্যের।
তাদের মতে, উপযুক্ত এনক্লোজার তৈরি করে লেপার্ড দুটিকে স্বাভাবিক পরিবেশে রাখার পাশাপাশি দর্শনার্থীদের দেখার সুযোগ সৃষ্টি করা যেতে পারে। প্রয়োজন হলে আলাদা টিকিটের ব্যবস্থাও করা যেতে পারে।
বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এম. কে. এম ইকবাল হোসাইন চৌধুরী বলেন, সরকারের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল সম্প্রতি স্থানটি পরিদর্শন করেছে। সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
সময়ের আলো/আতা