জীববৈচিত্র্যের অন্যতম সমৃদ্ধ এলাকা মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান। নিশাচর ও মহাবিপন্ন প্রাণী ‘বেঙ্গল স্লো লরিস’ বা লজ্জাবতী বানরেরও প্রধান আবাসস্থল এটি। পাশাপাশি বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও অবমুক্তকরণের অন্যতম কেন্দ্র লাউয়াছড়া। তবে সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক প্রটোকল না মেনে উদ্ধার করা লজ্জাবতী বানর যত্রতত্র অবমুক্ত করায় আশঙ্কাজনক হারে প্রাণীটি মারা যাচ্ছে।
গবেষকদের মতে, উপযুক্ত বাসস্থান ও খাদ্যের নিশ্চয়তা ছাড়া হঠাৎ বনে ছেড়ে দেওয়ায় আঞ্চলিক দ্বন্দ্ব ও আবাসস্থল সংকটে পড়ছে অবমুক্ত করা বানর। এতে তাদের টিকে থাকার হারও কমে যাচ্ছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২২ সালের জুলাই থেকে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত লাউয়াছড়ায় রেডিও কলার পরিয়ে অবমুক্ত করা নয়টি লজ্জাবতী বানরের মধ্যে সাতটিই অল্প সময়ের মধ্যে মারা যায়। মূলত উপযুক্ত আবাসস্থলের অভাব এবং এলাকা নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে বনে থাকা অন্য বানরের সঙ্গে প্রাণঘাতী সংঘর্ষে তাদের মৃত্যু হয়েছে।
এদিকে বন উজাড়ের কারণে খাদ্যের সংকট তৈরি হওয়ায় অনেক লজ্জাবতী বানর লোকালয়ে চলে আসছে। এ সময় সড়ক ও রেলপথে কাটা পড়ে এবং বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যাচ্ছে অনেক প্রাণী। গবেষক হাসান আল-রাজীর সমন্বয়ে দেশি-বিদেশি গবেষকদের একটি দলের তথ্য অনুযায়ী, লাউয়াছড়ায় বর্তমানে প্রায় ২৩টি লজ্জাবতী বানর টিকে আছে।
প্রকৃতিপ্রেমীদের মতে, ধীরগতির চলাফেরা ও মায়াবী বড় গোল চোখের এই প্রাণী ভয় পেলে মুখ ঢেকে ফেলে। এ কারণেই এর নাম হয়েছে লজ্জাবতী বানর। প্রাণীটি বন্য এবং কিছুটা বিষাক্ত। তাই কোনোভাবেই এটি পোষা প্রাণী হিসেবে ঘরে রাখার উপযোগী নয়। লাউয়াছড়ার পুরোনো গাছ কাটা ও প্রাকৃতিক পরিবেশ ধ্বংসের কারণে তাদের খাদ্যের উৎসও দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ ফিরোজ জামান বলেন, বৈজ্ঞানিক প্রটোকল কঠোরভাবে মেনে না চললে বন্যপ্রাণী অবমুক্তকরণ কোনো ইতিবাচক ফল আনবে না।
তবে লজ্জাবতী বানর সংরক্ষণে কিছু উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। ২০২২ সাল থেকে জার্মানভিত্তিক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ‘প্লামপ্লরিস ইভি’ ও স্থানীয় বন বিভাগের যৌথ উদ্যোগে বিভিন্ন স্থান থেকে ২৩টি লজ্জাবতী বানর উদ্ধার করে সেবা-শুশ্রূষা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১৫টিকে ইতোমধ্যে বনে অবমুক্ত করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, লাউয়াছড়া, সাতছড়ি ও রেমা-কালেঙ্গার নিবিড় চিরহরিৎ বনে বিচরণ করা এই বিরল নিশাচর প্রাণীটিকে টিকিয়ে রাখতে হলে বন ধ্বংস রোধ, শিকার বন্ধের পাশাপাশি বৈজ্ঞানিক ও সঠিক অবমুক্তকরণ নীতিমালা কার্যকর করার বিকল্প নেই।
সময়ের আলো/জোই