জীবদ্দশায় হাত পেতে মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন। মানসিক ভারসাম্যহীন হওয়ায় স্থানীয়দের কাছে পরিচিত ছিলেন 'মপুর বাপ' নামে। তবে তার প্রকৃত নাম ওয়াহাব পাটোয়ারী। চরম দারিদ্র্য ও মানসিক অসুস্থতা সত্ত্বেও তার ভেতরে ছিল এক অদ্ভুত আত্মমর্যাদাবোধ। মৃত্যুর পর যেন কারও কাছে হাত পাততে না হয় বা সমাজ ও পরিবারের ওপর বোঝার কারণ হতে না হয়, সেজন্য জীবদ্দশাতেই ভিক্ষার টাকা জমিয়ে রেখে গেছেন নিজের জানাজা, দাফন-কাফন ও কুলখানির খরচের জন্য।
শুক্রবার ভোর রাত ৪টায় মনপুরা উপজেলার বিচ্ছিন্ন কলাতলী ইউনিয়নের কবির বাজার এলাকায় নিজের মেয়ের বাড়িতে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন ভারসাম্যহীন এই ভিক্ষুক ওয়াহাব পাটোয়ারী। তার এই মৃত্যু এবং শেষ বিদায়ের প্রস্তুতি মনপুরার মানুষের হৃদয়ে গভীর দাগ কেটেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘ দিন ধরে মনপুরার বিভিন্ন হাট-বাজার ও গ্রামে ঘুরে ঘুরে ভিক্ষাবৃত্তি করতেন ওয়াহাব পাটোয়ারী ওরফে 'মপুর বাপ'। বাহ্যিকভাবে তিনি ভারসাম্যহীন হলেও নিজের শেষ বিদায় নিয়ে ছিলেন অত্যন্ত সচেতন। মৃত্যুর পর জানাজা, কাফনের কাপড় এবং জানাজা-পরবর্তী খাবারের জন্য যে তিনি টাকা জমিয়ে রাখছেন, তা মৃত্যুর আগেই স্বজন ও এলাকার মানুষকে জানিয়ে গিয়েছিলেন।
ভারসাম্যহীন ভিক্ষুক সত্তরোর্ধ্ব ওয়াহাব পাটোয়ারী ওরপে মফুর বাপ উপজেলার মনপুরা ইউনিয়নের আন্দিরপাড় গ্রামের বাসিন্দা।
জানা যায়, ভারসাম্যহীন ভিক্ষুক ওয়াহাব পাটোয়ারী সারাদিন বাজারে বাজারে ঘুরে ভিক্ষা করতেন। ভিক্ষা করে যা টাকা-পয়সা পেতেন তা পুঁটলি (পলিথিন মোড়ানো) করে রাখতেন। পরে রাতে সাবেক চেয়ারম্যান আলাউদ্দিন হাওলাদারের কাছে ওই টাকা-পয়সা আমানত রাখতেন। মৃত্যুর দিন ভারসাম্যহীন ভিক্ষুক রাতে মেয়ের বাড়িতে যান। সেখানে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
ভিক্ষুকের মৃত্যুর পর চেয়ারম্যানের কাছে আমানত রাখা গচ্ছিত টাকা-পয়সার পুঁটলি গণনা করে ৮ হাজার নয়শত পঁচাশি টাকা পাওয়া যায়। তখন আলাউদ্দিন চেয়ারম্যান ব্যক্তিগত ৫ হাজার টাকা, সাবেক যুবদল সভাপতি রাজিব চৌধুরী ৫ হাজার টাকা ও ব্যবসায়ী শাহীন দুই হাজার টাকা তুলে দেন ওই ভিক্ষুকের আত্মীয়দের কাছে।
স্থানীয়রা জানান, ওয়াহাব পাটোয়ারী মাথা সমস্যার পর থেকে পরিবারের সাথে থাকতেন না। পথে-বাজারে ভিক্ষা করতেন। পথে-ঘাটে ঘুমাতেন। পরিবার ও আত্নীস্বজনদের কাছে যেতেন না। ভিক্ষে করা টাকা সাবেক চেয়ারম্যানের কাছে রাখতেন। মৃত্যুরপর সাবেক চেয়ারম্যান ভিক্ষুকের জমানো টাকা ফেরত দিয়ে অনন্য নিদর্শন স্থাপন করেছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
হাজিরহাট ইউনিয়নের স্থানীয় বাসিন্দা আবদুর রহমান আবেগঘন কণ্ঠে বলেন,"আমরা সচরাচর দেখি মানুষের মৃত্যুর পর পরিবার বা সমাজকে দাফন-কাফনের দায়িত্ব নিতে হয়। কিন্তু 'মপুর বাপ' জীবদ্দশায় যা করে দেখালেন, তা অভাবনীয়। একজন ভারসাম্যহীন মানুষের এই আত্মমর্যাদাবোধ সমাজের জন্য এক বিরাট বার্তা।
এই ব্যাপারে সাবেক চেয়ারম্যান আলাউদ্দিন হাওলাদার ও উপজেলা যুবদলের সাবেক সভাপতি রাজিব চৌধুরী জানান, হৃদয়বিদারক ঘটনা। নিজের দাফনের টাকা নিজে জমিয়ে রেখেছেন। ওয়াহাব পাটোয়ারী ( ভিক্ষুক) দাদা'র অসিয়ত মতে সবকিছু করা হবে। স্থানীয়রা সবাইমিলে আয়োজন করে খাওয়ানো হবে।
সময়ের আলো/আতা