ধারণক্ষমতার ৩ গুণ মানুষ, হাফ ছাড়ার জায়গা নেই

এসএম আলমগীর

জাতীয়

রাজধানী ঢাকা শহরকে বিভিন্ন নামে ডাকা হয়। কখনো বলা হয় ঢাকা ‘মসজিদের শহর’, ‘রিকশার শহর’। আবার কখনো ডাকা হয় ‘ভেনিস

2026-09-13T01:49:44+00:00
2026-09-13T01:49:44+00:00
 
  রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৯ ভাদ্র ১৪৩৩
রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
জাতীয়
ধারণক্ষমতার ৩ গুণ মানুষ, হাফ ছাড়ার জায়গা নেই
এসএম আলমগীর
প্রকাশ: রোববার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১:৪৯ এএম 
ছবি : সংগৃহীত
রাজধানী ঢাকা শহরকে বিভিন্ন নামে ডাকা হয়। কখনো বলা হয় ঢাকা ‘মসজিদের শহর’, ‘রিকশার শহর’। আবার কখনো ডাকা হয় ‘ভেনিস অব দ্য ইস্ট’ বা ‘মেগাসিটি ইন ক্রাইসিস’। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যার তীরে গড়ে ওঠা এই নগরী ছিল মসলিনের বাণিজ্যিক রাজধানী। কিন্তু এখন ঢাকা পরিচিতি পেয়েছে অন্য কারণে। 

এটি এখন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মেগাসিটি, পৃথিবীর সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ নগর এলাকা এবং একই সঙ্গে ‘বসবাসের সবচেয়ে অনুপযোগী’ শহরগুলোর একটি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস), জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থাগুলোর তথ্য বলছে— পরিকল্পিত ধারণক্ষমতার প্রায় ৩ গুণ মানুষ নিয়ে দমবন্ধ হয়ে আসছে রাজধানীতে। 

প্রতি বছর ৩ থেকে ৪ লাখ মানুষ গ্রাম ছেড়ে ঢাকায় আসে। এই হারে চলতে থাকলে ২০৫০ সালে ঢাকা হবে পৃথিবীর ১ নম্বর জনবহুল শহর। প্রশ্ন হলো— অবকাঠামো, পানি, বায়ু ও নাগরিক সেবা নিয়ে এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে ধারণ করার মতো সক্ষমতা কি ঢাকার আছে?

ঢাকা সিটির জনসংখ্যা আসলেই কত— তা নিয়েও আছে অনেক গল্প। ঢাকায় আসলেই মানুষ কত। জনসংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তি হয়, কারণ ‘ঢাকা’ শব্দটি দিয়ে ৩ ধরনের এলাকা বোঝানো হয়। বিবিএসের সর্বশেষ পপুলেশন অ্যান্ড হাউজিং সেনসাস-২০২২ অনুসারে ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকার (উত্তর ও দক্ষিণ) জনসংখ্যা ১ কোটি ২ লাখ ৭৮ হাজার ৮২ জন। এটি হচ্ছে ঢাকার মূল শহর। এর আয়তন মাত্র ৩০৬ বর্গকিলোমিটার। আর বৃহত্তর ঢাকার (এর মধ্যে গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, সাভার, কেরানীগঞ্জের অংশ পড়েছে) আয়তন ২,৫৬৯ বর্গকিলোমিটার। বিবিএসের সর্বশেষ তথ্য মতে এই মেগা সিটির জনসংখ্যা ৩ কোটি ৭৪ লাখ ২৯ হাজার ১৫৬ জন। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার হিসাবে এটি ২১.৩ শতাংশ। 

তথ্য ঘেঁটে দেখা যাচ্ছে ২০ বছর আগে ২০০৬ সালে বৃহত্তর ঢাকাতে মানুষ ছিল প্রায় ১ কোটি ২৮ লাখ। অর্থাৎ ২০ বছরে জনসংখ্যা প্রায় তিনগুণ বেড়েছে। ইউএন জিআই ওয়ার্ল্ড আরবানাইজেশন প্রসপেক্টাসের রিপোর্ট বলছে, এই প্রবৃদ্ধির কারণে ঢাকা ইতিমধ্যেই বিশ্বের দ্বিতীয় জনবহুল শহরে পরিণত হয়েছে। জাপানের টোকিওর পরেই ঢাকার অবস্থান। ঘনত্বের দিক দিয়েও এটি রেকর্ড। প্রতি বর্গমিটারে মানুষের বসবাস ৪.৫ জন। আর প্রতি বর্গকিলোমিটার বসবাস করছে ৪৪ হাজার ৫০০ জন। আবার ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউ-২০২৬ এর তথ্যমতে ঢাকা মেগা সিটিতে প্রতি বর্গকিলোমিটারে মানুষের বসবাস প্রায় ২৯ হাজার ৭০ জন। 

আবার অন্য আরেক তথ্যমতে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ঢাকায় মানুষের বসবাস ৮২ হাজার জন। সহজ করে বলঔেñ প্রতি বর্গমিটারে ঢাকা মেগা সিটিতে ৪.৫ জন মানুষ বাস করছে। অর্থাৎ একটি ১০ ফুট বাই ১০ ফুট রুমে গড়ে ৪ থেকে ৫ জন মানুষ বসবাস করছে। আন্তর্জাতিক নগর পরিকল্পনার আদর্শ বলছে— একটি বাসযোগ্য শহরে ঘনত্ব প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৩০ হাজার জনের নিচে থাকা উচিত এবং ৬০ শতাংশ জায়গা রাস্তা, পার্ক, খোলা জায়গা ও জলাশয়ের জন্য রাখতে হবে। অথচ ঢাকায় রাস্তা, পার্ক, খোলা জায়গা ও জলাশয়ের জন্য রয়েছে মাত্র ২৪ শতাংশ জায়গা। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকা তার ধারণক্ষমতার অন্তত ২ থেকে ৩ গুণ বেশি মানুষ ধারণ করছে। এখন কথা হচ্ছে— কেন ঢাকামুখী এই স্রোত? আসলে ঢাকার এই জনস্রোত প্রাকৃতিক নয়, এটি নীতিগত ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের ফল। প্রথমত কর্মসংস্থানের কেন্দ্রীকরণ— দেশের মোট জিডিপির ৪০ শতাংশ আসে ঢাকা বিভাগ থেকে। ৫১ শতাংশ ফরমাল সেক্টরের চাকরি, ৮০ শতাংশ ব্যাংকের হেড অফিস, সব বড় গার্মেন্টস বায়ার অফিস ঢাকায়। 

গ্রামের একজন তরুণের কাছে কর্মসংস্থানের জন্য ঢাকার বিকল্প নেই। দ্বিতীয়ত সেবার বৈষম্য— উন্নত চিকিৎসা সুবিধার ৭০ শতাংশ মেলে ঢাকায়, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও ভালো স্কুল-কলেজের বড় অংশ ঢাকাকেন্দ্রিক। চিকিৎসা, উচ্চশিক্ষা বা ভালো চাকরির জন্য মানুষকে ঢাকায় আসতেই হয়। 

তৃতীয় কারণ হচ্ছে— জলবায়ু ও দুর্যোগ। প্রতি বছর বন্যা, নদীভাঙন, লবণাক্ততা ও খরার কারণে উপকূলীয় ১৯টি জেলা ও উত্তরাঞ্চল থেকে মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছে। তাদের শেষ আশ্রয় ঢাকা। 


বিশ্বব্যাংকের রিপোর্ট বলছে, ২০৫০ সালের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশে ১ কোটি ৩০ লাখ মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হবে, যাদের বড় অংশ আসবে ঢাকায়।

চতুর্থ কারণ হচ্ছে অসম উন্নয়ন। চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও খুলনার মতো বিভাগীয় শহরগুলোতে ঢাকার মতো বিনিয়োগ ও সুযোগ-সুবিধা নেই। ফলে সবাই রাজধানীমুখী হচ্ছে। 

জনসংখ্যার এই আধিক্যের কারণে চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে :  জনসংখ্যার এই আধিক্যের কারণে ঢাকার ভেঙে পড়া নাগরিক জীবন ও ঢাকার অবকাঠামো হাঁপিয়ে উঠেছে। ঢাকায় যানজট ও সময়ের অপচয় হচ্ছে প্রচুর। তথ্যমতে ঢাকা বিশ্বের সবচেয়ে যানজটপূর্ণ শহর। গড়ে একজন মানুষ দিনে ৫ ঘণ্টা রাস্তায় কাটায়। বছরে প্রায় ৩ দশমিক ২ বিলিয়ন কর্মঘণ্টা নষ্ট হয় যার আর্থিক ক্ষতি ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি।

জনসংখ্যার আধিক্যের কারণে ঢাকায় আবাসন সংকটও প্রকট হয়ে উঠেছে। প্রতি ১০০ জনের জন্য বাথরুম ৩টি। নিরাপদ পানীয় জল ও স্যানিটেশন সবার ভাগ্যে জোটে না। বাড়িভাড়া প্রতি বছর ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বাড়ছে। ঢাকার ৯০ শতাংশ পানি আসে ভূগর্ভ থেকে। পানির স্তর বছরে ৩ মিটার করে নামছে। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন ২০৩০ সালের মধ্যে ভূগর্ভস্থ পানি শেষ হয়ে যাবে। গ্যাসের চাপ নেই, লোডশেডিং নিত্যদিনের। 
জনসংখ্যার আধিক্যের কারণে ঢাকায় পরিবেশের বিপর্যয় হচ্ছে। ১৯৬০ সালে ঢাকার ৮০ দশমিক ৫ শতাংশ জায়গা ছিল সবুজ ও জলাশয়। ২০০৫ সালে তা নেমে আসে ৪১ দশমিক ৩ শতাংশে, আর বর্তমানে সেটি মাত্র ১ দশমিক ৯ শতাংশে নেমে এসেছে। এ ছাড়া বায়ুদূষণেও ঢাকা নিয়মিত বিশ্বে ১ থেকে ৩ নম্বরে থাকে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পরিস্থিতিও বেশ জটিল ঢাকায়। এই মেগা সিটিতে প্রতিদিন ৬ হাজার ৫০০ টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এর মাত্র ৩৭ শতাংশের মতো সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা হয়। বাকিটা নদী, খাল ও রাস্তায় ফেলা হয় বলে এক পরিসংখ্যানে জানা যায়। 

২০৫০ সালের ঢাকার পরিস্থিতি কেমন হবে : এভাবে যদি জনসংখ্যা বাড়তেই থাকে তা হলে ২০৫০ সালে ঢাকার জনসংখ্যা হবে ৫ কোটি ২১ লাখ। এই সংখ্যা দিয়ে ঢাকা ছাড়িয়ে যাবে টোকিও, দিল্লি ও সাংহাইকে। হবে বিশ্বের ১ নম্বর জনবহুল শহর। এই ৫ কোটি মানুষকে রাখতে হলে আরও ২টি ঢাকা সিটি করপোরেশন সমান নতুন শহর বানাতে হবে। কিন্তু জমি কোথায়? ইতিমধ্যেই ঢাকার চারপাশের জলাভূমি, খাল ও নদী ভরাট করে আবাসন গড়ে উঠছে। এই হারে জনসংখ্যা বাড়লে ২০৫০ সালে ঘনত্ব দাঁড়াবে প্রতি বর্গ কিমিতে ১ দশমিক ৭ লাখ। তখন পানি, বিদ্যুৎ, নিকাশি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পুরোপুরি ভেঙে পড়বে। নগরবিদরা বলছেন, তখন ঢাকা ‘মানবিক বিপর্যয়ের’ মুখে পড়বে।

উত্তরণের পথ কী আছে : বিশেষজ্ঞদের প্রস্তাব ঢাকার জনসংখ্যার পরিস্থিতি কঠিন হলেও নিয়ন্ত্রণে আনা অসম্ভব নয়। নগর পরিকল্পনাবিদ ও অর্থনীতিবিদরা ৪টি মূল সমাধানের কথা বলছেন। প্রথমত— কঠোরভাবে অনেক কিছু বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। সরকারি-বেসরকারি সব অফিস, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্প-কারখানাকে ঢাকার বাইরে নিতে হবে। গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, মানিকগঞ্জে ‘স্যাটেলাইট সিটি’ গড়ে তুলে রাজধানীর ফাংশন ভাগ করতে হবে।

দ্বিতীয়ত জেলা শহরের উন্নয়ন করতে হবে। প্রতিটি বিভাগীয় শহরকে ‘মিনি ঢাকা’ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। সেখানে আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পাঞ্চল স্থাপন করলে ঢাকামুখী স্রোত ৫০ শতাংশ কমে যাবে।
তৃতীয়ত গণপরিবহনে বিপ্লব ঘটাতে হবে। ব্যক্তিগত গাড়ি কমিয়ে মেট্রো, বিআরটি ও ওয়াটার বাসের নেটওয়ার্ক ৩ গুণ বাড়াতে হবে। বর্তমান ৬টি মেট্রো লাইনের কাজ দ্রুত শেষ করতে হবে।

চতুর্থত রাজউকের ড্যাপ ঠিকমতো বাস্তবায়ন করতে হবে। রাজউকের ডিটেইল এরিয়া প্ল্যানে বলা আছে ৬০ শতাংশ জায়গা খোলা রাখতে হবে। খাল দখল বন্ধ, জলাভূমি রক্ষা ও সবুজায়ন বাড়াতে হবে।

নগরবিদরা বলছেন, এখনই সময় কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার। ঢাকা শুধু একটি শহর নয়, এটি দেশের ১৮ কোটি মানুষের স্বপ্নের ঠিকানা। কিন্তু জনসংখ্যার আধিক্য সেই স্বপ্নকে দুঃস্বপ্নে পরিণত করছে। যদি এখনই পরিকল্পিত বিকেন্দ্রীকরণ, টেকসই নগরায়ণ ও জলবায়ু অভিযোজনে বিনিয়োগ না করা হয়, তা হলে ২০৫০ সালের ৫ কোটি মানুষের ঢাকা হবে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মানবিক সংকটপূর্ণ রাজধানী শহরের উদাহরণ। 

রাজধানী বাঁচানো মানে শুধু ঢাকাকে বাঁচানো নয়, বাংলাদেশের অর্থনীতি ও ভবিষ্যতকেও বাঁচানো। নীতি-নির্ধারক, নাগরিক সমাজ ও সাধারণ মানুষ-সবার সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়। তাই সময় ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে— ঢাকাকে কি বসবাসযোগ্য রাখতে চাই, নাকি এটাকে একটি ‘কংক্রিটের জঙ্গল’ হিসেবে দেখতে চাই।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে
  বিষয়:   ধারণক্ষমতা  মানুষ  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: