ভোরের প্রথম আলো ফুটতেই একজন কৃষক নেমে পড়েন মাঠে। কাঁধে লাঙল, হাতে বীজ, হৃদয়ে একরাশ আশা। তার চোখে থাকে শুধু নিজের পরিবারের স্বপ্ন নয়, থাকে অগণিত মানুষের খাদ্যের নিশ্চয়তা। তিনি জানেন না, বছরের শেষে প্রকৃতি কতটুকু দেবে। তবু তিনি মাটিতে বীজ বপন করেন, আকাশের দিকে তাকিয়ে বৃষ্টির অপেক্ষা করেন এবং মহান আল্লাহর ওপর ভরসা রাখেন। এই ভরসা, এই শ্রম ও এই ত্যাগই কৃষিকে শুধু একটি পেশা নয়; বরং ঈমান, ইবাদত ও মানবকল্যাণের এক অনন্য মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
পৃথিবীর ইতিহাসে যত সভ্যতার উত্থান ঘটেছে, প্রায় প্রতিটি সভ্যতার ভিত্তিই ছিল কৃষি। মানুষের খাদ্য, শিল্পের কাঁচামাল, অর্থনীতির প্রাণচাঞ্চল্য— সবকিছুর সঙ্গে কৃষির গভীর সম্পর্ক রয়েছে। উন্নত দেশ হোক বা উন্নয়নশীল, কৃষি ছাড়া কোনো রাষ্ট্র দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে না।
কিন্তু ইসলাম কৃষিকে কেবল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হিসেবে দেখেনি; বরং এটিকে মানবসেবা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং সদকার মর্যাদায় উন্নীত করেছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বারবার বৃষ্টি, ভূমি, শস্য, ফলমূল ও উদ্ভিদের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। তিনি ইরশাদ করেন, ‘তিনিই সেই সত্তা, যিনি আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেন। অতঃপর আমি তা দিয়ে সব ধরনের উদ্ভিদ উৎপন্ন করি’ (সুরা আনআম : ৯৯)।
এই আয়াত আমাদের শেখায়, কৃষি কেবল মানুষের শ্রমের ফল নয়, এটি আল্লাহর রহমত ও নেয়ামতেরও প্রকাশ। কৃষক বীজ বপন করেন, কিন্তু বীজে প্রাণ সঞ্চার করেন আল্লাহ। মানুষ জমি প্রস্তুত করে, কিন্তু ফসল ফলানোর প্রকৃত ক্ষমতা একমাত্র রব্বুল আলামিনের।
কৃষিকাজের মর্যাদা সবচেয়ে সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে নবীজি (সা.)-এর একটি হাদিসে। আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘যেকোনো মুসলিম একটি ফলবান গাছ রোপণ করে কিংবা কোনো ফসল ফলায়, অতঃপর তা থেকে মানুষ, পাখি কিংবা কোনো পশু আহার করে, তবে তা তার জন্য সদকা হিসেবে গণ্য হয়’ (বুখারি : ২৩২০)।
এই হাদিস ইসলামের মানবিক সৌন্দর্যের এক অপূর্ব দৃষ্টান্ত। এখানে সদকার পরিধি শুধু মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; একটি পাখি, একটি পশু কিংবা পথের কোনো ক্ষুধার্ত প্রাণীও যদি সেই গাছ বা ফসল থেকে উপকৃত হয়, তবু কৃষকের আমলনামায় সওয়াব লেখা হতে থাকে।
ভাবুন, একজন কৃষক হয়তো একটি আমগাছ রোপণ করলেন। বহু বছর পরে তিনি পৃথিবীতে নেই; কিন্তু সেই গাছ এখনও ফল দিচ্ছে, মানুষ খাচ্ছে, পাখি ঠোকর দিচ্ছে, পথিক ছায়ায় বিশ্রাম নিচ্ছে। প্রতিটি উপকারের সঙ্গে সঙ্গে তার আমলনামায় নেকি যোগ হতে থাকছে। এ যেন এমন এক বিনিয়োগ, যার মুনাফা মৃত্যুর পরও বন্ধ হয় না।
কৃষিকাজের প্রতি নবীজি (সা.) কতটা উৎসাহ দিয়েছেন তা আরেকটি হাদিসে স্পষ্ট। তিনি বলেন, ‘যদি কেয়ামত সংঘটিত হওয়ার মুহূর্তেও কারও হাতে একটি খেজুরের চারা থাকে, আর সে যদি তা রোপণ করতে সক্ষম হয়, তবে সে যেন তা রোপণ করে’ (মুসনাদে আহমদ)। এই শিক্ষা শুধু বৃক্ষরোপণের আহ্বান নয়; এটি আশা, দায়িত্ববোধ ও নির্মাণমুখী জীবনের শিক্ষা। পৃথিবীর শেষ মুহূর্ত পর্যন্তও একজন মুমিন ধ্বংস নয়, সৃষ্টি ও কল্যাণের পথেই চলবে— এটাই ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি।
বাংলাদেশের অর্থনীতি, খাদ্যনিরাপত্তা এবং গ্রামীণ জীবনের কেন্দ্রবিন্দু কৃষি। লাখ লাখ কৃষকের পরিশ্রমে আমাদের ঘরে ভাত ওঠে, বাজারে সবজি আসে, ফলে ভরে ওঠে মৌসুম। অথচ দুঃখজনকভাবে সমাজের একাংশ এখনও কৃষিকে অবহেলার চোখে দেখে। অথচ ইসলামের দৃষ্টিতে একজন সৎ কৃষক কেবল একজন উৎপাদক নন; তিনি মানবকল্যাণের সেবক এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পথে চলমান একজন ইবাদতগুজার।
কৃষিকাজের মাধ্যমে সদকার সওয়াব অর্জনের বাস্তব দিকও বহু। ফলের গাছ রোপণ করা সদকায়ে জারিয়ার অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। অনাবাদি জমি আবাদ করা সমাজের জন্য কল্যাণকর কাজ। মানুষ, পশু-পাখি কিংবা পরিবেশ— যেই উপকৃত হোক না কেন, তার প্রতিদান আল্লাহর কাছে সংরক্ষিত থাকে। অন্যের জমিতে সহযোগিতা করা, বৃক্ষরোপণ করা কিংবা কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখাও নেক আমলের অন্তর্ভুক্ত।
আজ আমরা জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্যসংকট এবং বেকারত্বের মতো বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এই বাস্তবতায় কৃষি শুধু একটি সম্ভাবনাময় খাত নয়, এটি জাতীয় নিরাপত্তারও অংশ। শিক্ষিত তরুণরা যদি আধুনিক প্রযুক্তি, গবেষণা ও উদ্ভাবনকে কাজে লাগিয়ে কৃষিতে এগিয়ে আসেন, তবে একদিকে দেশের খাদ্যব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হবে, অন্যদিকে হালাল উপার্জন ও মানবকল্যাণের মাধ্যমে আখেরাতের পুঁজিও সমৃদ্ধ হবে।
একজন কৃষক যখন মাটিতে বীজ বপন করেন, তখন তিনি কেবল ফসল ফলান না; তিনি মানুষের জীবন রক্ষা করেন, ক্ষুধার বিরুদ্ধে লড়াই করেন এবং আল্লাহর সৃষ্টি জগতের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখেন। তার ঘামে যেমন রিজিকের সুবাস থাকে, তেমনি থাকে ইবাদতের সৌরভও। তাই কৃষিকে অবহেলার চোখে দেখার কোনো সুযোগ নেই। যে হাত মাটিতে বীজ বপন করে, সেই হাতই আগামী দিনের জীবন রচনা করে। যে কৃষক ঘাম ঝরান, তার পরিশ্রমেই সমাজের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। আর যখন সেই শ্রম আল্লাহর সন্তুষ্টির নিয়তে হয়, তখন তা শুধু জীবিকা নয়— ইবাদত, সদকা এবং আখেরাতের জন্য অফুরন্ত সঞ্চয়ে পরিণত হয়। আসুন, কৃষিকে কেবল একটি পেশা হিসেবে নয়; বরং ইবাদত, মানবসেবা ও পরিবেশ রক্ষার মহান দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করি।
বেশি বেশি বৃক্ষরোপণ করি, অনাবাদি জমি আবাদ করি, কৃষিকে সম্মান করি এবং কৃষকদের মর্যাদা দিই। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে হালাল উপার্জন, কল্যাণকর আমল এবং কৃষিকাজের মাধ্যমে সদকায়ে জারিয়ার সওয়াব অর্জনের তওফিক দান করুন।
লেখক : আলেম ও প্রাবন্ধিক
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি