পার্থিব ও পরকালীন জীবন ধ্বংস করে জুয়া

সাইফুল ইসলাম চৌধুরী

ইসলাম

জুয়া এমন এক সর্বনাশা সামাজিক ও নৈতিক ব্যাধি, যা মানুষের ব্যক্তিজীবন, পারিবারিক সুখ-শান্তি, সামাজিক শৃঙ্খলা এবং পরকালীন মুক্তির আশা ধ্বংস

2026-09-12T10:48:14+00:00
2026-09-12T10:48:14+00:00
 
  শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৮ ভাদ্র ১৪৩৩
শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ইসলাম
পার্থিব ও পরকালীন জীবন ধ্বংস করে জুয়া
সাইফুল ইসলাম চৌধুরী
প্রকাশ: শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১০:৪৮ এএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
জুয়া এমন এক সর্বনাশা সামাজিক ও নৈতিক ব্যাধি, যা মানুষের ব্যক্তিজীবন, পারিবারিক সুখ-শান্তি, সামাজিক শৃঙ্খলা এবং পরকালীন মুক্তির আশা ধ্বংস করে দেয়। বাহ্যিকভাবে জুয়ায় সাময়িক কোনো কোনো ক্ষেত্রে আর্থিক লাভ দেখা গেলেও এর অন্তরালে লুকিয়ে থাকে বিশাল ধ্বংসযজ্ঞ। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ তায়ালা অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় এই অভিশপ্ত বিষয়ের অশুভ পরিণতি সম্পর্কে মানবজাতিকে সতর্ক করেছেন। 

পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘লোকেরা আপনাকে মদ ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে; আপনি তাদের বলে দিন, এ দুটির মধ্যে রয়েছে মহাপাপ এবং মানুষের জন্য কিছু উপকারিতাও রয়েছে, তবে এগুলোর পাপ বা ক্ষতি উপকারিতা অপেক্ষা অনেক বেশি বড়।’ (সুরা বাকারা : ২১৯)

ইসলামের দৃষ্টিতে জুয়া কেবল একটি আর্থিক অপরাধই নয়, বরং এটি সরাসরি মানুষকে মহান স্রষ্টার স্মরণ ও ইবাদত থেকে গাফিল করে দেয়। আল্লাহ তায়ালা মুমিনদের উদ্দেশে পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেছেন, ‘হে মুমিনগণ! এই যে মদ, জুয়া, প্রতিমা এবং ভাগ্যনির্ধারক তীর— এসব শয়তানের অপবিত্র কাজ ছাড়া আর কিছু নয়। সুতরাং তোমরা এগুলো বর্জন করো, যাতে তোমরা প্রকৃত কল্যাণপ্রাপ্ত হতে পারো’ (সুরা মায়েদা : ৯০)।

এই আয়াতের মাধ্যমে জুয়াকে শয়তানের সরাসরি প্ররোচনা ও অপবিত্র হাতিয়ার হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে, যা মানুষের কল্যাণ ও আত্মিক উন্নতির পথকে চিরতরে রুদ্ধ করে দেয়। জুয়ার ভয়াবহতা এতটাই তীব্র যে, নবীজি (সা.) অত্যন্ত কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তার কোনো সঙ্গীকে বলে যে, এসো তোমার সঙ্গে জুয়া খেলি, তার উচিত এর কাফফারা হিসেবে দান-খয়রাত করা’ (বুখারি : ৬৩০১)। 

একজন সাধারণ আহ্বানকারীকে যদি কেবল জুয়া খেলার প্রস্তাব দেওয়ার কারণে দান-সদকা করার মাধ্যমে প্রায়শ্চিত্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়, তবে যে ব্যক্তি সরাসরি এই খেলায় লিপ্ত হয় তার অপরাধের মাত্রা ও শাস্তি কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়।

বর্তমান একবিংশ শতাব্দীতে এসে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রসারের ফলে স্মার্টফোন এবং ইন্টারনেটের সহজলভ্যতার কারণে জুয়ার রূপ ও পরিসরে এসেছে বিরাট পরিবর্তন। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির যুগে অসংখ্য সরলমনা মানুষ এটিকে নিছক বিনোদন, খেলাধুলা বা উপার্জনের মাধ্যম মনে করে নিজের অজান্তেই এই সর্বনাশা পেশাদার জুয়ার জালে আটকে পড়ছেন। 

বর্তমান সময়ে বহুল পরিচিত অনলাইন জুয়া ও বেটিং প্ল্যাটফর্মগুলোর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন অনলাইন ক্যাসিনো ও লাইভ স্পোর্টস বেটিং সাইট, যেখানে ক্রিকেট ম্যাচের প্রতি বল, ওভার কিংবা উইকেটের ওপর টাকা বাজি ধরা হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ওয়ান এক্সবেট, মেলবেট, মোস্টবেট, বেটউইনার, টুয়েন্টিটু বেট, ক্রিকএক্স ও বাজি লাইভ ইত্যাদি। 

এ ছাড়া ড্রিম ইলেভেন বা মাই ইলেভেন সার্কেলের মতো ফ্যান্টাসি স্পোর্টস অ্যাপ, রামি সার্কেল বা জংলি রামির মতো অনলাইন কার্ড বা তাস গেম, লুডো কিং, লুডো স্টার বা লুডো ক্লাবের মতো অনলাইন লুডো গেম এবং কালার ট্রেডিং গেমের মতো বিভিন্ন থার্ডপার্টি বেটিং সাইট আজ তরুণ প্রজন্মকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

জুয়ার বহুমুখী ক্ষতিকর দিকের মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক হলো মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কে ফাটল ধরা এবং আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে সরে যাওয়া। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘শয়তান তো কেবল এটাই চায় যে, মদ ও জুয়ার মাধ্যমে তোমাদের পরস্পরের মাঝে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করে দিক এবং আল্লাহর স্মরণ ও সালাত কায়েম করা থেকে তোমাদের বিরত রাখুক। সুতরাং তোমরা কি এখনও বিরত হবে না’ (সুরা মায়েদা : ৯১)। 


তা ছাড়া জুয়ার মাধ্যমে সম্পূর্ণ অনৈতিক ও অবৈধ পন্থায় অন্যের সম্পদ গ্রাস করা হয়, যা শরিয়তে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। হারাম উপার্জনে গঠিত খাদ্য ও অর্থের মাধ্যমে কোনো মানুষের ইবাদত, জিকির বা দোয়া আল্লাহর দরবারে কবুল হয় না। 

এ প্রসঙ্গে সহিহ মুসলিমের একটি হাদিসে নবীজি (সা.) দীর্ঘ সফরকারী এমন এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করেছেন, যে ধূলি-ধূসরিত চুলে আকাশের দিকে হাত তুলে দোয়া করে বলে হে আমার রব! অথচ তার খাদ্য হারাম, পানীয় হারাম, পোশাক হারাম এবং সে হারাম আহারে লালিত-পালিত। এমন ব্যক্তির দোয়া কীভাবে কবুল হতে পারে? (মুসলিম : ২২৩৬)

জুয়ার লোভে অন্ধ হয়ে মানুষ নিজের জীবনে শুধু আর্থিক লোকসানই ডেকে আনে না; বরং পারিবারিক কলহ, মানসিক অশান্তি, হতাশা এবং একপর্যায়ে আত্মহত্যার মতো জঘন্য পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়। জুয়ার টাকার জোগান দিতে গিয়ে বহু মানুষ চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই ও দুর্নীতির মতো সামাজিক অপরাধে জড়িয়ে পড়ে, যা রাষ্ট্রীয় শান্তিকে বিপন্ন করে। আর পরকালে জুয়াড়ি ব্যক্তির সবচেয়ে বড় শাস্তি হলো জান্নাত থেকে চিরবঞ্চিত হওয়া। 

এ বিষয়ে সতর্ক করে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন যে, মাতা-পিতার অবাধ্য সন্তান, জুয়াড়ি, উপকার করার পর তা প্রকাশ করে খোঁটাদানকারী এবং সর্বদা মদ্যপায়ী ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না (নাসাঈ : ৫৬৭২)। 

দুনিয়ার সামান্য অর্থের লোভে যারা জুয়ার মতো জঘন্য নেশায় নিজেদের জীবন বরবাদ করে দেয়, তাদের জন্য দুনিয়া ও আখেরাত উভয় জগতেই অপেক্ষা করছে অপমৃত্যু, সামাজিক লাঞ্ছনা ও পরকালের চিরস্থায়ী ধ্বংস। তাই সময় থাকতেই আমাদের সবার উচিত এই সর্বনাশা মরণব্যাধি থেকে সম্পূর্ণভাবে দূরে থাকা এবং আত্মশুদ্ধির পথে ফিরে আসা।


সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে
  বিষয়:   পার্থিব  পরকালীন  জীবন  ধ্বংস  জুয়া 


Advertisement
Loading...
Loading...
ইসলাম- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: