ইরান যুদ্ধ যেভাবে বদলে দিচ্ছে ব্রিকসের সম্পর্ক

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

ইরান যুদ্ধের প্রভাব এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক চাপের মধ্যে নতুন বৈশ্বিক ব্যবস্থা গড়ার তাগিদ আরও জোরালো হয়েছে ব্রিকস জোটে। তবে সদস্য

2026-09-13T18:55:29+00:00
2026-09-13T18:55:29+00:00
 
  রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৯ ভাদ্র ১৪৩৩
রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আন্তর্জাতিক
ইরান যুদ্ধ যেভাবে বদলে দিচ্ছে ব্রিকসের সম্পর্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: রোববার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৬:৫৫ পিএম 
চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। ছবি : এনডিটিভি
ইরান যুদ্ধের প্রভাব এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক চাপের মধ্যে নতুন বৈশ্বিক ব্যবস্থা গড়ার তাগিদ আরও জোরালো হয়েছে ব্রিকস জোটে। তবে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে স্বার্থ ও দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ফলে পশ্চিমা প্রভাবের বিকল্প শক্তি হিসেবে ব্রিকসের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা বাড়লেও অভিন্ন অবস্থান তৈরি করা এখনো কঠিন। 

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আয়োজনে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস সম্মেলনে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) ক্রাউন প্রিন্স শেখ খালেদ বিন মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান এবং দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসাসহ জোটের নেতারা অংশ নেন। 

সম্মেলনে মোদি বলেন, ব্রিকসের সদস্যদের শুধু বৈশ্বিক নিয়ম মেনে চলা দেশ হিসেবে না থেকে ক্রমেই ‘নিয়ম নির্ধারণকারী’ ভূমিকায় যেতে হবে। 

তবে ব্রিকসের সদস্যরা পরস্পরের স্বাভাবিক মিত্র নয়। ভারত ও চীনের মধ্যে ২০২০ সালে সীমান্ত সংঘর্ষে প্রাণহানি হয়েছিল। আবার মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে ইরান ও ইউএই ভিন্ন অবস্থানে রয়েছে। ইরান যুদ্ধের সময় ইউএইর মতো ব্রিকস সদস্য দেশের দিকেও তেহরান থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে।

তারপরও এসব দেশের শীর্ষ নেতাদের একই টেবিলে বসাতে পারা ভারতের কূটনৈতিক সক্ষমতার বড় উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সম্মেলনটি ইরান যুদ্ধ ও পরিবর্তিত বৈশ্বিক পরিস্থিতির মধ্যে সদস্য দেশগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক পুনর্মূল্যায়নের সুযোগও তৈরি করেছে।

পশ্চিমা প্রভাবের বিকল্প হতে চায় ব্রিকস 

চীন, রাশিয়া ও ইরানের মতো সদস্যদের কাছে ব্রিকস যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিম ইউরোপের প্রভাব কমানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম। তবে ভারত ব্রিকসকে পশ্চিমবিরোধী জোট হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে আগ্রহী নয়। 

সম্মেলনে মোদিও স্পষ্ট করে বলেন, ব্রিকস ‘কারও বিরুদ্ধে নয়’। 

ভারতের এই অবস্থানের কারণ, দেশটি একই সঙ্গে পরস্পরের সঙ্গে বিরোধপূর্ণ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখতে চায়। ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত অনিল ত্রিগুনায়াতের মতে, ব্রিকসকে পশ্চিমবিরোধী জোটে পরিণত করার আগ্রহ কিছু সদস্যের থাকলেও ভারত সেই পথে হাঁটছে না। বরং যুদ্ধের সময় কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন এবং সদস্যদের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছে দিল্লি।

যৌথ ঘোষণায় সমঝোতা, এড়ানো হয়েছে বিতর্কিত বিষয়

ব্রিকস সম্মেলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্জনগুলোর একটি ছিল যৌথ ঘোষণা গ্রহণ। এর আগে চলতি বছরের দুবার ব্রিকস মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক কোনো যৌথ বিবৃতি ছাড়াই শেষ হয়েছিল।

এবার ‘নয়াদিল্লি ঘোষণা’ গৃহীত হলেও সদস্য দেশগুলোর মধ্যে তীব্র মতবিরোধ রয়েছে, এমন বিষয়গুলো এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ নিয়ে ঘোষণায় সর্বোচ্চ সংযমের আহ্বান জানানো হয়েছে। বেসামরিক অবকাঠামো ও শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার নিন্দা করা হলেও কোনো পক্ষকে সরাসরি দায়ী করা হয়নি।

ফিলিস্তিন ইস্যুতে দুই-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির বিরোধিতা এবং দখলদারিত্বকে বৈধতা দেয় বা দীর্ঘায়িত করে, এমন পদক্ষেপের বিরোধিতা করা হয়েছে। তবে বিষয়গুলোকে বিদ্যমান জাতিসংঘের প্রস্তাবের কাঠামোর মধ্যেই রাখা হয়েছে। 

উল্লেখযোগ্যভাবে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কোনো উল্লেখ নেই। আগের ব্রিকস ঘোষণাগুলোর তুলনায় এটি একটি বড় পরিবর্তন।

বাণিজ্য ইস্যুতেও সতর্ক অবস্থান নেওয়া হয়েছে। ঘোষণায় ‘বৈষম্যমূলকভাবে বাড়তে থাকা শুল্ক’ নিয়ে উদ্বেগ জানানো এবং একতরফা নিষেধাজ্ঞার নিন্দা করা হয়েছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের নাম সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক প্রবীণ দোন্থির মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের নিন্দা করেও কোনো দেশের নাম উল্লেখ না করা ভারতের কূটনৈতিক অবস্থানেরই প্রতিফলন। তবে শুল্ক নিয়ে তুলনামূলকভাবে শক্ত বক্তব্য আসায় ভারত বাণিজ্যিক চাপ নিয়ে নিজের অসন্তোষ প্রকাশের সুযোগ নিয়েছে বলেও তিনি মনে করেন।


ট্রাম্পের চাপের প্রভাব

ব্রিকসের ওপর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থানের প্রভাবও সম্মেলনে স্পষ্ট ছিল। এর আগে ট্রাম্প ব্রিকসের বিভিন্ন প্রস্তাবকে, বিশেষ করে আন্তঃসীমান্ত বাণিজ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডিজিটাল মুদ্রা ব্যবহারের সম্ভাবনাকে ‘আমেরিকাবিরোধী’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন।

ফলে অনেক সদস্যই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে যেতে চান না। যৌথ ঘোষণায় যুক্তরাষ্ট্রের নাম না থাকা এবং বাণিজ্যিক বিষয়ে তুলনামূলক সতর্ক ভাষা ব্যবহারের পেছনে এই বাস্তবতাও কাজ করেছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

ইরান-আমিরাত বৈঠকে নতুন বার্তা

সম্মেলনের বাইরে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনাগুলোর একটি ছিল ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ও ইউএইর ক্রাউন প্রিন্স শেখ খালেদের মুখোমুখি বৈঠক। যুদ্ধ শুরুর পর দুই দেশের মধ্যে এটিই সর্বোচ্চ পর্যায়ের সরাসরি বৈঠক বলে জানা গেছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক হামলা এবং অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে ইরান এই সম্মেলনের মাধ্যমে দেখাতে চেয়েছে যে তারা আন্তর্জাতিকভাবে একা নয়।

যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা, ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ এবং ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধের চাপ মোকাবিলার পাশাপাশি পেজেশকিয়ান ব্রিকসের সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে আরও গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ার ওপর জোর দিয়েছেন। মালয়েশিয়া, ভারত ও ইথিওপিয়ার মতো দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও তিনি গুরুত্ব দেন।

সাত বছর পর দিল্লিতে শি, বরফ গলছে ভারত-চীন সম্পর্কে

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের জন্যও সম্মেলনটি গুরুত্বপূর্ণ। সাত বছর পর তিনি দিল্লি সফর করেন।

২০২০ সালের সীমান্ত সংঘর্ষের পর ভারত-চীন সম্পর্কে গভীর অবিশ্বাস তৈরি হলেও সাম্প্রতিক সময়ে সেই উত্তেজনা কিছুটা কমেছে। তবে দুই দেশের মধ্যে বড় ধরনের বাণিজ্য ঘাটতি এখনো রয়েছে, যার ভার চীনের দিকে বেশি।

সম্মেলনের ফাঁকে মোদি ও শির মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ করমর্দন হয়। তবে মোদির সঙ্গে শির প্রচলিত আলিঙ্গন দেখা যায়নি। শি ২৪ ঘণ্টারও কম সময় দিল্লিতে ছিলেন এবং শনিবার রাতে মোদির দেওয়া নৈশভোজেও অংশ নেননি।

তারপরও দুই দেশের জটিল সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে এই সফরকে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

দুই নেতার বৈঠকের পর সরকারি বিবৃতিতে বলা হয়, তারা ব্যবসায়িক সম্পর্ক ও পরিবহন যোগাযোগ জোরদার করার পাশাপাশি বাণিজ্যের প্রতিবন্ধকতা দূর করার বিষয়ে একমত হয়েছেন।

ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত অনিল ত্রিগুনায়াত মনে করেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারত-চীন সম্পর্ক ধীরে ধীরে উষ্ণ হচ্ছে এবং দুই পক্ষের মধ্যে একসঙ্গে কাজ করার আগ্রহ রয়েছে। তবে বাস্তবে কতটা অগ্রগতি হবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

তার ভাষায়, আমাদের বিশ্বাস করতে হবে, তবে তার আগে যাচাই করতে হবে। 

সামনে বড় প্রশ্ন

দিল্লির সম্মেলন দেখিয়েছে, পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর বাইরে ব্রিকস এমন একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে পারে যেখানে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোও আলোচনা ও সমঝোতার সুযোগ পায়।

তবে বড় প্রশ্ন হলো, এই আলোচনা শেষ পর্যন্ত কতটা কার্যকর নতুন বৈশ্বিক ব্যবস্থা তৈরি করতে পারবে।

ব্রিকসের সদস্যরা যে বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় পরিবর্তন চান, সে বিষয়ে তাদের মধ্যে ক্রমেই ঐকমত্য তৈরি হচ্ছে। কিন্তু সেই নতুন ব্যবস্থা ঠিক কেমন হবে এবং কীভাবে তা বাস্তবায়ন করা হবে, এ নিয়ে মতপার্থক্য এখনো যথেষ্ট গভীর।

ইরান যুদ্ধ, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক চাপ এবং ভারত-চীন সম্পর্কের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে ব্রিকস তাই একদিকে যেমন নতুন সম্ভাবনার ক্ষেত্র তৈরি করছে, অন্যদিকে জোটটির অভ্যন্তরীণ বিভাজনও আরও স্পষ্ট করে তুলছে।


সময়ের আলো/ইউএমএইচ
  বিষয়:   ইরান যুদ্ধ  চীনা প্রেসিডেন্ট  শি জিনপিং  ভারত  প্রধানমন্ত্রী  নরেন্দ্র মোদি  রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট  ভ্লাদিমির পুতিন 


Advertisement
Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: