ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের দ্রুত অগ্রগতি এবং সৌদি আরবের ওপর একের পর এক হামলার কারণে কঠিন পরিস্থিতিতে পড়েছে সৌদি আরব। হুথিদের বিরুদ্ধে সামরিকভাবে বড় ধরনের পদক্ষেপ নিলে বড় যুদ্ধ শুরু হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। আবার চুপ থাকলেও সৌদি আরবের নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক প্রভাব হুমকির মুখে পড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরব এখন এমন এক পরিস্থিতিতে রয়েছে যেখানে প্রায় সব বিকল্পের সঙ্গেই বড় ধরনের ঝুঁকি জড়িয়ে আছে।
হুথিদের দ্রুত অগ্রগতি
সম্প্রতি ইরান-সমর্থিত হুথিরা ইয়েমেনের গুরুত্বপূর্ণ পেরিম দ্বীপ এবং মোখা বন্দর দখল করেছে। এসব এলাকা লোহিত সাগরের প্রবেশপথ বাব আল-মান্দেব প্রণালির কাছে অবস্থিত। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ও বাণিজ্যিক নৌপথগুলোর একটি এটি।
এর ফলে লোহিত সাগর অঞ্চলে হুথিদের সামরিক ও কৌশলগত অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়েছে।
এরপর সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইনে ড্রোন হামলা হয়। হামলার দায় কেউ স্বীকার করেনি। তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ ঘটনায় ইরানের দিকে আঙুল তুলেছেন।
শক্তিশালী হয়েও সৌদি কেন সমস্যায়?
সামরিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে সৌদি আরব ইয়েমেনের হুথিদের চেয়ে অনেক শক্তিশালী। কিন্তু দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, হুথিদের পরাজিত করা সহজ নয়।
২০১৪ সালে হুথিরা ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখল করার পর থেকেই দেশটিতে গৃহযুদ্ধ চলছে। ২০১৫ সালে সৌদি আরবের নেতৃত্বে একটি জোট হুথিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে।
কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে বিমান হামলা ও সামরিক অভিযান চালিয়েও সৌদি আরব হুথিদের পুরোপুরি দমন করতে পারেনি। বরং হুথিরা ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও গেরিলা কৌশল ব্যবহার করে নিজেদের শক্তি ধরে রেখেছে।
সৌদি আরবের সামনে মূলত তিনটি পথ
১. বড় ধরনের সামরিক হামলা
সৌদি আরব চাইলে হুথিদের বিরুদ্ধে ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করতে পারে। কিন্তু এতে আবার দীর্ঘমেয়াদি ইয়েমেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ ধরনের যুদ্ধ শুধু ইয়েমেনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। হুথিদের প্রধান সমর্থক ইরান সরাসরি বা পরোক্ষভাবে সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে।
এর ফলে সংঘাতটি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনার সঙ্গেও যুক্ত হয়ে যেতে পারে এবং সৌদি আরব তখন বড় আঞ্চলিক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকবে।
২. যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্য নেওয়া
সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে গোয়েন্দা তথ্য ও সামরিক সহায়তা চাইছে। তবে ওয়াশিংটন সরাসরি হুথিদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের বিমান হামলায় যেতে আগ্রহী নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে ইতোমধ্যে একাধিক সংকট চলায় যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে বড় সামরিক সংঘাতে জড়াতে চাইছে না।
ফলে সৌদি আরবকে অনেকটাই নিজের সামরিক সক্ষমতার ওপর নির্ভর করতে হতে পারে।
৩. রাজনৈতিক সমঝোতা
আরেকটি পথ হলো হুথিদের সঙ্গে আলোচনা করে রাজনৈতিক সমাধান খোঁজা।
কিন্তু এখানেও সমস্যা রয়েছে। সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে হুথিদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে আসছে। অন্যদিকে হুথিরা তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় অর্থনৈতিক ও চলাচলের ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার দাবি করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এখন যদি সৌদি আরব হুথিদের সঙ্গে বড় ধরনের সমঝোতা করে, তাহলে সেটিকে রিয়াদের জন্য রাজনৈতিক পরাজয় হিসেবে দেখা হতে পারে।
কেন পরিস্থিতি আরও ভয়ংকর হতে পারে?
ইয়েমেনের যুদ্ধ ইতোমধ্যেই দেশটিকে বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক সংকটে ফেলেছে। প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ মানুষ মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল।
নতুন করে সৌদি-হুথি যুদ্ধ শুরু হলে এই সংকট আরও ভয়াবহ হতে পারে।
এ ছাড়া লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাবের মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে সংঘাত বাড়লে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহেও বড় প্রভাব পড়তে পারে।
সৌদি আরব কি যুদ্ধ শুরু করবে?
এ মুহূর্তে রিয়াদ বড় ধরনের যুদ্ধে যেতে খুব সতর্ক। সৌদি কর্মকর্তারা বারবার বলেছেন, তারা সংঘাত বাড়াতে চান না।
তবে বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, হুথিরা যদি আরও আক্রমণ চালায় এবং সৌদি ভূখণ্ড বা গুরুত্বপূর্ণ তেল অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করে, তাহলে সৌদি আরবের জন্য সামরিক প্রতিক্রিয়া জানানো প্রায় অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরব এখন এমন অবস্থায় আছে— হুথিদের বিরুদ্ধে বড় হামলা চালালে যুদ্ধ আরও ছড়িয়ে পড়তে পারে, আর হামলা না চালালে হুথিরা আরও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে।
এই কারণেই হুথিদের সঙ্গে সংঘাতে সৌদি আরবের সামনে বিকল্প থাকলেও, কার্যকর ও কম-ঝুঁকির বিকল্প খুব বেশি নেই।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ