বাংলাদেশ-পাকিস্তান দুই দেশের থমকে থাকা সম্পর্ককে এগিয়ে নিতে ২০২৫ সালের আগস্টে পাকিস্তানের ডেপুটি প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাকদার ঢাকা সফর করেন। ওই সফরে তিনি দুই দেশের মধ্যে উচ্চশিক্ষা, গবেষণা ও জনগণের পারস্পরিক যোগাযোগ জোরদার করার একটি শিক্ষা সহযোগিতা উদ্যোগ বা নলেজ করিডোরের ঘোষণা দেন। পাকিস্তানের উচ্চশিক্ষা কমিশন (এইচইসি) পরিচালনা করছে।
এর আওতায় বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য ‘ফুললি ফান্ডেড’ (সম্পূর্ণ অর্থায়িত) বৃত্তির ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বৃত্তির আবেদন, পরীক্ষা ও বাছাই প্রক্রিয়া শেষে মাস্টার্সে নির্বাচিত শিক্ষার্থীদের দেওয়া অফার লেটারে মিলছে না সেই প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন। শুধু টিউশন ফি ও আবাসন খরচ বহনের প্রস্তাব দিয়ে খাবার, মাসিক ভাতা, যাতায়াত, বিমান ভাড়াসহ অন্য সুবিধা বাদ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এতে নির্বাচিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে দেখা দিয়েছে তীব্র হতাশা; অনেকে এ ঘটনাকে প্রতারণা হিসেবে অভিহিত করেছেন। কূটনীতিকরাও এমন ঘটনাকে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পাকিস্তানের প্রতারণা হিসেবে দেখছেন।
ইসহাক দারের সফরটি ছিল প্রায় ১৩ বছর পর কোনো পাকিস্তানি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রথম ঢাকা সফর। এর আগে ২০১২ সালে পাকিস্তানের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিনা রাব্বানি খা ঢাকা সফরে এসেছিলেন।
নলেজ করিডোরের ঘোষণায় বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য পরবর্তী ৫ বছরে মোট ৫০০টি পূর্ণাঙ্গ বৃত্তি দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। এর মধ্যে ব্যাচেলরস অব সায়েন্স (চার-পাঁচ বছরের), মাস্টার্স (দুই বছরের) ও পিএইচডি (চার বছরের) আগের শিক্ষার্থীদের পূর্ণাঙ্গ বৃত্তি দেওয়ার কথা। এ সংক্রান্ত ঢাকার পাকিস্তান হাইকমিশন, পাকিস্তানের উচ্চশিক্ষা কমিশন এবং ঢাকায় পাকিস্তানের উদ্যোগে একাধিক শিক্ষাসংক্রান্ত মেলায় বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বৃত্তির আহ্বানে বলা হয়, যেসব শিক্ষার্থী নির্বাচিত হবে তারা নলেজ করিডোরের আওতায় পূর্ণাঙ্গ বৃত্তি পাবে। পূর্ণাঙ্গ বৃত্তির আওতায় শিক্ষার্থীরা ফুল টিউশন ফি, মান্থলি মেইনটেইন্যান্স অ্যালাউন্স, মান্থলি হোস্টেল চার্জেস, সেটেলমেন্টে অ্যালাউন্স (একবার) এবং রিটার্ন এয়ার টিকেট (একবারের জন্য) সুবিধা পাবে।
এরই মধ্যে নলেজ করিডোরের আওতায় গত ফেব্রুয়ারিতে প্রথম ব্যাচের প্রায় ৭৪ জন শিক্ষার্থী ধাপে ধাপে পাকিস্তানে পৌঁছায় এবং শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়াশোনা শুরু করে। গত মে মাসে ঢাকায় পাকিস্তান এডুকেশন এক্সপোর দ্বিতীয় ধাপের উদ্বোধন করা হয় এবং আরও বৃত্তি দেওয়ার ঘোষণা ও আবেদন চলমান থাকে।
কিন্তু দ্বিতীয় ধাপের ঘোষণায় মাস্টার্স পর্বের শিক্ষার্থীরা বৃত্তির সব প্রক্রিয়া শেষে যখন ভর্তি হতে যাবেন তখন শিক্ষার্থীদের জানানো হয়, তাদের শুধু টিউশন ফি ওয়েভার এবং ডরমিটরি ওয়েভার দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হবে। অর্থাৎ খাবার, মাসিক ভাতা, যাতায়াতসহ অন্য প্রয়োজনীয় খরচের জন্য কোনো পূর্ণাঙ্গ আর্থিক সহায়তা থাকছে না। এতে শিক্ষার্থীরা হতাশ হয়ে পড়েন। অনেকেই বৃত্তির জন্য নির্বাচিত হলেও পূর্ণাঙ্গ বৃত্তি পাবেন না জেনে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে ইচ্ছুক নন। শিক্ষার্থীরা এ ঘটনাকে প্রতারণা বলছেন।
শিক্ষার্থীদের একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে দৈনিক সময়ের আলোকে বলেন, পাকিস্তানের ফুললি ফান্ডেড (সম্পূর্ণ অর্থায়িত) মাস্টার্স স্কলারশিপ নিয়ে বাংলাদেশের আবেদনকারী শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আপনাদের নজরে আনতে চাই। কারণ এটা এক রকমের প্রতারণা। একটা বলে আরেকটা কাজ করা। শত শিক্ষার্থীর সঙ্গে এবং তাদের ভবিষ্যতের সঙ্গে প্রতারণা। বাংলাদেশ থেকে আমরা এই স্কলারশিপের জন্য আবেদন করি এবং দীর্ঘ সময় ধরে আবেদন, পরীক্ষা ও বিভিন্ন ধাপের বাছাই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাই। শুরু থেকেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তি ও অফিসিয়াল পোস্টে এটিকে ফুললি ফান্ডেড স্কলারশিপ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল।
কিন্তু প্রক্রিয়ার শেষ পর্যায়ে এসে মাস্টার্সের শিক্ষার্থীদের জানানো হয়েছে, তাদের ফুললি ফান্ডেড স্কলারশিপ দেওয়া হবে না। পরিবর্তে শুধু টিউশন ফি ওয়েভার এবং ডরমিটরি ওয়েভার দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ খাবার, মাসিক ভাতা, যাতায়াতসহ অন্য প্রয়োজনীয় খরচের জন্য কোনো পূর্ণাঙ্গ আর্থিক সহায়তা থাকছে না। বিষয়টি নিয়ে আমরা অত্যন্ত হতাশ এবং উদ্বিগ্ন। কারণ শুরু থেকেই যদি মাস্টার্স পর্যায়ে পূর্ণ বৃত্তি দেওয়ার সুযোগ না থাকত, তা হলে আবেদন প্রক্রিয়ার শুরুতেই বিষয়টি স্পষ্টভাবে জানানো উচিত ছিল। দীর্ঘ সময় ধরে পরীক্ষা ও বাছাই প্রক্রিয়ার পর শেষ পর্যায়ে এসে ভিন্ন ধরনের অফার দেওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য অত্যন্ত হতাশাজনক।
পাকিস্তান সরকারের আল্লামা ইকবাল স্কলারশিপের অফার লেটার পাওয়ার পর অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন আশরাফুল ইসলাম রুম্মন নামের একজন শিক্ষার্থী। তিনি সময়ের আলোকে বলেন, পাকিস্তানের নলেজ করিডোরের অফিসিয়াল সার্কুলার ও বিজ্ঞাপনে যেভাবে ঘোষণা করা হয়েছিল, সেই অনুযায়ী এই স্কলারশিপটি একটি সম্পূর্ণ অর্থায়িত (ফুললি ফান্ডেড) প্রোগ্রাম হিসেবে দেওয়ার কথা ছিল। এর মধ্যে ১০০ শতাংশ টিউশন ফি, আবাসন, বিমান ভাড়া, মাসিক উপবৃত্তি এবং সেটেলমেন্ট অ্যালাউন্স (প্রাথমিক অবস্থান খরচ) অন্তর্ভুক্ত ছিল।
সম্প্রতি হারিপুরের পিএএফ-আইএএসটিতে মাস্টার্স অধ্যয়নের জন্য আমাকে দেওয়া অফার লেটারে স্কলারশিপের সুযোগ-সুবিধা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা হয়েছে। আমাকে পাঠানো ইমেইলে উল্লেখ করা হয়েছে, স্কলারশিপটি কেবল ১০০ শতাংশ টিউশন ফি মওকুফ এবং আবাসন খরচ বহন করবে। কিন্তু জীবনযাত্রার ব্যয়, পরিবহন, ভিসা ফি, চিকিৎসা বীমা এবং অন্য সব আনুষঙ্গিক খরচ স্পষ্টভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে। আমার মনে হয়, এটি কোনো একক ঘটনা নয়। মনে হচ্ছে, এ স্কিমের আওতায় মাস্টার্সে আবেদনকারী প্রায় সব শিক্ষার্থীকেই প্রতিশ্রুত সম্পূর্ণ অর্থায়নের স্কলারশিপের বদলে শুধু এই আংশিক সুবিধার অফার লেটার দেওয়া হয়েছে।
আবু মুসা নামের আরেকজন শিক্ষার্থী বলেন, পাকিস্তান থেকে পাওয়া ‘সম্পূর্ণ অর্থায়নকৃত’ মাস্টার্স স্কলারশিপ সম্পর্কিত আমার অফার লেটারে আমি দুটি প্রধান সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছি— প্রথমত অর্থায়ন বা ফান্ডের বিষয়ে বিভ্রান্তি : আমি যে অফারটি পেয়েছি, তাতে ১০০ শতাংশ টিউশন ফি এবং আবাসন খরচ বহনের কথা বলা হয়েছে।
তবে এতে কোনো ধরনের মাসিক জীবনযাত্রার উপবৃত্তি, খাবার খরচ, স্বাস্থ্য বীমা বা বিমান ভাড়া অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। উপবৃত্তি ছাড়া সেখানে টিকে থাকা একেবারেই অসম্ভব, যা এই ‘সম্পূর্ণ অর্থায়নকৃত’ দাবিটিকে অত্যন্ত বিভ্রান্তিকর করে তোলে। দ্বিতীয়ত আমার সম্মতি ছাড়াই বিশ্ববিদ্যালয় পরিবর্তন : আমি আমার পছন্দের নির্দিষ্ট একটি বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রোগ্রামের জন্য আবেদন করেছিলাম, কিন্তু তারা আমাকে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠিয়েছে যা আমি নির্বাচন করিনি। আমার সঙ্গে কোনোরকম পরামর্শ ছাড়াই একপক্ষীয় সিদ্ধান্ত নিয়ে এটি করা হয়েছে।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরও এক শিক্ষার্থী বলেন, আমিও আবেদন করেছিলাম এবং পরীক্ষাও দিয়েছিলাম। তাদের সার্কুলারে তারা ফুললি ফান্ডেড স্কলারশিপ বললেও এখন আমাদের টিউশন ফি ওয়েভার অফার করছে। পৃথিবীর কোনো ফুললি ফান্ডেড স্কলারশিপ কখনো শুধু টিউশন ফি ওয়েভার হতে পারে না। হয় ফুললি ফান্ডেড গ্রহণ করবে, না হলে তারা রিজেক্ট করবে। এর বাইরে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এ ছাড়া মাস্টার্সের রেজাল্ট নিয়ে তারা অনেক নাটক করেছে। আগস্টের প্রথম সপ্তাহে দেওয়ার কথা থাকলেও তৃতীয় সপ্তাহে এসে এ ধরনের মেইল করেছে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, তারা শিক্ষার্থীদের জন্য ভালো ইউনিভার্সিটির সিট বরাদ্দ না করে তৃতীয় ক্যাটাগরির ইউনিভার্সিটিগুলো অফার করছে। আমার প্রশ্ন হলো, তারা যদি ফুললি ফান্ডেড না দেয়, তা হলে সার্কুলারে কেন বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেনি? শুধু শুধু শিক্ষার্থীদের সময় ও মেধা নষ্ট করা হয়েছে এবং অনেক শিক্ষার্থী এই ফলাফল দেখে হতাশ।
এই বিষয়ে জানতে চেয়ে পাকিস্তানের উচ্চশিক্ষা কমিশনের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে গত ১ সেপ্টেম্বর মেইল করা হলেও ১৪ সেপ্টেম্বর এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
ঢাকায় অবস্থিত পাকিস্তান হাইকমিশনের কাছে গত ১ সেপ্টেম্বর এ বিষয়ে জানতে চাইলে কাউন্সিলর শাবিদ উল্লাহ ওয়াজির সময়ের আলোকে বলেন, ‘আমরা পাকিস্তানের উচ্চশিক্ষা কমিশন থেকে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করছি, কারণ এটি তাদের এখতিয়ারভুক্ত।’
গত ৮ সেপ্টেম্বর আবারও বিষয়টি জানতে চাইলে শাবিদ উল্লাহ ওয়াজির সময়ের আলোকে বলেন, ‘আমি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করে আসছি, কিন্তু কোনো তথ্য পাইনি।’
এ বিষয়ে ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট মহাপরিচালকের কাছে জানতে চেয়েও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (দ্বিপক্ষীয়) নজরুল ইসলামের কাছে জানতে চাইলে তিনি সময়ের আলোকে বলেন, বিষয়টি তাদের ‘নলেজে’ নেই।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফায়েজ সময়ের আলোকে বলেন, নলেজ করিডোর নিয়ে পাকিস্তান এমন ঘটনা ঘটালে তা প্রতারণার শামিল। শিক্ষার্থীদের কাছে এমন মিথ্যা বলার প্রয়োজন ছিল না। অন্য কোনো দেশ হলে এমন ঘটত না।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমান সময়ের আলোকে বলেন, এটি একেবারে প্রান্তিক বিষয়। নিশ্চয়ই তার সমাধান খুঁজে পাওয়া যাবে। বিষয়টি যৌক্তিক ও মানবিক উভয় দিক থেকে বিবেচনার দাবি রাখে।
অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল এবং সাবেক রাষ্ট্রদূত শহীদুল হক সময়ের আলোকে বলেন, বিষয়টি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেখা উচিত। কোনো এক জায়গায় হয়তো গ্যাপ আছে। বিষয়টি শিক্ষার্থীদের, তাই গুরুত্ব দিয়ে সুরাহা করতে হবে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/টিকে