রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ছেড়ে দেওয়া ঠাকুরগাঁও-১ আসনে আগামী ২৯ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হবে উপনির্বাচনের ভোটগ্রহণ। ১৯৯৪ সালের বিতর্কিত মাগুরা-২ আসনের উপনির্বাচনের পর দীর্ঘ ৩২ বছর পর ফের বিএনপি সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ঠাকুরগাঁও-১ আসনের এই উপনির্বাচন। তাই অতিতের কলঙ্ক মুছে দলীয় সরকারের অধীনে এই উপনির্বাচন বর্তমান নির্বাচন কমিশনের সামনে একটি অ্যাসিড টেস্ট বলে মনে করছে অনেকেই। তবে এই নির্বাচন নিয়ে কোনো সংশয় নেই বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসনে থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গত ২০ আগস্ট তিনি দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন এবং ২১ আগস্ট রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। ২২ আগস্ট মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের আসনটি শূন্য ঘোষণা করে সংসদ সচিবালয়।
এরপর গত ১০ সেপ্টেম্বর ঠাকুরগাঁও-১ আসনের তফসিল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। তফসিল অনুযায়ী মনোনয়নপত্র দাখিল ২৭ সেপ্টেম্বর, বাছাইয়ের তারিখ ২৯ সেপ্টেম্বর, রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল দায়ের ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে ৪ অক্টোবর। আর আপিল নিষ্পত্তি ৬ অক্টোবর, প্রার্থিতা প্রত্যাহার ৭ অক্টোবর এবং প্রতীক বরাদ্দ হবে ৮ অক্টোবর। নির্বাচনে ভোটগ্রহণ ২৯ অক্টোবর। সকাল ৮টা থেকে টানা বিকাল ৪টা পর্যন্ত চলবে ভোটগ্রহণ। আসনটিতে মোট ভোটার রয়েছে ৫ লাখ ১৫ হাজার ৫২৫ জন।
এদিকে উপনির্বাচন উপলক্ষে মঙ্গলবার থেকে ঠাকুরগাঁও-১-এর মনোনয়ন ফরম বিক্রি শুরু করেছে জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। মঙ্গলবার বেলা ১১টায় রাজধানীর নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এ মনোনয়ন ফরম বিক্রি শুরু হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান। বিএনপি থেকে এখন পর্যন্ত মনোনয়ন ফরম নিয়েছেন তিনজন।
এরা হলেন— ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক পৌর মেয়র মির্জা ফয়সাল আমীন, ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি ও সাবেক ছাত্রদল নেতা ওবায়দুল্লাহ মাসুদ ও ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান সুলতানুল ফেরদৌস চৌধুরী নম্র। এদিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের কাছে হেরেছিলেন জামায়াতে ইসলামীর দেলাওয়ার হোসেন। কয়েক মাসের ব্যবধানে একই আসনে আবারও ভোটের মাঠে প্রার্থী হয়ে ফিরছেন তিনি। তবে এবার তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী কে হচ্ছেন, তা এখনও চূড়ান্ত হয়নি।
বিএনপির সাবেক মহাসচিব ও বর্তমান রাষ্ট্রপতির নির্বাচিত আসন হওয়ায় সবার দৃষ্টি এই আসনের উপনির্বাচনের দিকে। দলীয় সরকারের অধীনে এই নির্বাচন কি আদৌ সুষ্ঠু হবে নাকি আবারও ৩২ বছর আগের সেই কলঙ্কময় ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটবে এই প্রশ্ন এখন বিরোধীদের মুখে। এ ছাড়া দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন কমিশন কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে সেই প্রশ্নও তুলছে কেউ কেউ।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ সময়ের আলোকে বলেন, এই উপনির্বাচন নিয়ে সংশয়ের কোনো কারণ নেই। সবাই ভালো নির্বাচন চায়। সরকারও চায় আমরাও চাই। তাই ভালো নির্বাচন না হওয়ার কোনো কারণ আমরা দেখি না। তিনি বলেন, আগের ইতিহাস আমরা বলতে পারব না। আগের ইতিহাসে তো অনেক কিছুই হয়েছে। এই নির্বাচনে সরকার আমাদের পূর্ণ সহযোগিতা করছে। আমরা সরকারের পুলিশ বাহিনী লাগিয়েছি সেনাবাহিনী লাগিয়েছি। আমাদের মতো করে আমরা আইন মাফিক নির্বাচন করব। তাই অসুবিধা হওয়ার কোনো কারণ আমরা দেখি না।
উপনির্বাচনে আমাদের সবসময় রুলিং পার্টির সঙ্গে কাজ করতে হয় সুতরাং কোনো অসুবিধা হবে বলে আমরা মনে করছি না। তিনি আরও বলেন, গত নির্বাচনে সব রাজনৈতিক দল যদি সহযোগিতা না করত তা হলে কি সুন্দর নির্বাচন করা যেত। যেমন ছিল ১৯৯৪ সালের বিতর্কিত মাগুরা-২ উপনির্বাচন : পঞ্চম জাতীয় সংসদের অধীন ১৯৯৪ সালের ২০ মার্চ অনুষ্ঠিত হয়েছিল মাগুরা-২ আসনের উপনির্বাচন। এই নির্বাচনের প্রধান নির্বাচন কমিশনার ছিলেন বিচারপতি মোহাম্মদ আবদুর রউফ। আওয়ামী লীগের তৎকালীন সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আসাদুজ্জামানের মৃত্যুতে মাগুরা-২ আসনটি শূন্য হওয়ায় সেখানে উপনির্বাচন দেওয়া হয়েছিল।
তৎকালীন নির্বাচন কমিশনের অধীনে এ উপনির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়েছিল ১৯৯৪ সালের জানুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহে। নির্বাচনে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলো থেকে চারজন প্রার্থী ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল। ওই নির্বাচনে তৎকালীন বিএনপি প্রার্থী ছিলেন কাজী সালিমুল হক কামাল (কাজী কামাল) অন্যদিকে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী ছিলেন অ্যাডভোকেট শফিকুজ্জামান বাচ্চু। কমিশনের হিসাব অনুযায়ী বিএনপি প্রার্থী কাজী কামাল পেয়েছিলেন প্রায় ৭৩ হাজার ভোট, অন্যদিকে তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ও আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী শফিকুজ্জামান বাচ্চু পেয়েছিলেন প্রায় ৬২ হাজার ভোট। ফলে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী কাজী কামালকে বিজয়ী ঘোষণা করে আবদুর রউফ কমিশন।
তবে ওই উপনির্বাচনে ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে ব্যাপক ভোট কারচুপি, কেন্দ্র দখল এবং পোলিং এজেন্টদের বের করে দেওয়াসহ নানা অভিযোগ তোলে তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ ও অন্যান্য দল। মাগুরা উপনির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি ও ভোট জালিয়াতির অভিযোগ এনে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি এবং জামায়াতে ইসলামীসহ তৎকালীন প্রধান বিরোধী দলগুলো একযোগে আন্দোলন শুরু করে। তারা ঘোষণা করে যে, ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারের অধীনে তারা আর কোনো নির্বাচনে অংশ নেবে না।
পরবর্তীতে বিরোধী দলগুলো নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলে। আন্দোলনের অংশ হিসেবে ওই বছরের ২৮ ডিসেম্বর তৎকালীন বিরোধী দলগুলোর ১৪৭ জন সংসদ সদস্য একযোগে সংসদ থেকে পদত্যাগ করেন। ফলে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের টানা অনুপস্থিতির কারণে ১৯৯৫ সালের ৩১ জুলাই স্পিকার তাদের আসনগুলো শূন্য ঘোষণা করেন। সাংবিধানিক নিয়ম অনুযায়ী ৯০ দিনের মধ্যে এসব আসনে উপনির্বাচন করার বাধ্যবাধকতা ছিল। কিন্তু বিরোধী দলগুলোর চরম প্রতিরোধ, দেশব্যাপী লাগাতার হরতাল ও তীব্র গণআন্দোলনের মুখে নির্বাচন কমিশনের পক্ষে ওই ১৪৭টি আসনে নতুন করে কোনো উপনির্বাচন করা সম্ভব হয়নি।
ফলে উপনির্বাচন আয়োজনে ব্যর্থ হয়ে এবং রাজনৈতিক অচলাবস্থা নিরসনের লক্ষ্যে ১৯৯৫ সালের নভেম্বর মাসে পঞ্চম জাতীয় সংসদ ভেঙে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনও দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি বিতর্কিত ও একতরফা নির্বাচন হিসেবে পরিচিতি পায়। কারণ আওয়ামী লীগ, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় পার্টির মতো অধিকাংশ প্রধান বিরোধী দল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে ওই সময় সেই নির্বাচন বর্জন করেছিল। সাধারণ মানুষের অনীহা ও বিরোধীদের বর্জনের কারণে নির্বাচনে ভোট পড়েছিল মাত্র ২১ শতাংশ। তৎকালীন প্রধান বিরোধী দলগুলোর অনুপস্থিতিতে বিএনপি নিরঙ্কুশ জয় পায়।
তবে সেই সংসদের আয়ুষ্কাল ছিল খুবই সংক্ষিপ্ত। বিরোধীদের তীব্র আন্দোলন এবং নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নতুন নির্বাচনের দাবির মুখে গঠিত এই সংসদ মেয়াদ ছিল মাত্র কয়েক দিন। তীব্র গণআন্দোলনের মুখে ১৯৯৬ সালের ৩০ মার্চ ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয় এবং সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা যুক্ত করে একই বছরের ১২ জুন সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে এবং আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। এরপর ২০০১ সালের ১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে আবারও জয়লাভ করে এবং জোটগতভাবে সরকার গঠন করে।
এরপর ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গঠিত মহাজোট মোট ২৬৩টি আসন পেয়ে আবারও সরকার গঠন করেন। এরপর দশম, একাদশ ও দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে বিতর্কিত ভোটের মাধ্যমে টানা ১৭ বছর ক্ষমতায় থাকে আওয়ামী লীগ। এরপর ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে পতন হয় আওয়ামী লীগ সরকারের। সবশেষ চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়লাভ করে ১৯ বছর পর আবারও ক্ষমতায় ফেরে বিএনপি এবং ক্ষমতায় ফেরার আট মাসের মাথায় আবারও উপনির্বাচনের মুখোমুখি দলটি।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি