এবার মেট্রোরেলে ঢাকার দুই প্রান্ত এক সুতায়

নিজস্ব প্রতিবেদক

জাতীয়

রাজধানীর পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চলকে একই মেট্রোরেল করিডোরে যুক্ত করার উদ্যোগ অবশেষে অনুমোদন পেল। গাবতলী থেকে দাসেরকান্দি পর্যন্ত ১৭ দশমিক ২০

2026-09-17T00:49:25+00:00
2026-09-17T00:49:25+00:00
 
  বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২ আশ্বিন ১৪৩৩
বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
জাতীয়
এবার মেট্রোরেলে ঢাকার দুই প্রান্ত এক সুতায়
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:৪৯ এএম 
গ্রাফিক সময়ের আলো
রাজধানীর পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চলকে একই মেট্রোরেল করিডোরে যুক্ত করার উদ্যোগ অবশেষে অনুমোদন পেল। গাবতলী থেকে দাসেরকান্দি পর্যন্ত ১৭ দশমিক ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এমআরটি লাইন-৫ সাউদার্ন রুট নির্মাণ করা হবে। এর মধ্য দিয়ে রাজধানীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে দ্রুত, নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব গণপরিবহনের নতুন সুযোগ তৈরি হবে। গাবতলী থেকে শুরু হয়ে মেট্রোরেলটি টেকনিক্যাল মোড়, কল্যাণপুর, শ্যামলী, কলেজ গেট, আসাদ গেট, শুক্রাবাদ, কারওয়ান বাজার, হাতিরঝিল, তেজগাঁও, আফতাবনগর, আফতাবনগর সেন্টার, আফতাবনগর ইস্ট ও নাসিরাবাদ হয়ে দাসেরকান্দিতে যাবে। প্রকল্পে দাসেরকান্দিতে একটি ডিপো নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, মোট রুটের ১৩ দশমিক ১০ কিলোমিটার হবে পাতাল এবং বাকি অংশ উড়ালপথে নির্মিত হবে। এতে শুধু দুটি প্রান্তের মধ্যে যোগাযোগই সহজ হবে না; রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার মানুষের যাতায়াতের পথও বদলে যাবে। বর্তমানে সড়কপথে এসব এলাকার মধ্যে যাতায়াতে দীর্ঘ সময় যানজটে আটকে থাকতে হয়। মেট্রোরেল চালু হলে নির্দিষ্ট সময়ে যাতায়াতের সুযোগ তৈরি হবে।

বুধবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ও একনেকের চেয়ারপারসন তারেক রহমানের সভাপতিত্বে সচিবালয়ে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। একই সভায় মেট্রোরেল-১ (বিমানবন্দর-কমলাপুর) এবং মেট্রোরেল-৫ নর্দার্ন রুটের (হেমায়েতপুর-ভাটারা) সংশোধিত ব্যয় প্রস্তাবও অনুমোদন দেওয়া হয়। তিনটি মেট্রোরেল প্রকল্পের সম্মিলিত ব্যয় প্রায় ২ লাখ ৪৯ হাজার ৭৪৬ কোটি টাকা।

ব্যয় ৪৫ হাজার ৫০৩ কোটি টাকা : এমআরটি লাইন-৫ সাউদার্ন প্রকল্পে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৪৫ হাজার ৫০৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন ১৫ হাজার ১৯৭ কোটি টাকা। বাকি ৩০ হাজার ৩০৬ কোটি টাকা প্রকল্প ঋণ হিসেবে দেবে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থায়ন সংস্থা ইডিসিএফ।

প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০৩৩ সালের আগস্ট পর্যন্ত। প্রকল্পের ব্যয় চূড়ান্ত করার আগে কয়েক দফা পর্যালোচনা করা হয়েছে। শুরুতে ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছিল প্রায় ৫৪ হাজার ৬১৯ কোটি টাকা। পরে তা কমিয়ে ৪৭ হাজার ৭২১ কোটি টাকা এবং সর্বশেষ আরও কমিয়ে ৪৫ হাজার ৫০৩ কোটি টাকায় আনা হয়। প্রকল্পের অর্থায়ন কাঠামোয় এডিবি মূল উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে থাকবে। সংস্থাটি কনসালট্যান্সি ও সিভিল প্যাকেজে অর্থায়ন করবে। দক্ষিণ কোরিয়া কো-ফাইন্যান্সার হিসেবে সিস্টেম প্যাকেজে অর্থায়ন করবে। প্রকল্প নথি অনুযায়ী এডিবির ঋণ প্রায় ২ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলার এবং দক্ষিণ কোরিয়ার ঋণ প্রায় ১ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলার।

হাতিরঝিলে পাতাল, আফতাবনগরের পর উড়াল : মেট্রোরেলটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এর বড় একটি অংশ মাটির নিচ দিয়ে যাবে। গাবতলী থেকে আফতাবনগর পর্যন্ত প্রায় ১৩ দশমিক ১০ কিলোমিটার অংশ পাতালপথে নির্মাণ করা হবে। এরপর আফতাবনগর থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত প্রায় চার কিলোমিটার অংশ হবে উড়ালপথে। পাতাল অংশে টানেল বোরিং প্রযুক্তি ব্যবহার করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রস্তাবিত রুটে ১৫টি স্টেশন থাকবে। এর মধ্যে ১১টি পাতাল এবং চারটি উড়াল স্টেশন। ফলে রাজধানীর পশ্চিমাঞ্চলের গাবতলী, কল্যাণপুর ও শ্যামলী যেমন যুক্ত হবে, তেমনি আসাদ গেট, কারওয়ান বাজার, হাতিরঝিল, তেজগাঁও ও আফতাবনগরের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকাও একই রুটের আওতায় আসবে।

২৮ মিনিটে গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি : প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট হিসাব অনুযায়ী, মেট্রোরেল চালু হলে গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি যেতে সময় লাগতে পারে প্রায় ২৮ মিনিট। প্রতিদিন প্রায় ৯ লাখ ২৪ হাজার যাত্রী এই রুট ব্যবহার করতে পারবেন বলে প্রকল্পের প্রাক্কলনে ধরা হয়েছে। প্রতিটি ট্রেনে প্রায় ২ হাজার ৩১২ জন যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতা রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে সড়কে গণপরিবহনের চাপ কমানোর পাশাপাশি ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহারও কমতে পারে। প্রকল্পের হিসাব অনুযায়ী, মেট্রোরেলটি চালু হলে প্রতি বছর বিপুল কর্মঘণ্টা সাশ্রয় এবং যানবাহনের সংখ্যা কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমায় কার্বন নিঃসরণ কমারও সম্ভাবনা রয়েছে।

জমি অধিগ্রহণ ও পুনর্বাসন : প্রকল্প বাস্তবায়নে জমি অধিগ্রহণ একটি বড় কাজ। সর্বশেষ পর্যালোচনায় প্রয়োজনীয় জমির পরিমাণ কমিয়ে প্রায় ৯ দশমিক ১০৪ হেক্টর করা হয়েছে। এর ফলে আগের হিসাবের তুলনায় জমি অধিগ্রহণের ব্যয়ও কমেছে।

প্রকল্পের ব্যয় কমানোর ক্ষেত্রে জমি অধিগ্রহণের পরিমাণ কমানো, প্রশাসনিক ব্যয় পুনর্বিন্যাস এবং সুদ-সংক্রান্ত ব্যয় বাদ দেওয়াসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ সংশোধনে আগের প্রস্তাবের তুলনায় প্রায় ২ হাজার ২১৭ কোটি টাকা ব্যয় কমানো হয়েছে।

একসঙ্গে তিন মেট্রোরেল : গাবতলী-দাশেরকান্দি প্রকল্পের পাশাপাশি বুধবার একনেকে আরও দুটি বড় মেট্রোরেল প্রকল্পের সংশোধিত প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর পর্যন্ত ৩১ দশমিক ২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এমআরটি লাইন-১ প্রকল্পের সংশোধিত ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ১৪ হাজার ৩৯৪ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। প্রকল্পটি দেশের প্রথম পাতাল মেট্রোরেল প্রকল্প। এতে বিমানবন্দর রুট পুরোপুরি পাতাল এবং পূর্বাচল অংশে উড়াল ও পাতাল—দুই ধরনের অবকাঠামো থাকবে। প্রকল্পটি ২০৩৩ সালের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

অন্যদিকে হেমায়েতপুর থেকে ভাটারা পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এমআরটি লাইন-৫ নর্দার্ন রুটের সংশোধিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৮৯ হাজার ৮৪৮ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। এ প্রকল্পের বাস্তবায়ন শেষ করার নতুন লক্ষ্য ২০৩২ সাল। দুটি প্রকল্পেই মূল ব্যয় প্রস্তাবের তুলনায় বড় ধরনের বৃদ্ধি হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের পর্যালোচনায় প্রকল্প ব্যয় যৌক্তিক করার জন্য বিভিন্ন খাতে কাটছাঁটও করা হয়েছে।

দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা এবার বাস্তবায়নের পথে : ঢাকার পূর্ব-পশ্চিমাঞ্চলের মধ্যে দ্রুত যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এমআরটি লাইন-৫ সাউদার্ন রুটের পরিকল্পনা কয়েক বছর ধরেই আলোচনায় ছিল। প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ২০২২ সালের অক্টোবরে শেষ হয়। এরপর বিস্তারিত নকশা ও দরপত্রসংক্রান্ত কাজ এগোয়। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে আগে প্রায় ৫৪ হাজার ৬১৯ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছিল। পরবর্তী পর্যালোচনায় ব্যয় কমিয়ে সর্বশেষ ৪৫ হাজার ৫০৩ কোটি টাকায় আনা হয়েছে। ফলে প্রাথমিক প্রস্তাবের তুলনায় বর্তমান ব্যয় প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা কম।

রাজধানীর মেট্রোরেল নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি সংযোগ তৈরি করবে। বর্তমানে চালু থাকা মেট্রোরেলসহ নির্মাণাধীন ও পরিকল্পনাধীন বিভিন্ন লাইনের সঙ্গে ভবিষ্যতে সংযোগ স্থাপনের সুযোগ তৈরি হবে। ফলে ধীরে ধীরে ঢাকার বিচ্ছিন্ন গণপরিবহন ব্যবস্থার পরিবর্তে একটি সমন্বিত মেট্রোরেল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পথ তৈরি হতে পারে। তবে এত বড় বিনিয়োগের প্রকল্প বাস্তবায়নে সময়, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, জমি অধিগ্রহণ, নির্মাণের মান এবং ঋণের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করাকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে পাতাল মেট্রোরেল নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় তুলনামূলক বেশি হওয়ায় প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপে ব্যয় ও মান নিয়ন্ত্রণের ওপর নজর রাখার প্রয়োজন রয়েছে।

সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে ২০৩৩ সালের মধ্যে গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত নতুন এই মেট্রোরেল চালু হওয়ার কথা। তখন রাজধানীর পশ্চিম প্রান্তের গাবতলী থেকে পূর্বাঞ্চলের দাশেরকান্দি পর্যন্ত সড়কনির্ভর যোগাযোগের পাশাপাশি দ্রুতগতির একটি পৃথক গণপরিবহন করিডোর তৈরি হবে। ঢাকার যানজট ও যাতায়াতের দীর্ঘ সময় কমানোর ক্ষেত্রে এটি নগরের পরিবহন ব্যবস্থায় একটি বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর পথে রেল চলবে বিদ্যুতে : দেশের রেল যোগাযোগে ডিজেলনির্ভরতার পরিবর্তে বিদ্যুতের যুগে প্রবেশের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রথম ধাপে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-জয়দেবপুর রেলপথে চালু করা হবে বৈদ্যুতিক ট্রেন। এ জন্য ৫২ দশমিক ৩২ কিলোমিটার রেলপথে বৈদ্যুতিক ট্র্যাকশন বা ওভারহেড ক্যাটেনারি ব্যবস্থা স্থাপন করা হবে। প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৮২২ কোটি ৫১ লাখ টাকা। ২০৩১ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

বাংলাদেশের রেলপথে এটি বৈদ্যুতিক ট্র্যাকশন চালুর প্রথম বড় উদ্যোগ। বর্তমানে দেশের রেলব্যবস্থায় ডিজেল-ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন ব্যবহৃত হয়। নতুন ব্যবস্থায় রেললাইনের ওপর বৈদ্যুতিক সংযোগ স্থাপন করে ইলেকট্রিক মাল্টিপল ইউনিট (ইএমইউ) ট্রেন পরিচালনা করা হবে। এর ফলে ব্যস্ত এই করিডোরে ট্রেনের সংখ্যা ও যাত্রী পরিবহন সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/আতা
  বিষয়:   মেট্রোরেল  ঢাকা  সময়ের আলো  রাজধানী  অর্থনীতি 


Advertisement
Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: