সিরাজগঞ্জ শহরের বিভিন্ন এলাকায় দিনে যানবাহন আটক করে মামলা দেওয়া এবং রাতে ট্রাফিক কার্যালয়ে বসে জরিমানার অর্থ কমিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ট্রাফিক পুলিশের বিরুদ্ধে। একই সঙ্গে মহাসড়কে ট্রাফিক পুলিশের দায়িত্ব পালন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। তাদের অভিযোগ, এতে একদিকে যানজট ও জনদুর্ভোগ বাড়ছে, অন্যদিকে মামলা ও জরিমানা নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।
সিরাজগঞ্জ ট্রাফিক পুলিশের আওতাধীন এলাকা যমুনা সেতুর পশ্চিম পাড় থেকে নলকা পর্যন্ত। এর মধ্যে সেতু পশ্চিম পাড় গোলচত্বর, সায়দাবাদ, চেকপোস্ট, কড্ডার মোড়, ঝাউল ওভারব্রিজ ও নলকা এলাকায় ট্রাফিক পুলিশের দায়িত্ব পালনের কথা। তবে গত প্রায় আড়াই মাস ধরে এসব এলাকায় নিয়মিত দায়িত্ব পালন করা হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন ট্রাফিক বিভাগের পরিদর্শক (টিআই) মোফাকখারুল ইসলাম।
ট্রাফিক বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, গত কয়েক মাসে শহরের বিভিন্ন এলাকায় যানবাহন আইন লঙ্ঘনের ঘটনায় নিয়মিত মামলা দেওয়া হচ্ছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সিরাজগঞ্জ ট্রাফিক পুলিশ ৩ হাজার ২১টি মামলা করে ১ কোটি ৮০ লাখ ৩১ হাজার ৯৭৫ টাকা রাজস্ব আদায় করেছে।
তবে অভিযোগ রয়েছে, দিনের বেলায় মামলা দেওয়ার পর সন্ধ্যার দিকে মামলা নিষ্পত্তি বা জরিমানা কমানোর জন্য অনেক গাড়ির মালিক ও চালক ট্রাফিক কার্যালয়ে আসেন। তাদের কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, মামলায় ১৫ হাজার, ২০ হাজার বা ২৫ হাজার টাকা জরিমানা নির্ধারণ করা হলেও পরে ওই অর্থের ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে বাকি টাকা জমা নিয়ে গাড়ি ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে।
সম্প্রতি কয়েক দিন ট্রাফিক কার্যালয়ে গিয়ে এমন দৃশ্য দেখা গেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। কয়েকজন মোটরসাইকেল চালক জানান, শহরের চায়না বাঁধ এলাকা থেকে তাদের মোটরসাইকেল আটক করে মামলা দেওয়া হয়েছে। সন্ধ্যার পর তারা জরিমানা পরিশোধ ও গাড়ি ছাড়ানোর জন্য ট্রাফিক কার্যালয়ে যান। পরে রাতের দিকে ট্রাফিক বিভাগের পরিদর্শক মোফাকখারুল ইসলাম কার্যালয়ে এলে তাদের জরিমানার অর্থ কমিয়ে দেওয়া হয় বলে তারা দাবি করেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন বলেন, জরিমানার অর্থ কমিয়ে দেওয়া হলেও নির্ধারিত অর্থের কতটা সরকারি কোষাগারে জমা হচ্ছে, তা নিয়ে তাদের প্রশ্ন রয়েছে। তবে এ বিষয়ে তারা কোনো নথি বা প্রমাণ দেখাতে পারেননি।
মহাসড়কে ট্রাফিক পুলিশের দায়িত্ব পালন না করার বিষয়েও রয়েছে ভিন্ন ব্যাখ্যা। প্রায় তিন মাস আগে যমুনা সেতুর পশ্চিম পাড়ে ট্রাফিক পুলিশের এক সার্জেন্টের বিরুদ্ধে যানবাহন থামিয়ে টাকা নেওয়ার অভিযোগসংক্রান্ত একটি ভিডিও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। এরপর ওই এলাকায় ট্রাফিক পুলিশের দায়িত্ব পালনে পরিবর্তন আনা হয়েছে বলে জানান পুলিশ কর্মকর্তারা।
সিরাজগঞ্জ ট্রাফিক পুলিশের পরিদর্শক মোফাকখারুল ইসলাম বলেন, ওই ঘটনার পর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশে প্রায় আড়াই মাস ধরে তারা মহাসড়কে দায়িত্ব পালন করছেন না। পরবর্তী নির্দেশনা পেলে সেখানে আবার দায়িত্ব পালন শুরু করবেন।
দিনের বেলায় কার্যালয়ে না থাকা এবং রাতে এসে জরিমানা কমানোর অভিযোগের বিষয়ে মোফাকখারুল ইসলাম বলেন, তিনি অসুস্থ। তবে সারা দিন কার্যালয়ে আসেন না— এমন অভিযোগ সঠিক নয়। সকালে তিনি কার্যালয়ে বসেন বলেও জানান।
জরিমানা কমানোর বিষয়ে তিনি বলেন, যানবাহনের জরিমানা কমানোর ক্ষমতা শুধু পুলিশ সুপারের। ট্রাফিক পুলিশের অন্য কারও এ ক্ষমতা নেই।
তবে পুলিশ সুপারের উপস্থিতি ছাড়াই ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ জরিমানা কমিয়ে দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মোফাকখারুল ইসলাম বলেন, তিনি ব্যস্ত আছেন, পরে কথা বলবেন। এরপর তার সঙ্গে আর কথা বলা সম্ভব হয়নি।
সিরাজগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. সাইফুল ইসলাম সানতু বলেন, মহাসড়কে ট্রাফিক পুলিশ দায়িত্ব পালন করছে না—বিষয়টি এমন নয়। আগে যেসব স্থানে ট্রাফিক পুলিশ দায়িত্ব পালন করত, বর্তমানে সেসব স্থান পরিবর্তন করে অন্য এলাকায় দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
যমুনা সেতুর পশ্চিম পাড়ে যানবাহন থামিয়ে টাকা নেওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে পুলিশ সুপার বলেন, ট্রাফিক পুলিশ যানবাহন থামিয়ে কাগজপত্র যাচাই করার সময় কেউ কেউ ছবি তুলে পুলিশ টাকা নিচ্ছে বলে অভিযোগ করেন। এ কারণে ওই এলাকায় বর্তমানে ট্রাফিক পুলিশ দায়িত্ব পালন করছে না।
জরিমানা কমানোর বিষয়ে পুলিশ সুপার বলেন, মামলাকৃত যানবাহনের জরিমানা কমানোর ক্ষমতা শুধু তার। মানবিক কারণে অনেক সময় তিনি জরিমানা কমিয়ে দেন। তার অনুপস্থিতিতে অন্য কারও এভাবে জরিমানা কমানোর সুযোগ নেই। এ ধরনের ঘটনা ঘটে থাকলে কাগজপত্রসহ অভিযোগ দিলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
সময়ের আলো/জোই