স্থানীয় সরকার নির্বাচনের দিনক্ষণ এখনও চূড়ান্ত হয়নি। তবে ভোটের মাঠে বসে নেই রাজনৈতিক দলগুলো। ইউনিয়ন থেকে ওয়ার্ড— তৃণমূলের সংগঠন গোছানো, সম্ভাব্য প্রার্থী বাছাই, অভ্যন্তরীণ বিরোধ মেটানো এবং ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে নীরবে জোর প্রস্তুতি চলছে।
বিএনপি একক প্রার্থী নিশ্চিত করে বিদ্রোহী ঠেকাতে তৎপর, জামায়াত নজর দিচ্ছে জাতীয় নির্বাচনে ভালো ফল করা এলাকাগুলোতে। আর জাতীয় নির্বাচনে জোটবদ্ধ থাকলেও স্থানীয় ভোটে এককভাবে লড়াই করে তৃণমূলে সংগঠন বিস্তারে মাঠে নামছে এনসিপি। এদিকে জাতীয় নির্বাচনের মতো এবারও আলোচনা রয়েছে আওয়ামী লীগের ভোট।
আগামী ১২ নভেম্বর থেকে সাত ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন করার প্রাথমিক পরিকল্পনা ছিল নির্বাচন কমিশনের (ইসি)। তবে বৃহস্পতিবার সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দফতরগুলোর সঙ্গে বৈঠক করেও ভোটের তারিখ চূড়ান্ত করতে পারেনি কমিশন। পরীক্ষা, রমজান ও নির্বাচনের প্রস্তুতির বিষয়গুলো সমন্বয় করে সুনির্দিষ্ট তারিখ জানাতে আরও কিছু কাজ করতে হবে বলে জানিয়েছে ইসি।
ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশন— এই পাঁচ ধরনের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে নির্বাচন করতে হবে। স্থানীয় সরকারে ১৩ সিটি করপোরেশন, ৩৩০ পৌরসভা, ৫০০ উপজেলা ও সাড়ে ৪ হাজার ইউনিয়ন পরিষদের ভোট রয়েছে সামনে। নির্বাচন কমিশনের (ইসি) পরিকল্পনা হলো শুরুতে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন আয়োজন করা।
মাঠে ভোটের প্রস্তুতি শুরু করেছে রাজনৈতিক দলগুলো। আগে থেকেই নিজেদের প্রার্থিতা জানান দিচ্ছেন বিভিন্ন দলের নেতারা। ইতিমধ্যে ভোটারদের দোয়া চেয়ে ব্যানার-ফেস্টুন-পোস্টারে ছেয়ে গেছে সংশ্লিষ্ট নির্বাচনি এলাকা। তৃণমূলে যোগাযোগ বাড়াচ্ছেন প্রার্থীরা। একই এলাকায় রয়েছেন মনোনয়নপ্রত্যাশী একাধিক নেতা। সবাই নিজস্ব অবস্থান থেকে প্রচার চালাচ্ছেন।
বিদ্রোহীতে ভুগবে বিএনপি : অরাজনৈতিক নির্বাচন হলেও ভেতরে ভেতরে নিজেদের সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকা বাছাইয়ের কাজ করছে ক্ষমতাসীন দল বিএনপি। বিশেষ করে নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থী ঠেকাতে প্রস্তুতিমূলক পদক্ষেপ শুরু করেছে দলটি। এ লক্ষ্যে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রতিটি এলাকায় ঐকমত্যের ভিত্তিতে একক প্রার্থী চূড়ান্ত করতে নেতাদের নির্দেশ দিয়েছেন। সমস্যা সেখানেই দেখা দিচ্ছে।
স্থানীয় নির্বাচনে বর্তমান ও সাবেক এমপি বলয়ের দ্বৈরথ ভোগাবে বিএনপিকে। অনেক জায়গায় এই পরিস্থিতি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যারা মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন এবং যারা এমপি হয়েছেন তাদের মতবিরোধের চিত্র স্থানীয় নির্বাচনে স্পষ্ট হয়ে উঠছে— এমন আভাস এখন থেকেই পাওয়া যাচ্ছে। এমপিরা প্রতিটি ইউনিয়নে তাদের নিজস্ব ব্যক্তি ঠিক করছেন, যারা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও মেম্বার পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। কিন্তু এমপির বলয়ের বাইরের নেতারাও সক্রিয় আছেন এলাকায়।
সূত্র জানায়, একক প্রার্থী ঠিক করতে বিএনপির একটি বিশেষ কমিটি কাজ করছে, যার নেতৃত্বে আছেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান। কমিটিতে আছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, ইসমাইল জবিউল্লাহ ও দলের বিশেষ সম্পাদক বেলায়েত হোসেন মৃধা। ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে চেয়ারম্যান প্রার্থী বাছাইয়ে উপজেলা এবং উপজেলা চেয়ারম্যান বাছাইয়ে জেলার নেতাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কোথাও কোনো সমস্যা হলে প্রথমে জেলা, পরে বিভাগীয় পর্যায়ের নেতারা সমাধানের চেষ্টা করবেন।
এ প্রসঙ্গে বিএনপির রাজশাহী বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ শাহীন শওকত সময়ের আলোকে বলেন, দলের চেয়ারম্যান সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার বার্তা দিয়েছেন। তৃণমূলে গ্রহণযোগ্য সাংগঠনিক অবস্থান ভালো এবং বিগত আন্দোলনে সক্রিয় অবদান ছিল, এমন নেতাদের প্রার্থী করা হবে।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, হ্যাঁ এমপিদের হস্তক্ষেপ একটি শঙ্কার কারণ হতে পারে। তবে সবার আগে দল। ব্যক্তির চেয়ে দল বড়। নিজের বলয় কিংবা মাই ম্যান ঘিরে কোনো এমপি অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করলে কেন্দ্রকে অবহিত করা হবে। কেন্দ্র সেই অনুযায়ী পদক্ষেপ নেবে।
এদিকে গত ৪ জুলাই থেকে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান রাজধানীর গুলশানে তার রাজনৈতিক কার্যালয়ে বিভিন্ন বিভাগের জেলা নেতাদের সঙ্গে ধারাবাহিক সাংগঠনিক বৈঠক করছেন। বৈঠকে স্থানীয় নির্বাচনে অভ্যন্তরীণ কোন্দল দূর করে একক প্রার্থী বাছাইয়ে জেলার সাংগঠনিক নেতাদের নির্দেশ দেন তারেক রহমান। দলের প্রার্থীদের পক্ষে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করা এবং বিতর্কিত কাউকে দলের সমর্থন না দেওয়ার বিষয়েও নেতাদের সতর্ক করা হচ্ছে।
গত শনিবার রাতে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকেও স্থানীয় নির্বাচনে দলের প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে কমিটির সদস্য বেগম সেলিমা রহমান সময়ের আলোকে বলেন, আমরা চেষ্টা করছি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে যোগ্যতম একক প্রার্থী ঠিক করতে। যদিও স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় প্রতীক থাকবে না। তাই সব জায়গায় দলের একক প্রার্থী দেওয়াটাও একটু টাফ। তবে আমরা চাচ্ছি দলের যোগ্যতার মাপকাঠিতে উত্তীর্ণ ব্যক্তিকে প্রার্থী দিতে। এ নিয়ে সব স্তরের সাংগঠনিক নেতাদের সঙ্গে আলোচনা হচ্ছে দলের হাইকমান্ডের।
জামায়াতের নজর নির্দিষ্ট এলাকায় : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খুলনা ও উত্তরবঙ্গের কিছু অঞ্চলে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী শক্তিশালী অবস্থান দেখিয়েছে। খুলনা বিভাগে মোট ৩৬টি আসন ছিল। জামায়াত একা ২৫টি আসনে জয়লাভ করেছে। খুলনা বিভাগে জামায়াতের প্রার্থীরা প্রায় ৪৮.২৬% ভোট পেয়েছেন (যেখানে বিএনপি পেয়েছে ৪৩.৫৫%)। নির্দিষ্ট জেলার ফল হিসেবে সাতক্ষীরা জেলার ৪টি আসনের সবকটিতেই জামায়াত জিতেছে। উত্তরবঙ্গের রংপুর বিভাগে এবং রাজশাহী বিভাগের কিছু অংশে জামায়াত ভালো ফল করেছে।
ভালো ফল পাওয়া এলাকায় নজর দিচ্ছে জামায়াতে ইসলামী। দলটির কেন্দ্রীয় নেতারা ইতিমধ্যে মাঠে কাজ শুরু করেছেন। জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম সময়ের আলোকে বলেন, স্থানীয় নির্বাচন নিয়ে আমাদের দুটি লক্ষ্য— প্রথমত হারজিত বড় বিষয় নয়। আমরা সব জায়গায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করব। এমনকি নারী প্রতিনিধিত্বও নিশ্চিত করা হবে। এতে জনগণের কাছাকাছি যাওয়া আমাদের জন্য সহজ হবে। জয়ের জন্যই ব্যাপকভাবে কাজ করছি। কিন্তু স্থানীয় নির্বাচনের বাস্তবতা কিন্তু ভিন্ন। এখানে ব্যক্তি এলাকা উত্তর-দক্ষিণ সীমানা খাল-বিলসহ আঞ্চলিক বিভিন্ন বিষয় দেখে ভোট নির্ধারিত হয়।
দ্বিতীয়ত আমরা টার্গেট নির্ধারণ করেছি যেসব এলাকায় আমরা জাতীয় নির্বাচনে ভালো ফল অর্জন করেছি। যেসব আসনে আমরা এমপি নির্বাচিত হয়েছি, সেগুলোতে ব্যাপক প্রস্তুতি অর্থাৎ সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হবে জাতীয় নির্বাচনের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে। অনেক এলাকায় আমরা জিততে পারিনি; কিন্তু ভালো ভোট পেয়েছি, সেগুলোও আমাদের অগ্রাধিকারে থাকবে। তিনি বলেন, স্থানীয় নির্বাচনে শতভাগ অংশগ্রহণ জামায়াতের নতুন অভিজ্ঞতা বৈকি। আমাদের প্লাস পয়েন্ট দলের মধ্যে বিদ্রোহী প্রার্থী নেই। সেই জন্য আশা করি স্থানীয় নির্বাচনে আমরা ভালো করতে পারব।
যদিও জামায়াতে ইসলামীর অভিযোগ, নির্বাচন কমিশন স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারছে না। দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের দাবি, সরকারের নির্দেশনাতেই এটি পরিচালিত হচ্ছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে ইসির অধীনে নিরপেক্ষ স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজন সম্ভব নয়। তিনি জানান, জাতীয় নির্বাচনে জোটবদ্ধভাবে নির্বাচন করলেও স্থানীয় নির্বাচনে ১১ দলীয় ঐক্যের সব দল আলাদাভাবে নির্বাচন করবে।
এককভাবে নিজেদের চেনাতে চায় এনসিপি : জাতীয় নির্বাচন জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোটবদ্ধভাবে করলেও স্থানীয় নির্বাচন এককভাবে করার পণ করেছে জুলাই অভ্যুত্থান থেকে গড়ে ওঠা দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। তারাও বিভিন্ন পর্যায়ের প্রার্থী ঘোষণা করছে। তবে মাঠ থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের প্রচার বেশি লক্ষ করা যাচ্ছে।
এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক মো. গোলাম সারোয়ার তুষার সময়ের আলোকে বলেন, আমরা সংগঠনকে বিস্তৃতি করতেই এককভাবে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। নির্বাচনে সংগঠনকে কেন্দ্র থেকে একেবারে তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছাতে চাই। তবে স্থানীয়ভাবে অনেক জায়গায় প্রার্থীদের উদ্যোগে সমঝোতা হতে পারে ১১ দলীয় ঐক্যের মধ্যে। আমরা দল সমর্থিত প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করব পর্যায়ক্রমে কেন্দ্রীয়ভাবে। ইতিমধ্যে বিভিন্ন জায়গায় নাম ঘোষণা করা হয়েছে। তারা মাঠ পর্যায়ে কাজ করছেন। স্থানীয় নির্বাচনের মাধ্যমে ওয়ার্ড পর্যায়ে মানুষের কাছে যেতে চাই।
দৃষ্টি নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ভোটে : নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সমর্থিতরা স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না, এটি সাদা চোখে সহজেই অনুমেয়। ভোট নিয়ে দলটির তৎপরতা কোথাও চোখে পড়ছে না। যদিও এবারের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক না রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। চাইলে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীসহ যেকোনো দলের কর্মী-সমর্থকরা অংশ নিতে পারবেন।
আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) নেতাকর্মীরা স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নিলে সরকারের অবস্থান কী হবে— এ প্রশ্নের জবাবে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, দলীয়ভাবে নির্বাচন হচ্ছে না। তাই কোনো দলের পরিচয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ নেই। বৈধ প্রার্থী হিসেবে যাদের যোগ্যতা রয়েছে, তারা নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, স্থানীয় পর্যায়ে আওয়ামী লীগের ভোট টানতে ব্যক্তিকেন্দ্রিক কাজ শুরু করেছেন প্রার্থীরা। গোপনে ও কৌশলে তারা ভোটের সমীকরণ মেলাচ্ছেন। কীভাবে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের ভোট টানা যায় ফন্দি-ফিকির করছেন সব দলের প্রার্থীরা।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে