রাজধানী ঢাকায় ব্যবসা শুরুর অন্যতম প্রধান শর্ত ট্রেড লাইসেন্স। ছোট মুদি দোকান থেকে বড় প্রতিষ্ঠান— সব ধরনের ব্যবসার জন্য সিটি করপোরেশন থেকে ট্রেড লাইসেন্স নেওয়া বাধ্যতামূলক। একই সঙ্গে প্রতি বছর তা নবায়ন করতে হয়। বিশেষ করে ক্লিনিক, হাসপাতাল, ট্রাভেল এজেন্সি, আবাসিক হোটেল, সিএনজি স্টেশন ও দাহ্য পদার্থের ব্যবসার মতো প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ট্রেড লাইসেন্স ছাড়া ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ নেই।
দ্য মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন (ট্যাক্সেশন) রুলস, ১৯৮৬ অনুযায়ী, সিটি করপোরেশন এলাকায় যেকোনো ধরনের ব্যবসা পরিচালনার জন্য ট্রেড লাইসেন্স বাধ্যতামূলক। তবে রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনে একই সেবা নিতে গিয়ে নাগরিকদের অভিজ্ঞতা এক নয়। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে (ডিএনসিসি) অনলাইনে আবেদন, যাচাই, ফি পরিশোধ এবং লাইসেন্স পাওয়ার সুযোগ থাকায় ব্যবসায়ীদের ভোগান্তি তুলনামূলক কম। বিপরীতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, সেখানে সরাসরি অফিসে গিয়ে আবেদন করার প্রক্রিয়া এখনও চালু থাকায় অনেক ব্যবসায়ীকে ফরম সংগ্রহ, কাগজপত্র জমা ও যাচাই-বাছাইয়ের জন্য অফিসে যেতে হচ্ছে।
এ কারণে ট্রেড লাইসেন্স সেবায় ডিএসসিসি পিছিয়ে রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিপরীতে অনলাইন ব্যবস্থার কারণে ডিএনসিসিতে এ সেবা তুলনামূলক সহজ হয়েছে।
তবে অনলাইন ব্যবস্থার কিছু ঝুঁকির কথাও বলছেন সংশ্লিষ্টরা। কেউ কেউ অনলাইনে ভুয়া নাম-ঠিকানা ব্যবহার করে ই-ট্রেড লাইসেন্স নেওয়ার সুযোগ কাজে লাগাচ্ছেন। এতে সিটি করপোরেশনও বিপাকে পড়তে পারে। বিশেষ করে বার, রেস্টুরেন্ট ও ফায়ার-সংক্রান্ত লাইসেন্সের মতো জননিরাপত্তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সেবাগুলো অনলাইনে দেওয়ার ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি। তবে ট্রেড ও অন্যান্য তুলনামূলক কম ঝুঁকিপূর্ণ লাইসেন্স অনলাইনে দেওয়ার ক্ষেত্রে ঝুঁকি কম বলে সংশ্লিষ্টদের মত। ই-ট্রেড লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে ডিএনসিসি এগিয়ে থাকলেও ডিএসসিসির ওয়েবসাইটে ই-ট্রেড লাইসেন্সের ব্যবস্থা চালু থাকার কথা বলা হয়েছে। তবে বাস্তবে এটি কতটা কার্যকর, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
ডিএসসিসির প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম জানিয়েছেন, ব্যবসায়ীদের জন্য ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন প্রক্রিয়া আরও সহজ, দ্রুত ও ডিজিটাল করতে কাজ করছে ডিএসসিসি। একই সঙ্গে ট্রেড লাইসেন্স পাঁচ বছর মেয়াদে নবায়নের ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ট্রেড লাইসেন্স সেবায় জোর-জবরদস্তির পরিবর্তে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সহযোগিতার ভিত্তিতে কাজ করতে চায় সংস্থাটি।
ফি ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র : ব্যবসার ধরন অনুযায়ী ট্রেড লাইসেন্সের ফি ভিন্ন। ঢাকা সিটি করপোরেশন থেকে ট্রেড লাইসেন্স সংগ্রহে ব্যবসার ধরন অনুযায়ী ২০০ টাকা থেকে ২৬ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে। এক নামে একাধিক ব্যবসা পরিচালনা করলে ব্যবসার ধরন অনুযায়ী খরচ আরও বাড়তে পারে। সিটি করপোরেশন আদর্শ কর তফসিল, ২০১৬-এর বিধিমালা অনুযায়ী ট্রেড লাইসেন্সের ফি নির্ধারণ করা হয়।
এর সঙ্গে সাইনবোর্ডের আকার অনুযায়ী ফি, লাইসেন্স বইয়ের খরচ এবং এসবের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট যোগ হয়। ট্রেড লাইসেন্সের আনুষঙ্গিক খরচ আবেদন ফরমে উল্লেখিত ব্যাংকে জমা দিয়ে পরিশোধ করতে হয়। আবেদন ফরম জমা দেওয়ার পর লাইসেন্স পেতে সাত কর্মদিবস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
আবেদনের সঙ্গে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের স্থান ও মালিকানার ধরন অনুযায়ী বিভিন্ন কাগজপত্র দিতে হয়। ব্যক্তিগত মালিকানাধীন স্থাপনার ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশনের হালনাগাদ হোল্ডিং ট্যাক্সের রশিদ, নিজের দোকানের ক্ষেত্রে ইউটিলিটি বিল এবং ভাড়া করা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে ভাড়ার চুক্তিপত্রের সত্যায়িত ফটোকপি দিতে হয়। এ ছাড়া আবেদনকারীর তিন কপি পাসপোর্ট সাইজের ছবি প্রয়োজন। যৌথভাবে ব্যবসা পরিচালনা করলে ৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে পার্টনারশিপের অঙ্গীকারনামা ও শর্তাবলি জমা দিতে হয়।
সরকারি এসএমই সহায়তা প্ল্যাটফর্মের তথ্যে বলা হয়েছে, আবেদন ফরম, লাইসেন্স বই, নির্ধারিত ট্রেড লাইসেন্স ফি, প্রযোজ্য কর ও ভ্যাট এবং সাইনবোর্ড ফির মতো বিভিন্ন খরচ রয়েছে। সেখানে ব্যবসার ধরন অনুযায়ী সাধারণ ট্রেড লাইসেন্স ফি ১০০ টাকা থেকে ৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
ডিএনসিসিতে অনলাইনে আবেদন : ডিএনসিসির সেবা-পদ্ধতিতে বলা হয়েছে, ট্রেড লাইসেন্সের জন্য নির্ধারিত ওয়েবসাইটে নতুন ইউজার খুলে আবেদন করতে হয়। আবেদনকারীকে ছবি, জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি, অনাপত্তি সনদ, ব্যবসার মূলধনের প্রমাণ, মালিকানা বা ভাড়ার চুক্তিপত্র এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে হোল্ডিং ট্যাক্সের রশিদসহ প্রয়োজনীয় নথি অনলাইনে আপলোড করতে হয়।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা যাচাই-বাছাইয়ের পর আবেদন অনুমোদন করলে নির্ধারিত ফি দেওয়ার জন্য এসএমএস বা ই-মেইলে জানানো হয়। ফি পরিশোধের পর অনলাইন থেকেই লাইসেন্স প্রিন্ট করা যায়।
ডিএনসিসির তথ্য অনুযায়ী, সাধারণ ও ঝুঁকিপূর্ণ বা জনসংবেদনশীল নয়— এমন ব্যবসার ক্ষেত্রে অটো-জেনারেটেড ট্রেড লাইসেন্সের ব্যবস্থাও রয়েছে। আবেদন দাখিল ও প্রয়োজনীয় পেমেন্ট সম্পন্ন হলে লাইসেন্স পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। নতুন ট্রেড লাইসেন্সের ক্ষেত্রে সময়সীমা তিন কর্মদিবস এবং নবায়নের ক্ষেত্রে দুই কর্মদিবস উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশেষ করে নবায়নের ক্ষেত্রে অনলাইন ব্যবস্থায় ব্যবসায়ীদের সুবিধা বেশি। আগে কাগজপত্র নিয়ে অফিসে গিয়ে লাইনে দাঁড়াতে হলেও এখন ঘরে বসে আবেদন করার সুযোগ রয়েছে। ই-ট্রেড লাইসেন্সে ডিজিটাল যাচাইয়ের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। ডিএনসিসির ই-ট্রেড লাইসেন্স ভেরিফিকেশন ব্যবস্থায় কিউআর কোড ও ইউনিক আইডেন্টিফিকেশনের মাধ্যমে লাইসেন্স যাচাই করা যায়।
এক প্ল্যাটফর্মে সেবা চান ব্যবসায়ীরা : ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর দীর্ঘদিনের দাবি, ট্রেড লাইসেন্সসহ স্থানীয় সরকারের সেবাগুলো একক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আনা। এতে দালালনির্ভরতা, অপ্রয়োজনীয় যাতায়াত ও হয়রানি কমার পাশাপাশি রাজস্ব আদায়ের স্বচ্ছতা বাড়তে পারে। আবেদনকারীর প্রতিটি ধাপের অগ্রগতি অনলাইনে দেখা গেলে ফাইল আটকে থাকার সুযোগও কমবে।
নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, ট্রেড লাইসেন্সের পুরো প্রক্রিয়াকে ‘এক দরজা, এক প্ল্যাটফর্ম’ নীতির আওতায় আনা উচিত। আবেদন, কাগজপত্র যাচাই, সরেজমিন পরিদর্শন, ফি নির্ধারণ, পেমেন্ট ও লাইসেন্স ইস্যু— সব ধাপের ডিজিটাল ট্র্যাকিং থাকলে সেবার মান বাড়বে। যেসব ব্যবসার ক্ষেত্রে সরেজমিন পরিদর্শন বাধ্যতামূলক, সেসব ক্ষেত্রেও আবেদনকারীকে বারবার অফিসে না পাঠিয়ে পরিদর্শনের সময় ও অগ্রগতি অনলাইনে জানানো যেতে পারে।
ডিএনসিসির অনলাইন ব্যবস্থার অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, ডিজিটাল সেবা চালু হলে নাগরিকের অফিসে যাওয়ার প্রয়োজন অনেকটাই কমানো সম্ভব। ডিএসসিসির ক্ষেত্রেও যেহেতু ই-ট্রেড লাইসেন্স ব্যবস্থা রয়েছে, সেটিকে আরও কার্যকর, সহজবোধ্য ও সর্বজনীন করার প্রয়োজন রয়েছে। তবে সেবা সহজ করার পাশাপাশি যথাযথ যাচাই-বাছাই নিশ্চিত করাও জরুরি।
ডিএসসিসির প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম বলেন, ব্যবসায়ীদের জন্য ট্রেড লাইসেন্স পাঁচ বছর মেয়াদে নবায়নের ব্যবস্থা চালু করা হবে। ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন প্রক্রিয়া আরও সহজ, দ্রুত ও ডিজিটাল করার কাজ চলছে। ঘরে বসেই ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন, হোল্ডিং ট্যাক্স ও অন্যান্য কর পরিশোধের সুযোগ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর সহযোগিতায় দীর্ঘদিনের বকেয়া ট্রেড লাইসেন্স ও সিটি করপোরেশনের মার্কেটগুলোর ভাড়া আদায়ের সমস্যারও সমাধান করা হবে।
নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, অনলাইন বা সেবা সহজীকরণের নামে যাচাই-বাছাই ছাড়া ট্রেড লাইসেন্স দেওয়া আধুনিক নগর পরিকল্পনার ধারণার সঙ্গে বেমানান। সেবা সহজ করার পাশাপাশি যথাযথ যাচাই-বাছাই নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
নগর পরিকল্পনাবিদ আশরাফুল ইসলাম বলেন, ট্রেড লাইসেন্স সেবা আরও সহজলভ্য করা উচিত। এখন আর অ্যানালগ যুগ নেই; সবকিছুই অনলাইনভিত্তিক হচ্ছে। তাই ট্রেড লাইসেন্সও অনলাইনভিত্তিক হলে নগরবাসী আরও বেশি সুবিধা পাবেন এবং তাদের সিটি করপোরেশনের কার্যালয়ে বারবার যেতে হবে না।
তবে তিনি বলেন, অনেক সময় কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়াই অবৈধ ব্যবসায় ট্রেড লাইসেন্স দেওয়ার ঘটনাও দেখা যায়। এতে ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও তারা ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করেন। আবার কোথাও ট্রেড লাইসেন্স ছাড়াই ব্যবসা চলছে। তাই সেবা সহজীকরণের পাশাপাশি যথাযথ যাচাই-বাছাইও করতে হবে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে