গাজার শেখ রাদওয়ান এলাকা। ভোর ৬টা। ৪২ বছর বয়সী আবু কুসাই কাদ্দুরার দিনের শুরু অভিনয় দিয়ে নয়, আগুন জ্বালানোর উপকরণ খোঁজার মধ্য দিয়ে। পরিবারের জন্য রান্না ও শীত নিবারণের কাজে জ্বালানি দরকার। তাই তিনি স্থানীয় একটি দোকান থেকে কাঠ কিনতে যান। প্রতি কেজি কাঠের দাম ৭ শেকেল, প্রায় ২ ডলার।
সামর্থ্য না থাকলে কাদ্দুরা কুড়িয়ে আনেন কার্ডবোর্ড, প্লাস্টিক কিংবা ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাড়ির কাঠের টুকরো। ছোট্ট আগুন জ্বালিয়ে পরিবারের জন্য রান্না করেন, তারপর হাতের কালো ছাই ধুয়ে বেরিয়ে পড়েন মহড়ার উদ্দেশে।
মহড়ার জায়গায় পৌঁছাতে তাকে প্রায় দুই ঘণ্টা হেঁটে যেতে হয়। ধ্বংসস্তূপে ভরা এবং ইসরায়েলি গুলির ঝুঁকি রয়েছে বলে যে প্রধান সড়কটি এড়িয়ে চলেন তিনি, সেই পথের বদলে পাশের ছোট রাস্তা ধরে এগিয়ে যান। ক্লান্ত শরীরে যখন পৌঁছান গাজা সিটির রাশাদ আল-শাওয়া সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের কার পার্কে বানানো কাপড় ও প্লাস্টিকের অস্থায়ী তাবুতে, তখন হাঁটুর ব্যথায় কাবু হয়ে পড়েন। শ্বাস নিতেও কষ্ট হয়।
তবু বিশ্রামের সুযোগ নেই। ‘মহড়ায় পৌঁছেই কাজ শুরু করি। ক্লান্ত থাকলেও একটু বিরতি নেওয়ার সময়ও আমাদের নেই,’ বলেন কাদ্দুরা।
অভিনয়ের জগতে তার এই যাত্রা যুদ্ধেরই আরেক বাস্তবতা। মঞ্চে তিনি অভিনয় করছেন গাজার একটি হাসপাতালে আটকে পড়া এক চিকিৎসকের চরিত্রে। তার কোলে থাকা খেলনা শিশুটি চরিত্রটির সন্তান। হাসপাতালে কোনো অ্যানেসথেশিয়া নেই। নিজের হাতেই শিশুটির পা কেটে ফেলতে বাধ্য হন চিকিৎসক। শেষ পর্যন্ত শিশুটির মৃত্যু হয়।
এই দৃশ্যের ভিত্তি গাজারই এক বাবার বাস্তব অভিজ্ঞতা। অভিনেতারা ওই বাবার একটি ভিডিও দেখেছেন।
যুদ্ধের আগে কাদ্দুরা অভিনয় করতেন না। স্থানীয় গণমাধ্যমে প্রোডাকশন ম্যানেজার ও সাউন্ড টেকনিশিয়ান হিসেবে কাজ করতেন তিনি। উত্তর গাজার আল-তাওয়াম এলাকায় বিমান হামলায় তার বাড়ি ধ্বংস হয়ে যায়। এখন স্ত্রী ও তিন সন্তান নিয়ে ভাড়া করা একটি বাড়ির ছাদে প্লাস্টিকের ত্রিপলের নিচে একটি কক্ষে থাকেন তিনি।
মহড়ায় যখন শিশুটিকে কোলে নেন, তখন সব সময় সেটি চরিত্রের সন্তান বলে মনে হয় না কাদ্দুরার কাছে।
তিনি বলেন, ‘আমি শুধু একটি চরিত্রে অভিনয় করছিলাম না; নিজের সন্তানদের মুখ দেখছিলাম। মঞ্চে ওই শিশুটিকে যখনই কোলে নিয়েছি, মনে হয়েছে আগামীকাল হয়তো এই শিশুটিই আমার নিজের কোনো ছেলে হতে পারে। ভয় এতটাই বাস্তব ছিল যে চোখের পানি ধরে রাখতে পারিনি।’
তবে মঞ্চে তিনি চরিত্র ভাঙেননি। পরিচালক আলী আবু ইয়াসিন মহড়া থামানোর নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত শিশুটিকে কোলে ধরে রেখেছিলেন। এরপর মঞ্চের পাশে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। প্রায় ১৫ মিনিট পানি পান করে চুপচাপ বসে থাকেন তিনি। আবার দৃশ্যটি করতে পারবেন কি না, তা নিয়েও অনিশ্চিত ছিলেন।
পরে কাদ্দুরা বলেন, ‘নিজের সন্তানদের কথা মনে পড়ে গিয়েছিল। একজন বাবা কীভাবে সন্তানের ক্ষত নিয়ে অসহায় ও ভেঙে পড়তে পারে, সেই অনুভূতিই মনে হচ্ছিল।’
শেষ পর্যন্ত পরিচালক আবার অভিনেতাদের ডাকেন। কাদ্দুরা উঠে দাঁড়ান, নিজের জায়গায় ফিরে যান এবং একই দৃশ্য আবার অভিনয় করেন।
ধ্বংসস্তূপের মধ্যেই তৈরি হচ্ছে থিয়েটার
এমন অভিজ্ঞতাই অভিনেতাদের মঞ্চে তুলে ধরতে বলেছেন পরিচালক আলী আবু ইয়াসিন। গাজার মানুষ যে অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে বেঁচে আছেন, সেটিকে নাটকে রূপ দেওয়াই তার লক্ষ্য।
৩৭ বছর ধরে অভিনেতা, নাট্যকার ও পরিচালক হিসেবে কাজ করছেন আবু ইয়াসিন। গাজায় তিনি বহু প্রজন্মের অভিনেতাকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। তার প্রযোজিত নাটক গাজার বাইরেও মঞ্চস্থ হয়েছে। মিসর ও তিউনিসিয়াতেও তার কাজ গেছে। তিউনিস আন্তর্জাতিক থিয়েটার উৎসবে সেরা অভিনেতার পুরস্কারও পেয়েছেন তিনি।
কিন্তু যে সাংস্কৃতিক অবকাঠামোর ওপর তার দীর্ঘ ক্যারিয়ার গড়ে উঠেছিল, যুদ্ধের ধাক্কায় সেটিই ধীরে ধীরে হারিয়ে গেছে। ২০১৮ সালে ইসরায়েলি বিমান হামলায় আল-মিশাল সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ধ্বংস হয়। ২০২৩ সালে গাজা সিটির রাশাদ আল-শাওয়া সাংস্কৃতিক কেন্দ্রও হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ইউনেস্কোর হিসাবে, ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর গাজায় ১৬৪টি সাংস্কৃতিক স্থাপনায় ক্ষয়ক্ষতি যাচাই করা হয়েছে। এর মধ্যে ১২৮টি ছিল ঐতিহাসিক বা শিল্প-সাংস্কৃতিক ভবন।
আবু ইয়াসিনের সামনে তাই প্রশ্ন ছিল, যখন থিয়েটারই নেই, তখন নাটক মঞ্চস্থ হবে কোথায়?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই ‘৫০ মিনিট ইন গাজা’ নাটকের যাত্রা শুরু। ২০২৬ সালের এপ্রিলে রোজা লুক্সেমবার্গ ফাউন্ডেশনের সহায়তায় এটি প্রথমে নাট্যলেখার কর্মশালা হিসেবে শুরু হয়। এতে ১৪ জন তরুণ-তরুণীর অংশ নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু যুদ্ধ চলতে থাকায় কেউ আহত হয়ে চিকিৎসার জন্য গাজার বাইরে চলে যান, কেউ বাস্তুচ্যুত হন, আবার কেউ মহড়ার জায়গায় পৌঁছাতে পারেননি।
শেষ পর্যন্ত আটজন এই প্রযোজনায় যুক্ত হন। প্রথমে তাদের লক্ষ্য ছিল মঞ্চের জন্য লেখা শেখা। কিন্তু নাটকের চিত্রনাট্য শেষ হওয়ার পর অংশগ্রহণকারীরাই সিদ্ধান্ত নেন, তারাই এতে অভিনয় করবেন।
ফাউন্ডেশন প্রযোজনার মৌলিক খরচ বহন করে এবং অভিনেতাদের বেতন নয়, সামান্য সম্মানী দেয়। কাদ্দুরা জানান, তা না হলে তার পরিবার মূলত মানবিক সহায়তার ওপরই নির্ভর করে। তবে আবু ইয়াসিনের মতে, অর্থের জন্য কেউ ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঝুঁকিপূর্ণ ও ক্লান্তিকর পথ পাড়ি দিয়ে মহড়ায় আসতেন না। বরং নাটক হয়ে উঠেছিল মানসিক ও আবেগীয় চাপ সামলানোর একটি উপায়।
আবু ইয়াসিন বলেন, ‘আমরা সাধারণ মানুষ। বিশুদ্ধ পানি, বিদ্যুৎ, খাবারের গাড়ি আর জীবিকার পেছনে ছুটছি। আকাশচুম্বী দামের মধ্যে টিকে থাকার চেষ্টা করছি। কিন্তু যখন আমরা মঞ্চে উঠি, তখন নিজেদের আরও জীবন্ত মনে হয়।’
তাঁবু থেকে ক্যাফে, সেখান থেকে মঞ্চ
শুরুতে নাটকের কোনো মঞ্চই ছিল না। অভিনেতারা গাজা সিটির রাশাদ আল-শাওয়া সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের কার পার্কে তৈরি কাপড়ের তাঁবুর ভেতর গাদাগাদি করে মহড়া দিতেন। সেখানে ফিলিস্তিনি সাংবাদিক ইউনিয়নেরও একটি তাবু ও অস্থায়ী কেন্দ্র ছিল।
ক্যানভাসের অপর পাশে থাকতেন বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলো। চারপাশে ঘাম, ধুলো ও পোড়া প্লাস্টিকের গন্ধ। বাইরে থেকে ভেসে আসত তর্ক-বিতর্ক ও যানবাহনের শব্দ। মাথার ওপর প্রায় সব সময়ই শোনা যেত ইসরায়েলি নজরদারি ড্রোনের গুঞ্জন।
১২ দিন পর ওই এলাকায় গুলির শব্দ বাড়লে দলটি আবার জায়গা বদলায়। এবার গাজা সিটির কেন্দ্রস্থলের আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত একটি ভবনের আজওয়া ক্যাফের ছোট ঘরে মহড়া শুরু হয়।সেখানে ছিল না পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা। বিদ্যুৎও ছিল অনিয়মিত। গান বাজাতে ব্যবহার করা হতো মোবাইল ফোন।
মঞ্চ তৈরির জন্যও ছিল না প্রয়োজনীয় উপকরণ। কাঠ জ্বালানি হিসেবে অত্যন্ত মূল্যবান হয়ে ওঠায় অভিনেতারা কাঠের টুকরো ও ক্ষতিগ্রস্ত তাঁবুর কাপড় সংগ্রহ করেন। এক বাস্তুচ্যুত কারিগরের সহায়তায় নিজেরাই তৈরি করেন মঞ্চসজ্জা।
আবু ইয়াসিন বলেন, ‘যখন আপনি আমাকে জিজ্ঞেস করেন কী কী সমস্যা ছিল, তখন মনে হয় প্রশ্নটা হওয়া উচিত— কী স্বাভাবিক বা সহজলভ্য ছিল? সবকিছুতেই সমস্যা ছিল। কাজটি সত্যিই ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে উঠে এসেছে। মঞ্চসজ্জা এসেছে তাঁবু থেকে, আর অভিনেতারা তখনও শরীর থেকে বারুদের ধুলো ঝাড়ছিলেন।’
কাদ্দুরার মতো কয়েকজন অভিনেতা ধ্বংস হয়ে যাওয়া রাস্তা পেরিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা হেঁটে মহড়ায় আসতেন। তাদের কাপড়ে লেগে থাকত ধ্বংসস্তূপের ধুলো।
এরপর সেই মানুষগুলোই যুদ্ধের মধ্যে আটকে পড়া মানুষের চরিত্রে অভিনয় শুরু করেন।
মে মাসের একদিন অভিনেত্রী ইমান ওদা ‘হানিন’ নামের এক গর্ভবতী নারীর চরিত্রে অভিনয় করছিলেন। চরিত্রটি নয় বছর ধরে সন্তান নেওয়ার চেষ্টা করেছে। অবশেষে গর্ভধারণের পর সে অবরুদ্ধ অবস্থায় একটি হাসপাতালে সন্তান জন্ম দেওয়ার অপেক্ষায়।
মহড়ার মাঝখানেই কাছাকাছি বিস্ফোরণ ঘটে। একটি ভবনে আঘাত হানে বিস্ফোরণটি। ধুলো ঢুকে পড়ে মহড়ার জায়গায়। অভিনেতারা মুখ-নাক ঢেকে দ্রুত বাইরে বেরিয়ে আসেন। তারপর প্রায় একই সঙ্গে সবাই মোবাইল ফোন হাতে নেন পরিবারের খোঁজ নিতে।
কাদ্দুরা বলেন, ‘কাছাকাছি বোমা পড়লে আমরা সঙ্গে সঙ্গে মহড়া বন্ধ করি। আমি ফোনের দিকে ছুটে যাই, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করি। নেটওয়ার্ক দুর্বল থাকায় কয়েক মিনিটের মধ্যেই প্রকৃত আতঙ্কের মধ্যে পড়ে যাই।’
পরিবার নিরাপদ আছে নিশ্চিত হওয়ার পরই আবার মহড়ায় ফিরতেন তারা।
২৫ বছর বয়সী ইমান ওদা ছয় বছর ধরে অভিনয় করছেন। যুদ্ধ তাকে আরও একটি বিষয় শিখিয়েছে, সেটা হলো আকাশের শব্দ চেনা।
তিনি জানান, অ্যাপাচি হেলিকপ্টার বা নজরদারি ড্রোন কাছাকাছি এলে অনেক সময় তারা মহড়া চালিয়ে যেতেন। তবে কখনো চোখ চলে যেত আকাশের দিকে, কখনো একে অপরের দিকে।
ওদা বলেন, ‘আমার বাস্তব সত্তা আর চরিত্রের মধ্যে যে যোগসূত্র, সেটি হলো ভয়। আমি কি নাটক শেষ করে বাড়ি ফিরতে পারব, নাকি অন্য কিছু ঘটবে? আমি এমন একজন মানুষ হয়ে গেছি, যে সবকিছুকে ভয় পায়— এমনকি আনন্দকেও।’
কখনো একটি নামই সেই ভয় ও শোককে সামনে এনে দিত। পরিচালক যখন ‘মিসিং ইউসুফ’ নামের একটি চরিত্রের কথা বলেন, তখন কেঁদে ফেলেন ওদা। তার বাবার নামও ছিল ইউসুফ। যুদ্ধের সময় তিনি নিহত হন। পরে ইসরায়েলি বাহিনী সেই কবরস্থান বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেয়। এরপর পরিবার আর তার কবরটি শনাক্ত করতে পারেনি।
নিজের জীবনই হয়ে ওঠে অভিনয়ের গল্প
আরেক অভিনেতা ৩৫ বছর বয়সী তামের নাজমের জন্যও নাটক ও বাস্তবতার সীমারেখা ছিল খুবই পাতলা।
‘৫০ মিনিট ইন গাজা’ নাটকে তিনি খালেদের চরিত্রে অভিনয় করেন। বহু বছর ধরে স্ত্রীকে নিয়ে সন্তান নেওয়ার চেষ্টা করার পর আইভিএফের শেষ প্রচেষ্টার সময়ে যুদ্ধের মধ্যে হাসপাতালে আটকে পড়ে ওই চরিত্র।
বাস্তব জীবনেও নাজমের গল্প প্রায় একই। যুদ্ধের আগে গাজা সিটির নাসের এলাকায় একটি অ্যাপার্টমেন্ট কেনার জন্য বছরের পর বছর টাকা জমিয়েছিলেন তিনি। সেই বাড়ি ধ্বংস হয়ে যায়।
গর্ভবতী স্ত্রীকে নিয়ে কখনো বন্ধুদের বাড়িতে, কখনো শ্বশুরবাড়িতে, কখনো ফুটপাতে, আবার কখনো তাঁবুতে আশ্রয় নিয়েছেন। যুদ্ধের মধ্যেই তাদের দ্বিতীয় সন্তান জন্ম নেয়।
নাজম বলেন, ‘আমি খালেদ চরিত্রে অভিনয় করছিলাম না; আমি তার হয়ে বেঁচে ছিলাম।’
তিনি জানান, গর্ভবতী স্ত্রীকে নিয়ে আগুন ও ঝুঁকির মধ্যে উত্তর গাজা থেকে বাস্তুচ্যুত হওয়ার অভিজ্ঞতা তার নিজের। প্রতিটি মুহূর্তে ভয় ছিল, স্ত্রী হয়তো সন্তান হারাবেন।
প্রতিবার মহড়ায় যাওয়ার সময় তার স্ত্রীও ভয় পেতেন যে, তিনি ফিরতে পারবেন কি না। বের হওয়ার আগে স্ত্রীকে বলতেন, ‘কাছাকাছি বোমা পড়লে বাইরে যেও না। নিজের ও শিশুটির যত্ন নিও।’
তারপর তিনি বেরিয়ে পড়তেন এমন এক মানুষের চরিত্রে অভিনয় করতে, যে নিজের পরিবারকে হারানোর আতঙ্কে আছে।
‘আমরা বুকের ওপর হাত রেখে বের হতাম। জানতাম, গাজায় বাইরে বের হওয়া মানে হয় নিরাপদে ফিরে আসা, না হয় কাফনে করে ফিরে আসা,’ বলেন নাজম।
তবু বাড়িতে থেকে তিনি মানসিকভাবে নিরাপদ ছিল না। বাড়ি হারানো, বারবার বাস্তুচ্যুত হওয়া এবং গর্ভবতী স্ত্রীকে নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে অভিনয়কে তিনি হতাশার বিরুদ্ধে প্রতিরোধের একটি উপায় হিসেবে দেখেছেন। তার কাছে থিয়েটার ছিল নিজের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হওয়ার পাশাপাশি সেই অভিজ্ঞতাকে নথিবদ্ধ করারও সুযোগ।
অবশেষে মঞ্চে ‘৫০ মিনিট ইন গাজা’
শেষ পর্যন্ত আবু ইয়াসিনের জন্য একটি মঞ্চের ব্যবস্থা হয়। গাজা সিটির আল-ওয়াহদা সড়কের এ এম কাত্তান ফাউন্ডেশনের সাংস্কৃতিক কেন্দ্র তাদের জায়গা দেয়।
নিরাপত্তা পরিস্থিতি, বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং আশপাশের ক্ষয়ক্ষতির কারণে প্রকল্পের শুরুতে কেন্দ্রটি বন্ধ ছিল। তবে চিত্রনাট্য লেখা, অভিনয়শিল্পী নির্বাচন ও প্রাথমিক প্রস্তুতি শেষ হওয়ার পর দলটি আনুষ্ঠানিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে যোগাযোগ শুরু করে।
যুদ্ধের আগে কয়েকজন অভিনেতা এই মঞ্চে অভিনয়ও করেছিলেন। তাঁবু, খোলা রাস্তা ও ছোট ঘরে কয়েক মাসের মহড়ার পর তারা আবার একটি থিয়েটার হলে ফিরলেন।
তবে উদ্বোধনের মাত্র কয়েক দিন আগে, ১৯ জুলাইয়ের প্রথম প্রদর্শনীর প্রস্তুতির সময় কাছেই একটি ইসরায়েলি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। ভবন কেঁপে ওঠে, ছাদ থেকে ধ্বংসাবশেষ পড়ে। বাইরে থেকে ভেসে আসে মানুষের চিৎকার। স্থানীয় গণমাধ্যমকে গাজা মেডিকরা জানায়, কাছাকাছি ঘটনায় পাঁচজন নিহত হয়েছেন।
সেদিন সন্ধ্যায়ই দর্শকদের জন্য দরজা খুলে যায়। বিকেল সাড়ে ৪টার মধ্যে প্রায় ১৫০ আসনের হলটি পূর্ণ হতে শুরু করে। প্রবেশ ছিল বিনামূল্যে।
পর্দার আড়ালে কাঁপছিলেন ইমান ওদা। তার ভয় ছিল, বিদ্যুৎ চলে যেতে পারে কিংবা কাছাকাছি আবার হামলা হলে মাঝপথে নাটক বন্ধ করতে হতে পারে।
অভিনেতাদের পরনে ছিল সাধারণ পোশাক, বাস্তুচ্যুতির তাঁবু থেকে জোগাড় করা কিছু কাপড়। ভাঙা আয়না ও মোবাইল ফোনের আলোয় যতটুকু সম্ভব, ততটুকুই মেকআপ করা হয়।
বিকেল ৫টায় আলো নিভে যায়। কাদ্দুরা মঞ্চে উঠে সেই চিকিৎসক হয়ে যান, যিনি নিজের সন্তানকে বাঁচাতে পারেননি। ওদা হয়ে ওঠেন অবরুদ্ধ হাসপাতালে সন্তান জন্ম দিতে থাকা হানিন। আর নাজম হয়ে যান খালেদ, যে মানুষটি বহু বছরের অপেক্ষায় পাওয়া পরিবারকে রক্ষা করতে মরিয়া।
টানা ৫০ মিনিট ধরে তারা এমন কিছু জীবনের গল্প বলেন, যেগুলো আসলে তাদের নিজেদেরই জীবনের সঙ্গে মিশে আছে। দর্শকদের মধ্যে ছিলেন নাজমের পাঁচ বছরের মেয়ে। যুদ্ধের সময় গর্ভে থাকা তার দ্বিতীয় সন্তান তখন জন্ম নিয়েছে। মঞ্চে বাবাকে ধুলোয় মাখা ও ছেঁড়া পোশাকে দেখে মেয়েটি কেঁদে ফেলে। পরে মঞ্চের একটি পুতুল কোলে তুলে নেয় সে।
নাজমের ভাষ্য, মেয়ে তাকে বলেছিল, ‘বাবা, তোমাকে মঞ্চে কাঁদতে দেখে আমিও কেঁদেছি। তুমি যখন আমাদের নিয়ে চিন্তা করো, তখন বাড়িতে যেমন দেখাও, মঞ্চেও তোমাকে ঠিক তেমনই লাগছিল।’
নাজমের স্ত্রীও বলেন, ‘আমার মনে হয়নি আমি একজন অভিনেতাকে দেখছি। মনে হচ্ছিল তোমাকে আর আমাদের ঘরের বাস্তব সংগ্রামকে দেখছি। যেন তুমি আমাদের ঘরের দরজা পুরো দর্শকের সামনে খুলে দিয়েছ।’
‘থিয়েটারকে ধ্বংস করা যায় না’
জুলাইয়ের শেষ থেকে আগস্ট পর্যন্ত নাটকটি গাজার বিভিন্ন এলাকায় প্রদর্শিত হয়। দারাজ, দেইর আল-বালাহ, নুসেইরাত ও খান ইউনিসে নাটকটি মঞ্চস্থ হয়। খান ইউনিসের একটি বিয়ের অনুষ্ঠানের হলে একটি প্রদর্শনীতে ৫০০ জনেরও বেশি দর্শক উপস্থিত ছিলেন বলে জানায় নাট্যদলটি।
আবু ইয়াসিন বলেন, ‘এই প্রদর্শনী দখলদারত্বের প্রতি একটি বার্তা, গাজার সব থিয়েটার ধ্বংস করলেও থিয়েটারকে ধ্বংস করা যায় না। থিয়েটারকর্মী, লেখক ও পরিচালক থাকলেই থিয়েটার থাকবে। হল ধ্বংস হলেও আমরা রাস্তায় অভিনয় করতে পারি।’
নাটকের ৫০ মিনিট শেষ হয়। পর্দা নামে, আলো নিভে যায়। কাদ্দুরা তখন পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ির পথে রওনা হন। সাত বছরের মেয়ে শাম ঘুমিয়ে পড়ায় তাকে কোলে নেন তিনি। বাইরে অন্ধকার। দূরের গোলাগুলির শব্দ ভেসে আসে। মোবাইল ফোনের আলো জ্বেলে পরিবার এগিয়ে চলে।
ছাদের সেই এককক্ষের ঘরে ফিরে কাদ্দুরা মেয়েকে শুইয়ে দেন। অন্য সন্তানরা তখনও খাবারের অপেক্ষায়। দিনের শুরুতে যে কাজ দিয়ে তার সকাল শুরু হয়েছিল, রাতেও সেখানেই ফিরে আসেন তিনি। আবার আগুন জ্বালান কাদ্দুরা। তারপর স্ত্রীকে নিয়ে রাতের খাবার রান্না শুরু করেন।
সূত্র : আল জাজিরা
সময়ের আলো/জেডি