রাজশাহীতে মাদকের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান জোরদার হলেও আদালতে জমে আছে ২৫ হাজারের বেশি মাদক মামলা। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, জেলার বিভিন্ন আদালতে বর্তমানে ২৫ হাজার ৬৭১টি মাদক মামলা বিচারাধীন। পুলিশের দাবি, এসব মামলায় গ্রফতার হওয়া অনেক আসামি জামিনে মুক্ত হয়ে আবারও একই ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন। এতে মাদকবিরোধী অভিযান ও মামলার কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের অধীন বিভিন্ন আদালতে ৬ হাজার ৭৪৯টি, মহানগর দায়রা জজ আদালতে ৭ হাজার ১৬০টি, চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ৯ হাজার ৩৫৫টি এবং জেলা ও দায়রা জজ আদালতসহ বিভিন্ন আদালতে আরও ৩ হাজার ৬০৭টি মাদক মামলা বিচারাধীন। এছাড়া বিভাগীয় বিশেষ আদালত ও ট্রাইব্যুনালেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মামলা নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে।
মাদক নির্মূলে রাজশাহী জেলা পুলিশ অভিযান আরও জোরদার করেছে। গত ২১ থেকে ২৭ জুলাই পর্যন্ত সাত দিনব্যাপী বিশেষ অভিযান চালানো হয়। এতে মাদক কারবারি ও সেবীদের গ্রেফতারের পাশাপাশি অবৈধ অস্ত্র, বিস্ফোরক ও চোরাচালান পণ্য উদ্ধার এবং জিআর, সিআর ও সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের বিরুদ্ধে থাকা গ্রেফতারি পরোয়ানা কার্যকর করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের মতে, নিয়মিত অভিযান চালিয়ে মাদক জব্দ ও আসামি গ্রেফতার করা হলেও দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া, সাক্ষীর অনুপস্থিতি, মামলার জট এবং জামিনের কারণে অনেক আসামি আবারও মাদক কারবারে ফিরে আসছেন। তাদের মতে, পুলিশের অভিযানের পাশাপাশি দ্রুত বিচার, কার্যকর আইন প্রয়োগ ও সামাজিক সচেতনতা নিশ্চিত করা জরুরি।
রাজশাহী জেলা পুলিশের মুখপাত্র ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, রাজশাহী জেলা পুলিশ সারাদেশের মতো মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করছে। জেলা পুলিশের উদ্যোগে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। এসব অভিযানে নিয়মিত মাদক কারবারিদের আটক করা হচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি জরিমানাও করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, পুলিশের দায়িত্ব আসামিদের আটক করে আইনের আওতায় নিয়ে আসা। শাস্তি দেওয়া সম্পূর্ণ বিচার বিভাগের বিষয়। তবে অনেক আসামি অল্প সময়ের মধ্যেই জামিনে মুক্ত হয়ে আবারও একই ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন। আসামিরা কীভাবে দ্রুত জামিন পাচ্ছেন, সেটি আদালতের বিষয়।
আরএমপি মুখপাত্র ও উপ-পুলিশ কমিশনার মো. গাজিউর রহমান বলেন, থানা ও ডিবি পুলিশের পাশাপাশি মাদক নির্মূলে একটি বিশেষ টিম গঠন করা হয়েছে। মাদক বিক্রেতাদের চিহ্নিত করে একটি তালিকাও করা হয়েছে। তালিকা বিশ্লেষণ করে তাদের অবস্থান ও গতিবিধি নির্ধারণের পর সোর্সের তথ্যের ভিত্তিতে তাদের আটক করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, কয়েকজন আসামির বিরুদ্ধে ১৫টি পর্যন্ত মাদক মামলা রয়েছে। এরপরও তারা জামিনে মুক্ত হয়ে যাচ্ছেন। কারা জামিনযোগ্য বা অযোগ্য, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ণ স্বাধীনতা বিচার বিভাগের রয়েছে। তবে যাদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে, তারা দীর্ঘদিন কারাগারে থাকলে অথবা দ্রুত বিচার সম্পন্ন হয়ে শাস্তির মুখোমুখি হলে পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা কমবে বলে মনে করেন তিনি।
রাজশাহী মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের উপপরিচালক মেহেদী হাসান বলেন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন দিন দিন আরও কঠোর করা হচ্ছে। রাজশাহীতে মাদক কারবারে জড়িত অনেকেরই বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ নেই। বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা গেলে তারা মাদক কারবার থেকে সরে এসে অন্য পেশায় যুক্ত হতে উৎসাহিত হবেন। এতে মাদকের বিস্তার কমার পাশাপাশি মাদকসেবীর সংখ্যাও ধীরে ধীরে কমবে।
তিনি আরও বলেন, অনেকে মাদকাসক্তি থেকে বেরিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা করেন। কিন্তু পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থানের অভাবে আবারও একই পথে ফিরে যান। মাদকের বিরুদ্ধে বিদ্যমান আইনে কিছু সংশোধনী আনা হয়েছে, যার মাধ্যমে আইন আগের তুলনায় আরও কঠোর করা হয়েছে।
রাজশাহী বার অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি তৌফিক মোহাম্মদ জাহেদী বলেন, কোনো ব্যক্তিকে মাদকদ্রব্যসহ হাতেনাতে আটক করা হলে আইন অনুযায়ী ১৫ থেকে ২১ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে প্রায় ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে পুলিশ কর্মকর্তারা এই সময়সীমা মেনে চলেন না। ফলে মাদক মামলায় অভিযোগপত্র বা পুলিশ প্রতিবেদন দাখিলে দীর্ঘসূত্রতা দেখা দেয়।
তিনি বলেন, যেসব পুলিশ সদস্য মামলার সাক্ষী হিসেবে থাকেন, তাদের অনেকেই বদলি হয়ে অন্যত্র চলে যাওয়ায় বিচার কার্যক্রমে জটিলতা সৃষ্টি হয়। এ ছাড়া করোনাভাইরাস মহামারির সময় প্রায় দুই বছর বিচার কার্যক্রমে যে স্থবিরতা তৈরি হয়েছিল, তার প্রভাবও এখনো পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি।
মাদক মামলার বিচার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য আইনজীবী, বিচারক ও তদন্ত কর্মকর্তাদের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় জরুরি বলেও মন্তব্য করেন তৌফিক মোহাম্মদ জাহেদী। তার মতে, তিন পক্ষ সমন্বিতভাবে কাজ করলে মাদক মামলার বিচারপ্রক্রিয়া আরও দ্রুত ও কার্যকর হবে।
সময়ের আলো/জোই