আগামী ছয় মাসে বিস্ময়কর গরমের আভাস দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। ব্যাপক তীব্রতার এল নিনোর কারণে বিশ্বজুড়ে ৪ লাখ ৫০ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হতে পারে।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাবের প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে এই আশঙ্কার কথা জানানো হয়েছে। মূলত জলবায়ু সংকটের কারণে ইতিমধ্যে বেড়ে যাওয়া তাপমাত্রার সঙ্গে যুক্ত হবে এই অতিরিক্ত মৃত্যুর সংখ্যা।
ইন্দোনেশিয়া থেকে ভারত, নাইজেরিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্র পর্যন্ত বিশ্বজুড়েই এর প্রভাব পড়বে। এল নিনোর সঙ্গে যুক্ত খরা, দাবানল ও বন্যার কারণে আরও অনেক মানুষের মৃত্যু হতে পারে। বর্তমানে বিশ্ব উষ্ণ করে তোলা এই এল নিনো গত সোমবার এই ঘটনার ইতিহাসে সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। যা প্রত্যাশিত সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর কয়েক মাস আগেই ঘটেছে। এল নিনো প্রাকৃতিক জলবায়ু ঘটনা হলেও বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে এর তীব্রতা আরও বাড়তে পারে।
গবেষকদের মতে, এই পূর্বাভাসের মাধ্যমে মানুষকে রক্ষা করার ব্যবস্থা নিলে প্রাণ বাঁচানো সম্ভব। এর মধ্যে থাকতে পারে উন্নত তাপ পূর্বাভাস ব্যবস্থা, মানুষের আশ্রয় নেওয়ার জন্য শীতাতপ কেন্দ্র নির্মাণ এবং সবচেয়ে গরম সময়ে চিকিৎসাকেন্দ্রে বাড়তি জনবল রাখা ও বাইরে কাজ করা শ্রমিকদের জন্য সুরক্ষা ব্যবস্থা নেওয়া।
শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাইমেট অধ্যাপক মাইকেল গ্রিনস্টোন বলেছেন, চার লাখ ৫১ হাজার মানুষের এই সংখ্যাটি এতটাই বড় যে এটা অনুভূতিশূন্য মনে হতে পারে। তবে এর মধ্যে বাবা-মা ও সন্তানরা রয়েছে। আবার দাদা-দাদি ও প্রতিবেশী কিংবা কর্মস্থলে যাওয়া মানুষ থাকতে পারে। এমনকি পরিবারের যত্ন নেওয়া মানুষ থাকতে পারে।
তবে এই মৃত্যুর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়ের জন্য। যেখানে শেষ হচ্ছে বর্তমান তাপমাত্রার পূর্বাভাস। ২০২৭ সালের জুন থেকে বা জুলাই পর্যন্ত তাপজনিত মৃত্যুর উচ্চহার অব্যাহত থাকতে পারে। আগামী ছয় মাসে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দেশ নাইজেরিয়া, ইন্দোনেশিয়া, সুদান, ভারত ও ব্রাজিল। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ২০টি দেশের তালিকায় রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রও। ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে আফ্রিকার সাহার অঞ্চল ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া।
গবেষকদের মতে, এই এল নিনো তাপমাত্রাকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে, যা জলবায়ু সংকট আগামী ২০ বছরে দেখাতে পারে। বিশ্বের ২৪ হাজার ৩৭৮টি অঞ্চলে তাপমাত্রা ও অতিরিক্ত তাপজনিত মৃত্যুর মধ্যে মাসভিত্তিক পর্যালোচনা পদ্ধতি ব্যবহার করে এই পূর্বাভাস তৈরি করা হয়েছে। ১৯৯৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত গড় মাসিক তাপজনিত মৃত্যুর সংখ্যাকে ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়েছে।
এল নিনোর প্রভাবে খাদ্য সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে। গত আগস্টে বিশ্বখাদ্য কর্মসূচি সতর্ক করেছিল, এর প্রভাবে প্রায় ৫ কোটি মানুষ তীব্র ক্ষুধার মুখে পড়তে পারে। একই সঙ্গে দামও বেড়ে যেতে পারে। ১৮৭৭-৭৮ সালে একটি বড় এল নিনোর কারণে খরা ও দুর্ভিক্ষে ৫ কোটি মানুষ মৃত্যুর মুখে পড়েছিল। সে সময় বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল ভারত, ব্রাজিল ও চীন।
এদিকে লন্ডনের ইস্পেরিয়াল কলেজের অধ্যাপক ফ্রেডেরিকে অটো সম্প্রতি গার্ডিয়ানকে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, বর্তমান এল নিনো জলবায়ু ব্যবস্থায় শক্তির এক বিশাল পুনর্বণ্টন। শুধু তাই নয়, এটি বিপজ্জনক। তাই বিশ্বের অনেক জায়গায় এমন সব তাপ চরম ব্যবস্থা দেখব। যা আগে কখনো দেখা যায়নি। স্বাস্থ্য থেকে শুরু করে খাদ্য নিরাপত্তা ও পানির সংকটের ওপর যার সবরকম প্রভাব পড়বে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে