সারা দেশে কিশোর গ্যাংয়ের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অতিষ্ঠ মানুষ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে নিয়মিত আটক হচ্ছে এই গ্যাংয়ের সদস্যরা। তবে এসব গ্যাংয়ের আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতারা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে বিভিন্ন সময়ে শেল্টারদাতাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হলেও তা কার্যকর হয়নি। সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, আইন পরিবর্তনের পাশাপাশি কিশোর গ্যাংয়ের মদদদাতাদের আইনের আওতায় আনতে না পারলে এ সমস্যা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।
সম্প্রতি কুমিল্লায় কয়েক কিশোরের হাতে ১৩ বছর বয়সি ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম নির্মমভাবে খুন হয়। এ ঘটনার পর আবারও আলোচনায় আসে কিশোর গ্যাং। গত বুধবার কুমিল্লার ১৮টি থানায় একযোগে কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযান চালায় পুলিশ। কয়েক ঘণ্টার অভিযানে ৬২৪ জনকে আটক করা হয়। পরে ৪৫১ কিশোরকে মুচলেকা নিয়ে অভিভাবকদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ১৭৩ জনকে আদালতে সোপর্দ করা হয়।
তবে আটক ব্যক্তিদের মধ্যে কোনো ‘বড় ভাই’ বা কিশোর গ্যাংয়ের শেল্টারদাতা রয়েছে কি না, সে বিষয়ে পুলিশ কিছু জানায়নি। কুমিল্লার পুলিশ সুপার (এসপি) মো. আনিসুজ্জামানকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ না করায় এ বিষয়ে তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
বদলেছে শেল্টারদাতা, বাড়ছে সদস্য : জানা যায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কিশোর গ্যাংয়ের শেল্টারদাতারা বদলালেও সদস্যরা বদলায়নি। বরং নতুন অনেক মুখ যুক্ত হয়েছে এসব গ্যাংয়ে।
কিশোর গ্যাংয়ের নেতাদের কেউ কেউ সরাসরি ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। কেউ রাজনীতিতে যুক্ত না থাকলেও রাজনীতিবিদদের কাছ থেকে আশ্রয়-প্রশ্রয় পান। তবে মাঠপর্যায়ের কিশোর অপরাধীদের সঙ্গে সরাসরি শীর্ষ সন্ত্রাসী বা নেতাদের যোগাযোগ থাকে না। কয়েক হাত ঘুরে এলাকার ‘বড় ভাইদের’ সরাসরি তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয় এসব কিশোর।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে পুলিশের এক প্রতিবেদনে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ২১ জন কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে কিশোর গ্যাংকে প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এর আগে পুলিশ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির পক্ষ থেকেও একাধিকবার কিশোর গ্যাংয়ের শেল্টারদাতাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়। তবে কার্যত কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
চার বছরে বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি : ২০২২ সালের শেষ দিকে পুলিশের এক প্রতিবেদনে সারা দেশে ১৭৩টি কিশোর গ্যাং থাকার তথ্য উল্লেখ করা হয়। এর মধ্যে রাজধানীতে ৬৬টি, চট্টগ্রাম শহরে ৫৭টি এবং মহানগরের বাইরে ঢাকা বিভাগে ২৪টি কিশোর গ্যাং ছিল।
চার বছরেরও কম সময়ে সারা দেশে কিশোর গ্যাংয়ের সংখ্যা বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে সারা দেশে কিশোর গ্যাংয়ের সংখ্যা ৩৮৬টি। এসব গ্যাংয়ের সক্রিয় সদস্য চার সহস্রাধিক।
এর মধ্যে রাজধানীতে রয়েছে দেড় শতাধিক কিশোর গ্যাং। সদস্য প্রায় দুই হাজার। রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকায় সবচেয়ে বেশি কিশোর গ্রুপ রয়েছে বলে জানা যায়। আলোচিত গ্রুপগুলোর মধ্যে রয়েছে লাড়া দে, লেভেল হাই, ফিল্ম ঝিরঝির, দেখে ল-চিনে ল, আই ডোন্ট কেয়ার (আইডিসি), দ্য কিং অব লও ঠেলা, মুরগি, ডাইল্লা, এলেক্স, ইমন, আনোয়ার ওরফে শুটার আনোয়ার, আকাশ, ডায়মন্ড, সাব্বির, শাওন, স্টার বন্ড, গ্রুপ টোয়েন্টি ফাইভ ও কোপাইয়া দে গ্রুপ।
ঢাকার বাইরে সক্রিয় রয়েছে ২২৭টি গ্যাং। এসব গ্যাংয়ের সদস্য প্রায় ২ হাজার ৫৫০ জন। ঢাকার পর চট্টগ্রাম মহানগরে সবচেয়ে বেশি কিশোর গ্যাং রয়েছে ৯৮টি। এ ছাড়া সিলেট মহানগরে ১৫টি, রাজশাহী ও গাজীপুর মহানগরে ১৩টি করে এবং খুলনা মহানগরে সাতটি গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। অন্যান্য মহানগর ও জেলায় রয়েছে আরও ৮১টি কিশোর গ্যাং।
তিন স্তরে গ্যাং : আদাবর থানার সাবেক ওসি এস এম জাকারিয়া তার পেশাগত অভিজ্ঞতার আলোকে বলেন, প্রায় সব কিশোর গ্যাংয়ে প্রধানত তিনটি ভাগ থাকে। এগুলো হলো ‘বড় ভাই’, ‘মেজো ভাই’ ও ‘ছোট ভাই’ গ্রুপ।
তিনি বলেন, ‘বড় ভাই’ গ্রুপের সদস্যদের বয়স ২৫ বছরের ঊর্ধ্বে। ‘মেজো ভাই’ গ্রুপে ১৮ থেকে ২৩ বছর বয়সিরা থাকে। আর ‘ছোট ভাই’ গ্রুপে থাকে ১৪ থেকে ১৭ বছর বয়সিরা।
তার মতে, বড় ভাইদের ছত্রছায়ায় মেজো ভাই গ্রুপের সদস্যরা চাঁদাবাজি, খুন, ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপাকোপি ও মারামারির মতো অপরাধে জড়ায়। ছোট ভাই গ্রুপের সদস্যরা চুরি ও ছিনতাইয়ের মতো অপরাধ বেশি করে।
মদদদাতাদেরও শাস্তি চান বিশেষজ্ঞরা : মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, শিশু-কিশোরদের বয়স বিবেচনায় আইনের সুযোগ নিয়ে সমাজের প্রভাবশালীরা তাদের সহজ টার্গেটে পরিণত করছেন।
কিশোর গ্যাং সংস্কৃতি বৃদ্ধির পেছনে দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও আইনের দুর্বলতাও দায়ী বলে মনে করেন তিনি।
ড. ওমর ফারুক বলেন, অল্প বয়সের কারণে কিশোরদের মধ্যে হিরোইজম কাজ করে। এলাকার তথাকথিত ‘বড় ভাইদের’ কাছ থেকে তারা নগদ অর্থসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা পায়। পরিবারের পক্ষে যা দেওয়া সম্ভব হয় না, এসব কিশোর সহজেই তা পেয়ে যায়।
তার মতে, অল্প কিছু দিয়েই শিশু-কিশোরদের আয়ত্তে আনা যায়। বিনিময়ে তাদের দিয়ে বড় ধরনের অপরাধ করানো সম্ভব। কিন্তু এসব কিশোর অপরাধীর পেছনের মদদদাতা বা শেল্টারদাতাদের কখনোই ধরা হয় না। বিশ্বের অনেক দেশেই শিশু-কিশোরদের অপরাধে প্রলুব্ধ করার শাস্তির বিধান রয়েছে।
তিনি বলেন, আইনের পরিবর্তন এখন সময়ের দাবি। বয়সের দোহাই দিয়ে আইনের ফাঁক গলে কেউ যাতে অপরাধ করে পার পেয়ে যেতে না পারে, রাষ্ট্রকে তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে মদদদাতাদেরও শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
এই অপরাধ বিশেষজ্ঞের মতে, এক দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশে কিশোর গ্যাংয়ের উত্থান হলেও রাষ্ট্র তাদের প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারেনি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ এলাকার সবাই জানে কারা এসব কিশোরকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছে। কিন্তু ভয়ে কেউ মুখ খুলতে পারছে না। এতে সমাজে ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। এ অবস্থা থেকে বের হতে না পারলে আগামী দিনে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে বলে আশঙ্কা করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, কিশোরদের বিভিন্নভাবে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহারের ক্ষেত্রে আইনের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। একজন কিশোর অপরাধীকে প্রচলিত জেলখানায় নেওয়া হয় না। শিশু আইন অনুযায়ী কিশোরদের অপরাধের শাস্তির ধরন ও মাত্রাও ভিন্ন। ফলে সংঘবদ্ধ অপরাধীরা এ সুযোগ সূক্ষ্মভাবে কাজে লাগাচ্ছে।
অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও সমাজবিজ্ঞানী এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, শুধু কিশোরদের গ্রেফতার করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। একই সঙ্গে তাদের পৃষ্ঠপোষকদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।
তিনি বলেন, কিশোরদের জন্য সুস্থ বিনোদনের ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি কাউন্সেলিং, শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, পরিবারভিত্তিক তদারকি ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা প্রয়োজন।
শিশু আইনে শাস্তির বিধান : বাংলাদেশে কিশোর গ্যাং নিয়ে আলাদা কোনো আইন নেই। তবে শিশু আইন রয়েছে। এ আইনে ১৮ বছরের কম বয়সি কেউ অপরাধ করলে তাকে সাধারণ কারাগারে পাঠানো যায় না। তাকে কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানোর বিধান রয়েছে। দেশে কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্র রয়েছে তিনটি। এর মধ্যে দুটি ছেলেদের এবং একটি মেয়েদের জন্য।
শিশু আইন অনুযায়ী, ৯ থেকে ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত কিশোরদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড কিশোর অপরাধের আওতায় পড়ে। অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে সর্বনিম্ন তিন বছর থেকে সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত আটকাদেশ বা বিশেষ কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের বিভিন্ন সময়ে আটক বা গ্রেফতার করা হলেও তাদের শেল্টারদাতাদের কেন আইনের আওতায় আনা হচ্ছে না, এ বিষয়ে জানতে বাংলাদেশ পুলিশের মুখপাত্র এআইজি (মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাত হোসেন এবং অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) খন্দকার রফিকুল ইসলামকে একাধিকবার ফোন করা হয়। তারা ফোন রিসিভ না করায় এ বিষয়ে পুলিশের বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/আতা