স্টুডিওতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও অভিনেতা সালমান মুক্তাদির। নাগরিকের নিরাপত্তা, মামলা দায়ের এবং প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেছেন, নিজের স্টুডিওর ক্ষয়ক্ষতির চেয়ে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাকে ‘ভদ্রলোক’ বলায় এবং বাকস্বাধীনতা নিয়ে কথা বলায় ধন্যবাদ জানান সালমান। তবে একই সঙ্গে তিনি বলেন, শিশু থেকে বৃদ্ধ—রাজনৈতিক পরিচয় যা-ই হোক, দেশের প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রধান দায়িত্ব।
৮ মিনিটের ভিডিওটির ক্যাপশনে সালমান মুক্তাদির লেখেন, ‘সালাহউদ্দিন আহমদ অ্যান্ড তারেক রহমান ম্যা বি বুঝে নাই, কী হইছে কালকে’।
ভিডিও বার্তায় সালমান বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের একটি ভিডিও দেখে তিনি প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন। তাকে ‘ভদ্রলোক’ বলায় ধন্যবাদ জানিয়ে সালমান বলেন, পুরো বাংলাদেশ তাকে অভদ্র হিসেবে চেনে। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যখন বাকস্বাধীনতা নিয়ে কথা বলেছেন, সেটি তাকে আত্মবিশ্বাস দিয়েছে এবং সে কারণেই তিনি প্রতিক্রিয়া জানাতে পারছেন।
সালমান বলেন, বাংলাদেশের প্রত্যেক নাগরিকের নিরাপত্তার দায়িত্ব স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হাতে। যেকোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত নাগরিকদের নিরাপত্তার দায়িত্বও তার। এজন্য সব ধরনের পক্ষপাতের ঊর্ধ্বে উঠে সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ‘সালমান মুক্তাদির মামলা করেননি’—এমন বক্তব্য দেওয়ায় প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, এটি শুধু হাস্যকর নয়, বরং এতে পুরো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সরকারকেই ছোট করা হয়েছে। তার দাবি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অধীনে প্রতিটি থানা, কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসন রয়েছে; অথচ মামলা হয়েছে কি না, সে তথ্যও তিনি জানেন না।
সালমান বলেন, ঘটনার দিন রাত ৪টা পর্যন্ত তিনি অনেক মানুষকে নিয়ে ক্যান্টনমেন্ট থানায় ছিলেন। এরপর ক্লান্ত হয়ে বাসায় ফেরেন। কিন্তু পরদিন দুপুর পর্যন্ত মামলা হয়নি। তার ভাষ্য, ঘটনা ভাইরাল হওয়ার পর এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য আসার পর মামলা হয়েছে।
তিনি প্রশ্ন রাখেন, তিনি রাতে থানায় গিয়ে মামলা করার উদ্যোগ নেওয়ার পরও কেন তা সঙ্গে সঙ্গে গ্রহণ করা হয়নি। তার মতে, ‘মামলা কেন হয়নি’—এই প্রশ্ন তাকে না করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরই প্রশাসনের কাছে করা উচিত ছিল এবং এর জবাব দেশবাসীকে দেওয়ার দায়িত্বও তার।
বিএনপি ও চাঁদাবাজির প্রসঙ্গ তুলে সালমান বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যেভাবে মুচকি হেসেছেন, তাতে তারও হাসি পেয়েছে। তার ভাষ্য, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যেমন পরিস্থিতি হেসে উড়িয়ে দিচ্ছেন, তিনিও অনেকটা অসহায় অবস্থায় মুচকি হাসছেন। কারণ দুজনই নাগরিক হিসেবে একই পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছেন।
সালমান বলেন, দেশের ক্ষমতাসীন সরকার বিএনপি এবং সেই সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। নির্বাচনের পর সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে যাবে— এমন কথা বলা হলেও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর।
তিনি আরও বলেন, তার স্টুডিওতে হামলার ঘটনায় তিনজনকে আটক করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে অস্ত্র ও হামলায় ব্যবহৃত বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। তাদের ফোনে থাকা ভিডিও এবং তাদের চেহারাও তিনি দেখেছেন। মানুষের কাছ থেকেও শুনেছেন, হামলাকারীরা বিএনপির নাম নিয়েছে।
তবে এসবের পরও বিএনপিকে নিয়ে কথা বলতে না পারার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন সালমান। তিনি বলেন, তাকে নিজের বক্তব্যের সংযম ও ভারসাম্য বজায় রাখতে হচ্ছে। এ অবস্থায় তিনি বুঝতে পারছেন না, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে সালাহউদ্দিন আহমদ দায়িত্ব পালন করছেন, নাকি বিএনপির জনসংযোগ ব্যবস্থাপনার সংকট সামলাচ্ছেন।
সালমান বলেন, এখানে জমি দখল, চাঁদাবাজি, বিএনপি, আওয়ামী লীগ কিংবা অন্য কারও লোক জড়িত কি না—এসব তার দেখার বিষয় নয়। তার কাছে মূল বিষয় ছিল নাগরিকের নিরাপত্তা।
তিনি বলেন, দেশের মানুষের প্রশ্ন ‘কে কী করেছে’ তা নয়; তারা তদন্তের জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে যায়নি, তারা চায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা নেওয়া হোক। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেই বলেছেন, কোনো একটি সামরিক বাহিনীর সদস্য এতে জড়িত ছিলেন। তাহলে তদন্তের পর কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে—সে প্রশ্ন তোলেন সালমান।
তার অভিযোগ, প্রেস ব্রিফিংয়ে এসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কোনো স্পষ্ট উত্তর বা কার্যকর পদক্ষেপের কথা জানাননি। বরং তার বক্তব্যের বিভিন্ন অংশ নিয়ে কথা বলেছেন। সালমান বলেন, তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে আগেই এ ঘটনার বাইরে রেখেছিলেন এবং তার কাছ থেকে কিছু চাননি; কিন্তু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেই বিষয়টির মধ্যে এসে নিজেকে ছোট করেছেন।
সালমান আরও বলেন, সরকারের বিরুদ্ধে তার ব্যক্তিগত কোনো অভিযোগ নেই। কিন্তু সত্যকে সত্য বলতেই হবে। তিনি যখন কোনো প্রশ্ন করা হয়নি, তখন চুপ ছিলেন এবং সরকারের কাছে তার কিছু চাওয়ারও নেই বলে জানিয়েছেন। এরপরও সরকার ও মন্ত্রীদের পক্ষ থেকে প্রেস ব্রিফিং করা হয়েছে।
ঘটনাটি তারেক রহমানের আসনে ঘটেছে উল্লেখ করে সালমান বলেন, এটি ‘১৭ আসন, তারেক রহমানের আসন’। তার দাবি, ওই আসনে বাংলাদেশের অন্যতম পরিচিত কনটেন্ট ক্রিয়েটর হিসেবে তার ওপর এমন ঘটনা ঘটেছে, যা এক রাতেই সারা দেশে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে। অথচ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ঘটনাটিকে ‘সামান্য ভাঙচুর’ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
সালমান প্রশ্ন করেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে ঘটনার প্রতি কোনো সহমর্মিতা আছে কি না এবং দেশের শিল্প, সংস্কৃতি ও স্বাধীনতার পরিস্থিতির সঙ্গে তিনি কতটা যুক্ত। একই সঙ্গে তিনি জানতে চান, মানুষের মৃত্যু ও ক্ষতির ঘটনায় দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা আদৌ মানুষের সঙ্গে নিজেদের সংযুক্ত মনে করেন কি না।
তিনি বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিরুদ্ধে তার ব্যক্তিগত কিছু নেই। কিন্তু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাকে প্রশ্ন করায় তিনি উত্তর দিয়েছেন এবং এবার তিনিও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে একটি প্রশ্ন রাখছেন—যে প্রশ্নের উত্তর কোনো কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে দেওয়া যায়, সেটিই তিনি দেখতে চান।
সালমান বলেন, সরকারের কাছে তিনি টাকা-পয়সা চান না, স্টুডিও বানিয়ে দেওয়ারও প্রয়োজন নেই। নিজের সামর্থ্যেই তিনি আবার স্টুডিও তৈরি করতে পারবেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তিনি তাদের সঙ্গে বসতে যাননি। কারণ, বাংলাদেশের মানুষের ভরসা নষ্ট করতে চান না এবং নিজেকে কোনো রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত করতে চান না।
তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। একেকটি সংবাদমাধ্যম একেকটি রাজনৈতিক দলের পক্ষে অবস্থান নিয়ে সংবাদ প্রচার করছে বলে তিনি দাবি করেন। চাইলে তিনি এসব মাধ্যমে গিয়ে নিজের বক্তব্য পরিষ্কার করতে পারতেন। এরই মধ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মীরা সেখানে গিয়ে নিজেদের মতো করে সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
সালমান বলেন, তিনি সরকারের কাছে নিজের জন্য কিছু চান না। তার মাধ্যমে যদি দেশের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়, সেটিই তার প্রত্যাশা। তিনি বলেন, নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলেও তার আপত্তি নেই; কিন্তু তিনি হামলার শিকার হয়ে চলে যাওয়ার পরও যদি প্রশাসন কিছু করতে না পারে, তাহলে এর জবাবদিহি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে করতে হবে।
তার ভাষ্য, সালমান মুক্তাদিরের মতো একজন পরিচিত ব্যক্তিকে নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যন্ত কথা বলছেন, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে ফোন আসছে, টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে বিষয়টি প্রচার হচ্ছে এবং পুরো বাংলাদেশে ঘটনাটি আলোচিত হচ্ছে। অথচ সেটিকে ‘সামান্য ভাঙচুর’ এবং ‘সালমান মামলা করেননি’— এভাবে উপস্থাপন করায় তিনি বিস্ময় প্রকাশ করেন।
সালমান বলেন, তিনি জানেন তদন্ত হবে এবং বিষয়টি তদন্তের আওতায় নেওয়া হবে। তবে এ ধরনের তদন্ত তিনি আগেও দেখেছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ও তিনি ধর্ষণ, হত্যা ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও তাদের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। এখন বিএনপি সরকার ক্ষমতায় থাকায় তাদের বিরুদ্ধেও কথা বলবেন, কারণ ক্ষমতায় থাকা সরকারের কাছ থেকেই তিনি নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি চান।
সিসিটিভি ফুটেজের প্রসঙ্গে সালমান বলেন, লুটপাটের ঘটনায় ক্যামেরা নষ্ট করা হলেও এর ফুটেজ সাধারণত সার্ভারে জমা থাকে। তার দাবি, হামলাকারীরা প্রতিটি ক্যামেরা ভাঙার পাশাপাশি সার্ভারও নিয়ে গেছে। তবে কত মানুষ ছিল, হামলার সময় কী ঘটেছিল—এসবের বিভিন্ন ভিডিও মোবাইল ফোন ও অন্যান্য মাধ্যমে রয়েছে বলেও জানান তিনি।
বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচারের অভিযোগ তুলে সালমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতি প্রশ্ন রাখেন, তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে তিনি তা মোকাবিলা করতে প্রস্তুত। তিনি বলেন, তাকে নিয়ে কোনো অভিযোগ থাকলে সরাসরি তার সঙ্গে কথা বলা উচিত; একতরফাভাবে অন্য জায়গা থেকে কথা বলার কারণ তিনি বুঝতে পারছেন না।
সবশেষে সালমান বলেন, পুরো ঘটনা থেকে তার ব্যক্তিগত কোনো চাওয়া নেই। তার মাধ্যমে যদি দেশের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব না হয়, সেটিও তার ব্যক্তিগত ক্ষতি হিসেবে মেনে নেবেন। তিনি নিজের উপার্জন দিয়ে আবার স্টুডিও তৈরি করতে পারবেন এবং কাজ চালিয়ে যাবেন।
সালমান বলেন, কাজ করাই তার স্বপ্ন ও সার্থকতা। ব্যক্তিগতভাবে যা হারিয়েছেন, তা আল্লাহর ইচ্ছা হিসেবে দেখছেন এবং বিশ্বাস করেন, তার জন্য আরও বড় কিছু অপেক্ষা করছে। তবে দেশের মানুষের কাছ থেকে যে নিরাপত্তা কেড়ে নেওয়া হচ্ছে, তার জবাব কী, সেটিই তিনি জানতে চান।
ভিডিওর শেষ দিকে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর আসনে এমন ঘটনা ঘটেছে এবং ঘটনাস্থল থেকে ক্যান্টনমেন্ট মাত্র পাঁচ মিনিটের হাঁটার পথ। তার মতে, এ কারণেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দিকে প্রশ্নের আঙুল উঠছে।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ