সার সংকটের চাপ সামলাতে না সামলাতেই কৃষকের ওপর নতুন বোঝা হয়ে এসেছে ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি। মাত্র পাঁচ মাসের ব্যবধানে লিটারপ্রতি ২০ টাকা দাম বাড়ায় জমি প্রস্তুত, সেচ, ফসল কাটা, মাড়াই ও পরিবহনসহ কৃষির প্রায় প্রতিটি ধাপেই বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়। এতে চলতি আমন মৌসুমে উৎপাদনে খরচ বেড়ে যাওয়ায় লোকসানের আশঙ্কার পাশাপাশি সামনে বোরো আবাদ নিয়েও দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষক।
অন্যদিকে ইউরিয়া সারের বড় অংশ আমদানিনির্ভর হওয়া, গ্যাস সংকটে কারখানা বন্ধ থাকা এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে আমদানি বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা কৃষি উৎপাদনকে আরও অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে বলে মনে করছেন কৃষি অর্থনীতিবিদরা।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে ডিজেলের চাহিদা প্রায় ৪৩ লাখ ৫০ হাজার টন। এর প্রায় ২৪ শতাংশ বা ১০ লাখ ৪৪ হাজার টন ব্যবহার হয় কৃষিকাজে। প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা করা হয়েছে। এর আগে গত ১৮ এপ্রিল ডিজেলের দাম ১০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১৫ টাকা করা হয়েছিল। আগের দামে কৃষকদের বছরে ডিজেল কেনা বাবদ ব্যয় হতো প্রায় ১২ হাজার ৬ কোটি টাকা। লিটারপ্রতি ২০ টাকা মূল্যবৃদ্ধির ফলে এ ব্যয় বেড়ে দাঁড়াতে পারে ১৪ হাজার ৯৪ কোটি টাকায়। অর্থাৎ শুধু ডিজেলের বাড়তি দামেই কৃষকদের বছরে অতিরিক্ত ব্যয় হবে ২ হাজার কোটি টাকারও বেশি।
দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ সেচ কার্যক্রম ডিজেলনির্ভর। কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাবে দেশে ৭৫৪টি গভীর নলকূপ, ১০ লাখ ৩৯ হাজার ৩৩৭টি অগভীর নলকূপ এবং এক লাখ ৮৪ হাজার ৩৮৪টি লো-লিফট পাম্প রয়েছে। এসবের বড় অংশই ডিজেলচালিত। এ ছাড়া প্রায় ১৯ লাখ কৃষি যন্ত্রপাতির ৭৫ শতাংশের বেশি ডিজেলনির্ভর। ফলে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব শুধু সেচেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, ফসল উৎপাদন থেকে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত পুরো ব্যবস্থায় এর প্রভাব পড়বে।
কৃষি অর্থনীতিবিদরা বলছেন, চলতি আমন মৌসুমে উৎপাদন খরচ বাড়লেও কৃষক সেই অনুপাতে ফসলের দাম পাবেন কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। এতে কৃষকের মুনাফা কমার পাশাপাশি খাদ্যপণ্যের বাজারেও মূল্যবৃদ্ধির চাপ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে দেশের মোট ধান উৎপাদনের বড় অংশ আসে বোরো মৌসুমে। নভেম্বরের শেষ দিকে শুরু হতে যাওয়া বোরো মৌসুম নিয়েও নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ সময় সেচ ও সার সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে চালের উৎপাদন এবং খাদ্যনিরাপত্তা— দুই ক্ষেত্রেই ঝুঁকি বাড়বে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, কৃষির এই সংকটের প্রভাব ইতিমধ্যে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পড়তে শুরু করেছে। দিনাজপুরের হিলিতে বৃষ্টিপাত না হওয়ায় আমন ধানের জমিতে সেচ দিতে হচ্ছে কৃষকদের। এতে ডিজেলচালিত শ্যালো মেশিনের ব্যবহার বেড়েছে। একই সময়ে জ্বালানির দাম বাড়ায় সেচের খরচও বেড়েছে। হিলির বোয়ালদাড় গ্রামের কৃষক শেরেগুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, কয়েক দিন ধরে বৃষ্টি না হওয়ায় জমির মাটি ফেটে যাচ্ছে। ধানের আবাদ রক্ষায় ডিজেলচালিত ইঞ্জিন দিয়ে সেচ দিতে হচ্ছে। এর মধ্যে তেলের দাম বাড়ায় সার ও কীটনাশকের বাড়তি খরচের সঙ্গে নতুন করে জ্বালানির ব্যয় যুক্ত হয়েছে। এত খরচ করে ধান চাষে লাভবান হওয়া কঠিন হয়ে পড়বে বলে মনে করছেন তিনি।
একই উপজেলার জালালপুর গ্রামের কৃষক সিদ্দিক হোসেন জানান, আগে এক বিঘা জমিতে ধান চাষে ১৫ থেকে ১৬ হাজার টাকা খরচ হলেও এখন তা বেড়ে প্রায় ২০ হাজার টাকা হয়েছে। বিঘাপ্রতি দুই থেকে তিন হাজার টাকা বাড়তি ব্যয় হচ্ছে। এত টাকা খরচ করে উৎপাদিত ধানের ন্যায্যমূল্য পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন তিনি। ছাতনি গ্রামের কৃষক নাসির হোসেনেরও একই উদ্বেগ। তিনি বলেন, জ্বালানির বাড়তি খরচ বহন করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এতে পরবর্তী সময়ে আবাদ অব্যাহত রাখাও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
নওগাঁর কৃষকরাও একই পরিস্থিতির মুখোমুখি। জেলার প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষের জীবন-জীবিকা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। স্থানীয় কৃষকদের হিসাবে ডিজেলের দাম বাড়ায় সেচ বাবদ বিঘাপ্রতি ৮০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত খরচ হতে পারে। জমি প্রস্তুত থেকে ফসল ঘরে তোলা পর্যন্ত সব ব্যয় হিসাব করলে বিঘাপ্রতি অতিরিক্ত ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত খরচ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফসলভেদে উৎপাদন ব্যয় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার কাকুরাইল গ্রামের কৃষক সাজ্জাদুর রহমান বলেন, আমন ধান কাটতে ও মাড়াই করতে যন্ত্রের ব্যবহার করতে হয়। আগে যেখানে তিন থেকে চারশ টাকা খরচ হতো, এখন সেখানে চার থেকে পাঁচশ টাকা লাগবে। সামনে বোরো মৌসুমে পানির সংকট দেখা দিলে ডিজেলচালিত পাম্প দিয়ে সেচ দিতে হবে। এতে উৎপাদন খরচ আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি। দেশের অন্যান্য জেলার কৃষকদেরও একই ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে।
এদিকে জ্বালানির পাশাপাশি সারের সরবরাহ নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে কৃষকদের মধ্যে। বিশেষ করে ইউরিয়া সারের উৎপাদন ও আমদানিতে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় আগামী মৌসুমগুলোর চাহিদা পূরণ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কৃষি অর্থনীতিবিদদের হিসাবে দেশে বছরে প্রায় ২৭ লাখ টন ইউরিয়া সারের প্রয়োজন হয়। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টন দেশে উৎপাদিত হয়। বাকি সারের বড় অংশ আমদানি করতে হয়। সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে ইউরিয়া আমদানি করা হয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক সংঘাত ও সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্নের কারণে আমদানিতে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। সারের সংকটের সঙ্গে ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি যুক্ত হওয়ায় কৃষকের উৎপাদন সিদ্ধান্তেও প্রভাব পড়তে পারে। কারণ, সার, বীজ, কীটনাশক, শ্রমিকের মজুরি ও সেচের ব্যয় মেটানোর পর ফসল বিক্রি করে লাভের নিশ্চয়তা না থাকলে অনেক কৃষক আবাদ কমিয়ে দিতে পারেন। বিশেষ করে বোরো ধান সম্পূর্ণ সেচনির্ভর হওয়ায় এ মৌসুমে ডিজেল ও সারের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম মনে করেন ডিজেলের দাম বাড়ায় কৃষিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে যাওয়ায় কঠিন সংকটে পড়বেন কৃষকরা। খাদ্যে মূল্যস্ফীতি বাড়বে। এ ছাড়া সময়মতো সার সরবরাহ করা না গেলে কৃষকের উৎপাদন পরিকল্পনা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি বলেন, কৃষকের বাড়তি উৎপাদন খরচ সমন্বয়ে নগদ সহায়তা, প্রণোদনা ও ভর্তুকি দেওয়া জরুরি।
সাবেক কৃষি সচিব আনোয়ার ফারুক বলেন, জ্বালানির দাম বাড়ার প্রভাব শুধু কৃষিতে নয়, অর্থনীতির সব খাতেই পড়বে। এতে কৃষকের উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। মাঠের ফসল ঘরে তোলা, মাড়াই ও পরিবহন ব্যয় বাড়লে চালের দামেও তার প্রভাব পড়বে। কৃষকের বাড়তি ব্যয় ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার মাধ্যমে সমন্বয় করা না গেলে পরবর্তী মৌসুমে উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে। কারণ, কৃষক ন্যায্যমূল্য না পেলে আগামীবার উৎপাদন করবেন না— এটাই স্বাভাবিক। এতে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে।
তবে ডিজেলের দাম বাড়ার প্রভাব মোকাবিলায় সরকারের পক্ষ থেকে সহায়তার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের মহাপরিচালক আব্দুর রহিম বলেন, জ্বালানির দাম বাড়ার প্রভাব কৃষকদের ওপর পড়ছে। এ ক্ষতি কমাতে সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন প্রণোদনা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। পাশাপাশি ডিজেলনির্ভর সেচব্যবস্থার পরিবর্তে সৌরবিদ্যুৎচালিত পাম্প ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ জানিয়েছেন, ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধিতে কৃষিতে কিছুটা প্রভাব পড়বে। তবে এর প্রকৃত প্রভাব পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কৃষকদের বিনা মূল্যে বীজ ও কীটনাশকসহ বিভিন্ন কৃষি উপকরণ দেওয়ার কার্যক্রমও চলমান রয়েছে। কৃষির উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা এবং কৃষকদের সহায়তায় সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/টিকে