রাজনৈতিক নির্দেশনায় দমনপীড়নের ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা পুরোপুুরি রূপে স্পষ্ট হয়েছে গণঅভ্যুত্থানে। সেসব অভিযোগে মামলা, বরখাস্ত, বাধ্যতামূলক অবসর ও সংযুক্তিসহ বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে বাহিনীটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বড় একটি অংশকে। তবে এখনও হদিস নেই অর্ধশতাধিক কর্মকর্তার। যাদের কেউ কেউ পাড়ি জমিয়েছেন বিদেশের মাটিতে কেউবা আন্ডারওয়ার্ল্ড ও ক্ষমতাধরদের শেল্টারে দেশের ভেতরেই পলাতক রয়েছেন এখনও। তবে তারা কোথায় আছেন তার স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা নেই বাহিনীটির কাছে।
এদিকে ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসর পুলিশ কর্মকর্তার অনেকেই বর্তমানে নানা মাধ্যমে তদবির করে নিজেদের সুরক্ষিত রেখেছেন। জুলাই আন্দোলন দমনে সম্পৃক্ত ৩৫ শতাংশের বেশি কর্মকর্তা এখনও দায়িত্বে বহাল রয়েছেন বলে সূত্রে জানা গেছে, যা উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন অনেকে। এ ছাড়া সেসব কর্মকর্তা ভেতরকার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বাইরে পাচার করার মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ নৈরাজ্য সৃষ্টি করা থেকে শুরু করে নানা রকম অস্থিরতা তৈরিতে ভূমিকা রাখছেন বলে জানিয়েছে সূত্র। বর্তমান বিএনপি সরকারের সময়েও রাজনৈতিকভাবে পরিচিত বা অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে পুলিশের দ্বিধা, সময়ক্ষেপণ কিংবা ঊর্ধ্বতনদের নির্দেশের অপেক্ষা করার সংস্কৃতির ছাপ দেখা যাচ্ছে বলে মনে করছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা। যা বাহিনীটিকে আদৌ নিরপেক্ষ ও জনমুখী করে তুলতে পারা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০২৪-এর ১৬ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান চলাকালে সারা দেশে হত্যা ও হত্যাচেষ্টাসহ বিভিন্ন ঘটনায় পুলিশের বিরুদ্ধে ৭৬১টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় এক হাজার ১৬৮ পুলিশ সদস্য আসামি হিসেবে আছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন— সাত সাবেক আইজিপি, ৪১ সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি, ১২ সাবেক উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি), ১১ বর্তমান ডিআইজি, দুই সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি, ৪৯ অতিরিক্ত ডিআইজি, তিন সাবেক পুলিশ সুপার (এসপি), ৬৬ বর্তমান এসপি, ৬৫ অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, ৩৫ সহকারী পুলিশ সুপার, ১৮৭ পরিদর্শক, ৩৪০ উপ-পরিদর্শক (এসআই), ১১৭ এএসআই ও ২২৪ জন কনস্টেবল। বাকিরা টিএসআই, এটিএসআই, নায়েক ও পদ উল্লেখ না থাকা পুলিশ সদস্য।
পুলিশ সদর দফতর সূত্রে জানা যায়, শুধু বিসিএস পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যে বর্তমানে অভ্যুত্থানের দমনপীড়নের ঘটনায় ফৌজদারি মামলায় রয়েছেন ২৪৪ জন, বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে ১৪১ জনকে, বিভিন্ন জায়গায় সংযুক্ত করা হয় ১২২ জন, কারাগারে রয়েছেন ২৭ কর্মকর্তা, বরখাস্তের জন্য প্রাথমিকভাবে চূড়ান্ত হওয়া তালিকায় রয়েছেন ৫৭ জন। তবে অভ্যুত্থানের পর বর্তমানে কোনো খোঁজ নেই এমন পুলিশ কর্মকর্তার সংখ্যা রয়েছে ৫২ জন। তথ্যটি কয়েক মাস আগের হালনাগাদের হওয়ায় বর্তমানে এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলেও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে নিখোঁজ থাকা কর্মকর্তাদের বিষয়ে কোনো তথ্য দিতে পারেনি সদর দফতর। খোঁজ না থাকা কর্মকর্তাদের মধ্যে মনিরুল ইসলাম, হারুন অর রশীদ, বিপ্লব কুমার ও হাবিবুর রহমানসহ অনেকে বিদেশে আছেন বলেও জানা গেছে। সেই সঙ্গে তাদের কেউ কেউ গ্রেফতার এড়াতে নানা শেল্টারে দেশেই পলাতক রয়েছেন। পুলিশ সদর দফতরের মিডিয়া বিভাগের এআইজি এএইচএম শাহাদাত হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, দমনপীড়নে জড়িত পুলিশ কর্মকর্তাদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। তবে যাদের এখনও খোঁজ নেই তাদের বিষয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। হয়তো গ্রেফতার এড়াতেই তারা চাকরির বাইরে রয়েছেন। তবে এসব পুলিশ কর্মকর্তারা যেন কোনোভাবে দেশের বাইরে যেতে না পারে সে বিষয়ে সদর দফতর থেকে কোনো কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, মূলত যাদের বিষয়ে মামলা রয়েছে বা ওয়ারেন্ট আছে তারা দেশের বাইরে যেতে চাইলেও সুযোগ নেই, আটকিয়ে দেওয়া হবে।
এ ছাড়া পলাতক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া শেষে বরখাস্ত করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (শৃঙ্খলা) কাজী সাইফুল ইসলাম। তিনি গণমাধ্যমকে জানান, প্রাথমিকভাবে ৫৭ জনের তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে তাদের বরখাস্ত করা হবে। এদিকে ছাত্র-জনতার ওপর হামলা ও হত্যার ঘটনায় পুলিশের বিরুদ্ধে করা মামলাগুলো স্পর্শকাতর হওয়ায় পুলিশের বেশ কয়েকটি ইউনিট গুরুত্বসহকারে তা তদন্ত করছে বলে জানা গেছে। মামলাগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তদন্ত করে শেষ করা হবে বলে জানিয়েছেন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
পুলিশ দলীয়করণ ও জনগণকে কোণঠাসার বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও সমাজ-অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক সময়ের আলোকে বলেন, রাজনৈতিক সরকারগুলো অধিকাংশ সময়ই পুলিশকে নিজেদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য এবং অগণতান্ত্রিক ইচ্ছা পূরণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। এভাবে পুরো বাহিনীকে বিতর্কিত করে ফেলায় সাধারণ মানুষের মধ্যে পুলিশের প্রতি অনাস্থা তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে যারা সরকারে আসেন, তাদের জন্য এই অনাস্থা দূর করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
এই অপরাধ বিশেষজ্ঞ বলেন, অতীতে ক্ষমতার অপব্যবহাকারী পুলিশ কর্মকর্তাদের দ্রুত বিচার সম্পন্ন করতে হবে, দেশের মধ্যে আত্মগোপনে থাকা ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনাসহ দেশের বাইরে অবস্থানকারীদের ইন্টারপোলের মাধ্যমে ফিরিয়ে আনার সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে প্রয়োজনীয় আইনি কাঠামো গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
ড. তৌহিদুল হক জানান, ১৮৬১ সালের পুলিশ আইন এবং এর আওতায় বিদ্যমান নির্দেশনা ও বাস্তবায়ন কাঠামোতে পরিবর্তন আনা জরুরি। এই আইনি কাঠামোর মাধ্যমে পুলিশকে জনস্বার্থ ও জননিরাপত্তার প্রশ্নে জবাবদিহির আওতায় আনা কঠিন। বাংলাদেশের বাস্তবতায় শুধু নীতি, নৈতিকতা, আদর্শ কিংবা পেশাগত মর্যাদার ওপর নির্ভর করে পুলিশের কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন নিশ্চিত করা কঠিন; বরং আইনি কাঠামোর ভিত্তিতে পুলিশকে যথাযথ পদ্ধতি ও কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত করতে পারলেই বাহিনীটিকে বিতর্কের বাইরে রাখা সম্ভব হবে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে