বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে সর্বাত্মক অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (সেপা) আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরের প্রক্রিয়া এগিয়ে চলছে। ২০২৪ সালের আগস্টে চুক্তিটি সম্পন্ন হওয়ার পর বর্তমানে এর অভ্যন্তরীণ যাচাই-বাছাই চলছে। প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষ হলে কোরিয়ার রাষ্ট্রপতির আসন্ন বাংলাদেশ সফরকালে চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হতে পারে।
সিউলে সফররত বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বৃহস্পতিবার রিপাবলিক অব কোরিয়ার (আরওকে) বাণিজ্য, শিল্প ও সম্পদ মন্ত্রণালয়ের বাণিজ্য আলোচনা-সংক্রান্ত উপমন্ত্রী হেজিন কোয়ানের সঙ্গে বৈঠকে এ তথ্য জানান।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হুমায়ুন কবির বৃহস্পতিবার সিউলে হেজিন কোয়ান এবং কোরিয়া ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (কোইকা) ভাইস প্রেসিডেন্ট দ ইয়ং-আ-র নেতৃত্বে সংস্থাটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন। বৈঠকগুলোতে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, উন্নয়ন সহযোগিতা ও প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার সহযোগিতা আরও জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
উপমন্ত্রী কোয়ানের সঙ্গে বৈঠকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কোরিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের সহযোগিতা আরও বাড়ানোর আগ্রহ প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তর ও শিল্প উন্নয়নে কোরিয়ার ভূমিকার প্রশংসা করেন তিনি।
হুমায়ুন কবির ২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশ-কোরিয়া সর্বাত্মক অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (সেপা) সফলভাবে সম্পন্ন হওয়াকে স্বাগত জানান। তিনি আশা প্রকাশ করেন, চুক্তিটি কোরিয়ান ও আঞ্চলিক সরবরাহ শৃঙ্খলে (সাপ্লাই চেইন) বাংলাদেশের আরও গভীরভাবে যুক্ত হওয়ার পথ সুগম করবে। বিশেষ করে বাংলাদেশ যখন স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের প্রক্রিয়ায় রয়েছে, তখন এ চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রয়োজনীয় অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর রিপাবলিক অব কোরিয়ার রাষ্ট্রপতির প্রস্তাবিত বাংলাদেশ সফরকালে চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হবে বলে তিনি আশা করছেন।
বৈঠকে ক্রমবর্ধমান দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের বিষয়টিও তুলে ধরেন হুমায়ুন কবির। তিনি কোরিয়ায় বাংলাদেশি পণ্য ও সেবার আমদানি বাড়াতে এবং দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা ক্রমান্বয়ে কমিয়ে আনতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। পাশাপাশি বাংলাদেশের কৃষি, মৎস্য ও খাদ্যপণ্যের জন্য খাদ্য-নিরাপত্তা পরিদর্শন এবং কোয়ারেন্টাইন প্রক্রিয়া সহজ করার অনুরোধ করেন।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ‘আঞ্চলিক ব্যাপক অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বে’ বাংলাদেশের যোগদানের ক্ষেত্রে কোরিয়ার সমর্থন কামনা করেন। একই সঙ্গে আরও বেশি কোরীয় বিনিয়োগের আহ্বান জানান তিনি। যৌথ বিনিয়োগ প্রস্তাবনা ও সরকারি সমন্বয়ের মাধ্যমে বিনিয়োগের সুযোগ অনুসন্ধানে কোরিয়ার বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে উৎসাহিত করার কথাও বলেন তিনি।
জবাবে উপমন্ত্রী কোয়ান বাংলাদেশ-কোরিয়া অর্থনৈতিক সম্পর্কের অগ্রগতিকে স্বাগত জানান। তিনি সিইপিএ কাঠামোর মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও শিল্প সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণে কোরিয়ার আগ্রহের কথা জানান।
কোইকার সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান
কোইকার ভাইস প্রেসিডেন্ট দ ইয়ং-আর সঙ্গে পৃথক বৈঠকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী অনুদান সহায়তা, সক্ষমতা বৃদ্ধি, কারিগরি সহযোগিতা ও জ্ঞান বিনিময়ের মাধ্যমে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে কোইকার দীর্ঘদিনের অবদানের প্রশংসা করেন।
তিনি ৩৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের ‘সাইমাউল প্লাস দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি’র জন্য কোইকাকে ধন্যবাদ জানান। একই সঙ্গে পানি নিরাপত্তা ও জলবায়ু সহনশীলতা, দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থানমুখী কারিগরি শিক্ষা এবং ডিজিটাল স্বাস্থ্য খাতে আরও সহায়তা কামনা করেন।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ডিজিটাল রূপান্তর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ডিজিটাল জনসেবাসহ বড় আকারের, সমন্বিত ও রূপান্তরমূলক কর্মসূচির দিকে কোইকা-বাংলাদেশ সহযোগিতার পরবর্তী ধাপ এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশের আগ্রহের কথা জানান।
এ ছাড়া এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের পাশাপাশি ঢাকার এমআরটি প্রকল্পগুলোতে অর্থায়নের জন্য কোরীয় পক্ষের দ্রুত সম্মতির অনুরোধ করেন তিনি।
বৈঠকগুলোতে পারস্পরিক সুবিধা ও অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শিল্প সহযোগিতা, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও উন্নয়ন সহযোগিতাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার সার্বিক অংশীদারিত্ব আরও গভীর করার যৌথ অঙ্গীকারের বিষয়টি উঠে আসে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/আতা