রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রতিক নাশকতার পর সম্ভাব্য হামলার ধরন ও লক্ষ্যস্থল নিয়ে তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এর পরিপ্রেক্ষিতে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট, প্রবেশমুখ ও স্পর্শকাতর এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের বিভাগ ও জেলাগুলোতেও বাড়ানো হয়েছে নিরাপত্তাব্যবস্থা।
নাশকতা প্রতিরোধে রাজধানীতে একযোগে কাজ করছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি), ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি), গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি)। পূর্ব ও পশ্চিম ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় বসানো হয়েছে অতিরিক্ত চেকপোস্ট। কোনো কোনো এলাকায় ড্রোনের মাধ্যমেও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্রের দাবি, সাম্প্রতিক সময়ে বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় ব্যবহৃত গণপরিবহণের বড় একটি অংশ কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ-সমর্থিত বা নেতাকর্মীদের মালিকানাধীন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ভাষ্য, নিজেদের মালিকানাধীন বাসে আগুন দিয়ে নাশকতার পাশাপাশি জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি, সরকারের ওপর দায় চাপানো, সহানুভূতি আদায় এবং বিমার অর্থ দাবি করার চেষ্টা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে পরিবহণ খাতে কৃত্রিম আতঙ্ক তৈরি করে রাজপথ অচল করার পরিকল্পনার কথাও বলছে পুলিশ। তা ছাড়া রাজধানীর ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনায় ‘হিট অ্যান্ড রান’ কৌশল অবলম্বন করে পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলে নাশকতা সৃষ্টির মিশন নিয়ে কাজ করছে নিষিদ্ধ দলটি।
গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে রাজধানীর পূর্বাঞ্চলের ডেমরা, যাত্রাবাড়ী, সবুজবাগ, বাসাবো ও খিলগাঁও এবং পশ্চিমাঞ্চলের গাবতলী, মোহাম্মদপুর, বসিলা ও মিরপুরের শেষ অংশকে বিশেষ নজরদারিতে রাখা হয়েছে। এসব এলাকার প্রবেশপথ ও গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে অতিরিক্ত চেকপোস্ট বসানো হয়েছে।
সূত্র আরও জানায়, কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলের নেতাকর্মীরা প্রথমে ককটেল নিক্ষেপের মাধ্যমে তৎপরতা শুরু করে পরে বাসে আগুন দিচ্ছে। মেট্রোরেলসহ দেশের বিভিন্ন কেপিআইভুক্ত (কী পারফরম্যান্স ইন্ডিকেটর) প্রতিষ্ঠানও তাদের সম্ভাব্য লক্ষ্য হতে পারে—এমন তথ্যের ভিত্তিতে এসব স্থাপনায় নিরাপত্তা জোরদারের নির্দেশ দিয়েছে পুলিশ সদর দফতর।
ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ বলেন, পুলিশ সদর দফতরের নির্দেশনার পর রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও কেপিআই এলাকায় নিয়মিত নিরাপত্তার পাশাপাশি বিশেষ টিম মোতায়েন করা হয়েছে। এসব স্থাপনার তালিকা তৈরি করে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
নাশকতায় একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠীর অর্থায়ন ও ইন্ধনের অভিযোগ তুলে ডিএমপি কমিশনার বলেন, ওই গোষ্ঠীর শীর্ষ নেতারা দেশের বাইরে অবস্থান করছেন এবং সেখান থেকে দেশের ভেতরে থাকা কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ ও অর্থ পাঠাচ্ছেন। তাদের নির্দেশেই অস্থিতিশীলতা ও অরাজকতা সৃষ্টির চেষ্টা চলছে বলে জানান তিনি। অর্থের জোগানদাতা ও মূল নির্দেশদাতাদের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তথ্য পেয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে বলেও জানান তিনি।
এদিকে রেলপথ ও স্টেশনগুলোর নিরাপত্তাও বাড়ানো হয়েছে। রেলওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত আইজি (ইনচার্জ) ব্যারিস্টার জিল্লুর রহমান বলেন, রেলস্টেশনে আগুন ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনার পর সারা দেশে রেলপথ ও স্টেশনে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
তিনি জানান, গত ১৯ সেপ্টেম্বর রাতে কমলাপুর রেলস্টেশনে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে সাখাওয়াত হোসেন রায়হান ও সাইমুন নামে দুজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। রায়হান কমলাপুর রেলস্টেশনের এমওডি শাখায় ইলেকট্রিশিয়ান হিসেবে কর্মরত ছিলেন এবং নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের শাহজাহানপুর থানা শাখার সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক। সাইমুন শাহজাহানপুর থানা এলাকার যুবলীগের সক্রিয় কর্মী বলে জানান তিনি।
গ্রেফতার দুজনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ঘটনায় জড়িত আরও কয়েকজনের নাম-পরিচয় পাওয়া গেছে জানিয়ে ব্যারিস্টার জিল্লুর রহমান বলেন, তাদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। ট্রেনে আগুন দেওয়ার ঘটনায় একটি মামলা হয়েছে এবং প্রযুক্তির সহায়তায় জড়িতদের আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।
গোয়েন্দা সূত্রের ভাষ্য, নাশকতাকারীদের মূল লক্ষ্য রাজধানীর পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্ত। এসব এলাকা রাজধানীর প্রবেশমুখ ও সীমান্তঘেঁষা হওয়ায় হামলার পর দ্রুত ঢাকার বাইরে পালিয়ে যাওয়া কিংবা শহরের ভেতরের অলিগলিতে আত্মগোপন করা তুলনামূলক সহজ। কেন্দ্রীয় এলাকার তুলনায় এসব প্রান্তিক অঞ্চলে সিসিটিভি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহল কিছুটা কম থাকার সুযোগও নেওয়া হচ্ছে বলে সূত্রের দাবি।
ডিবিপ্রধান শফিকুল ইসলাম বলেন, রাজধানীতে গণপরিবহণে আগুন, ককটেল নিক্ষেপ ও অন্যান্য নাশকতার মূল উদ্দেশ্য জনমনে আতঙ্ক তৈরি করা এবং সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ—এমন একটি চিত্র তুলে ধরা। পূর্ব ও পশ্চিম ঢাকার প্রান্তিক এলাকাগুলো অপরাধীদের দ্রুত পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেয় বলেও জানান তিনি।
তার ভাষ্য, এসব এলাকায় ঘনবসতি এবং নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের বসবাস বেশি হওয়ায় অপরাধীরা গোপন আস্তানা হিসেবে এলাকাগুলো ব্যবহারের সুযোগ পেতে পারে। একইভাবে মিরপুর ও পল্লবীর অতিরিক্ত ভিড়ের গণপরিবহণকে কাজে লাগিয়ে নাশকতা চালিয়ে দ্রুত সরে যাওয়ার সম্ভাবনাও বিবেচনায় নিয়ে নজরদারি করা হচ্ছে।
সময়ের আলো/জেডি