শারমিনের হাত ধরে স্কুলে ফিরছেন শিক্ষায় পিছিয়ে পড়া মায়েরা

বন্যা নাসরিন

ফিচার

পেশায় শিক্ষক শারমিন রহমান সুইট। স্কুলে পড়াতে গিয়ে তিনি অনুভব করেন, শিশুদের সুশিক্ষিত করে গড়ে তুলতে হলে তাদের মায়েদেরও শিক্ষিত

2026-10-05T14:36:32+00:00
2026-10-05T14:53:24+00:00
 
  সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬,
২০ আশ্বিন ১৪৩৩
সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬
ফিচার
শারমিনের হাত ধরে স্কুলে ফিরছেন শিক্ষায় পিছিয়ে পড়া মায়েরা
বন্যা নাসরিন
প্রকাশ: সোমবার, ৫ অক্টোবর, ২০২৬, ২:৩৬ পিএম  আপডেট: ০৫.১০.২০২৬ ২:৫৩ পিএম
শারমিনের হাত ধরে স্কুলে ফিরছেন শিক্ষায় পিছিয়ে পড়া মায়েরা। গ্রাফিক : সময়ের আলো
পেশায় শিক্ষক শারমিন রহমান সুইট। স্কুলে পড়াতে গিয়ে তিনি অনুভব করেন, শিশুদের সুশিক্ষিত করে গড়ে তুলতে হলে তাদের মায়েদেরও শিক্ষিত ও সচেতন হওয়া জরুরি। অন্তত প্রাথমিক শিক্ষাটুকু মায়েদের জানা প্রয়োজন। সেই ভাবনা থেকেই বাড়ি বাড়ি গিয়ে মায়েদের পড়ানো শুরু করেন তিনি। তার নিরলস প্রচেষ্টায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের কাছে প্রিয় শিক্ষক হয়ে ওঠেন শারমিন। পরাপর ৩ বছর উপজেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। পেয়েছেন শ্রেষ্ঠ জয়িতা পুরস্কারও। বিভিন্ন উদ্ভাবনী কাজের জন্য অর্জন করেছেন সেরা উদ্ভাবক পুরস্কার।

শারমিন রহমান সুইট। ছবি : সৌজন্য

শারমিন রহমান সুইট। ছবি : সৌজন্য


শারমিন রহমানের মা জেসমিন আক্তারও একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। মায়ের আদর্শ থেকেই শিক্ষকতার প্রতি তার ভালোবাসা তৈরি হয়। চার ভাইবোনের মধ্যে শারমিন সবার বড়। ২০০৪ সালে বাবাকে হারিয়ে দিশাহারা হয়ে পড়ে পুরো পরিবার। এরপর শুরু হয় টিকে থাকার সংগ্রাম। সেই সংগ্রাম সামলে উঠতে না উঠতেই বিয়ের পর তাকে আলাদা জীবন বেছে নিতে হয়। তবে, মনের জোর ও অদম্য ইচ্ছাশক্তির কাছে একে একে হার মানে প্রতিকূলতা। সমালোচনা ও নিন্দাও তাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি; বরং আরও শক্ত করেছে।

শিক্ষার্থীদের পছন্দের শিক্ষক শারমিন। ছবি : সৌজন্য

শিক্ষার্থীদের পছন্দের শিক্ষক শারমিন। ছবি : সৌজন্য


২০১৩ সালে ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা উপজেলার ঘারুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন শারমিন। চাকরির শুরু থেকেই শিশুদের নিজের সন্তানের মতো আগলে রাখার চেষ্টা করেছেন। গ্রামের শিশুদের স্বপ্ন দেখাতে ভালোবাসেন তিনি। পড়ালেখার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সৃজনশীল কাজে আগ্রহী করে তোলেন। তার উৎসাহে গ্রামের শিক্ষার্থীরা কবিতা আবৃত্তি, বিতর্ক প্রতিযোগিতা, ভাষা ক্লাব, নাচ ও ছবি আঁকার মতো বিভিন্ন কার্যক্রমে দক্ষতার পরিচয় দিতে শুরু করে। দরিদ্র শিক্ষার্থীদের প্রতি বছর ইউনিফর্ম, খাতা ও কলম উপহার দেন তিনি।

দরিদ্র শিশুদের সকল দায়িত্ব বহন করেন শারমিন। ছবি : সৌজন্য

দরিদ্র শিশুদের সকল দায়িত্ব বহন করেন শারমিন। ছবি : সৌজন্য


শিশুশ্রম বন্ধ করতে বিভিন্ন কাজ থেকে কয়েকজন শিক্ষার্থীকে ছাড়িয়ে এনে তাদের পড়ালেখার সব দায়িত্বও তুলে নিয়েছেন নিজের কাঁধে। যেমন- মহাসিন নামে এক শিশুকে পড়ানো বাদ দিয়ে কাজে দেওয়া হয়েছিল। তিনি মহাসিনের পূর্ণ দায়িত্ব নিয়ে তাকে স্কুলে ফিরিয়ে এনেছিলেন। আবার, তরিকুল নামে এক শিক্ষার্থী চোখে ঠিকমতো দেখতে পেত না। তিনি উদ্যোগ নিয়ে জেলা প্রশাসকের কাছ থেকে তরিকুলকে আর্থিক সাহায্য এনে দিয়েছিলেন, নিজের বই বিক্রির টাকা দিয়েছিলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করেও তরিকুলের জন্য অর্থ সংগ্রহ করে তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছিলেন। এছাড়া, গ্রামের শিক্ষার্থীদের জুম ও গুগল মিটের মাধ্যমে দেশের বাইরের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগও করে দিয়েছেন শারমিন রহমান।

সমাপনী ও বৃত্তি পরীক্ষার সময় চার-পাঁচ মাস আগে থেকেই শিক্ষার্থীদের রাতে নিজের বাড়িতে রেখে পড়ালেখা করান শারমিন। ছবি : সৌজন্য

সমাপনী ও বৃত্তি পরীক্ষার সময় চার-পাঁচ মাস আগে থেকেই শিক্ষার্থীদের রাতে নিজের বাড়িতে রেখে পড়ালেখা করান শারমিন। ছবি : সৌজন্য


শুধু শ্রেণিকক্ষেই সীমাবদ্ধ থাকেননি তিনি। অনুপস্থিত শিক্ষার্থীদের খোঁজ নিতে ঘুরে বেড়ান বাড়ি বাড়ি। নিয়মিত হোম ভিজিট, উঠান বৈঠক ও মা সমাবেশ করতে থাকেন। প্রতিটি শিশুর পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থা, পরিবেশ ও সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে তিনি খোঁজ রাখেন। সমাপনী ও বৃত্তি পরীক্ষার সময় চার-পাঁচ মাস আগে থেকেই শিক্ষার্থীদের রাতে নিজের বাড়িতে রেখে পড়ালেখা করান। কারণ, গ্রামের অনেক অভিভাবক সন্তানকে পড়া বুঝিয়ে দিতে পারেন না। পড়াশোনার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করার মতো সুযোগও থাকে না। এমনকি পড়ার জন্য নিরিবিলি ও সুন্দর পরিবেশও অনেকের বাড়িতে নেই। তাই শিক্ষার্থীদের ভালো ফলাফলের কথা বিবেচনা করে নিজের বাড়িতেই তাদের থাকার ও পড়ার ব্যবস্থা করেন তিনি।

শিশুদের যত্ন নিয়ে শেখান শারমিন। ছবি : সৌজন্য

শিশুদের যত্ন নিয়ে শেখান শারমিন। ছবি : সৌজন্য


করোনার সময়ে যখন মানুষ ঘর থেকে বের হতেই ভয় পেত, তখন শারমিন বাড়ি বাড়ি গিয়ে পড়াতেন। কেন্দ্র করে একেক এলাকায় একেক দিন যেতেন, পরীক্ষা নিতেন। এছাড়া, এসময় অনলাইনে তার উপজেলার ভেতর সর্বোচ্চ ক্লাস নেওয়ার রেকর্ডও গড়েন তিনি। এমনকি করোনার সময় তিনি ও তার মা মিলে নিজ হাতে সুতি কাপড়ের মাস্ক তৈরি করে সেগুলো বিনামূল্যে সবাইকে বিতরণ করেছেন। বন্যার সময় ফেসবুকে গ্রুপ খুলে সবার সহযোগিতা নিয়ে ৮ লাখ টাকা যোগাড় করে দুস্থদের ত্রাণ দিয়েছিলেন।

শিশুদের পাশাপাশি মায়েদেরও সচেতন করা প্রয়োজন বলে মনে করেন শারমিন। ছবি : সৌজন্য

শিশুদের পাশাপাশি মায়েদেরও সচেতন করা প্রয়োজন বলে মনে করেন শারমিন। ছবি : সৌজন্য


শিক্ষার্থীদের নিয়ে কাজ করতে গিয়ে শারমিন উপলব্ধি করেন, গ্রামের অনেক মা লেখাপড়া জানেন না। সচেতনতার অভাবেও একটি সম্ভাবনাময় শিশুর বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। তাই শিশুদের পাশাপাশি মায়েদেরও সচেতন করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। ‘রাস্তার মাস্টার’ নামে পরিচিত বিশ্বসেরা শিক্ষক দীপ নারায়ণ নায়কের দেয়ালে পড়ানোর বিষয়টি শারমিনকে বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত করে। তার পরামর্শ ও অনুপ্রেরণায় সেই ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে তিনি গড়ে তোলেন ‘মায়ের পাঠশালা’। এখানে মা ও সন্তান একসঙ্গে পড়ালেখা করে।

এ বছর মায়ের পাঠশালার ৩টি কেন্দ্রে মোট ১০০ জন মাকে আম্রপালী ও হিমসাগর আমের চারা উপহার দিয়েছেন তিনি। ছবি : সৌজন্য

এ বছর মায়ের পাঠশালার ৩টি কেন্দ্রে মোট ১০০ জন মাকে আম্রপালী ও হিমসাগর আমের চারা উপহার দিয়েছেন তিনি। ছবি : সৌজন্য


মায়েদের অনেকেরই স্কুলে যাওয়ার সুযোগ হয়নি। তাই শারমিন যেন স্কুলকেই তাদের কাছে নিয়ে গেছেন। টিনের ঘরের দেয়ালকে বানানো হয়েছে বোর্ড। সেখানে চক দিয়ে বর্ণ লেখা থেকে শুরু করে নিজের নাম লেখা শিখছেন মায়েরা। সন্তানরাও মাকে পড়তে সহযোগিতা করছে। এ বছর মায়ের পাঠশালার ৩টি কেন্দ্রে মোট ১০০ জন মাকে আম্রপালী ও হিমসাগর আমের চারা উপহার দিয়েছেন তিনি, যারা কী না নিজের নাম লিখতে পেরেছে। প্রতি শুক্র ও শনিবার ‘মায়ের পাঠশালা’য় সময় দেন শারমিন। তার এই কাজে সহায়তা করেন ওই বিদ্যালয়ের দুই সাবেক শিক্ষার্থী অন্তরা ও রোহানী।

লিখতে শিখছেন একজন মা। ছবি : সৌজন্য

লিখতে শিখছেন একজন মা। ছবি : সৌজন্য


‘মায়ের পাঠশালা’র মাধ্যমে মায়েরা সন্তানের পড়ালেখা, পুষ্টি ও স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন বিষয়ে সচেতন হচ্ছেন। গ্রামের মায়েদের স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহারের বিষয়েও সচেতন করে তুলছেন শারমিন। মায়েদের বিভিন্ন কাজের পুরস্কার হিসেবে স্যানিটারি ন্যাপকিনও তুলে দেন তিনি। শারমিনের স্বপ্ন, দেশের সব মা একদিন সচেতন হয়ে উঠবেন। তারা সন্তানদের সত্যিকারের ভালোটা বুঝবেন। মেয়েদের বোঝা হিসেবে নয়, সম্পদ হিসেবে দেখবেন।

মায়ের পাঠশালাতে কাঁথা সেলাইসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। ছবি : সৌজন্য

মায়ের পাঠশালাতে কাঁথা সেলাইসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। ছবি : সৌজন্য


‘মায়ের পাঠশালা’ শুধু পড়ালেখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এখানে উলের কাজ, কাঁথা সেলাই, পাটের জিনিস তৈরি ও বিভিন্ন ধরনের পিঠা তৈরির অনুশীলন এবং প্রতিযোগিতাও হয়। এসব উদ্যোগের কারণে গ্রামের শিশু ও মায়েদের কাছে প্রিয় হয়ে উঠেছেন শারমিন।

শিক্ষাক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতিও পেয়েছেন তিনি। ২০২২, ২০২৩ ও ২০২৪ সালে উপজেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হয়েছেন শারমিন। পেয়েছেন শ্রেষ্ঠ জয়িতা পুরস্কারও। বিভিন্ন উদ্ভাবনী ধারণার জন্য অর্জন করেছেন সেরা উদ্ভাবক পুরস্কার। এটুআই কর্তৃক নির্বাচিত ভাঙ্গা উপজেলার একমাত্র আইসিটি অ্যাম্বাসেডর শারমিন রহমান। পাশাপাশি বাংলা ও ইংরেজি বিষয়ের মাস্টার ট্রেইনার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।


শিক্ষকতার পাশাপাশি লেখক হিসেবেও পরিচিত শারমিন রহমান। এ পর্যন্ত তার ৪টি বই প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ‘কয়েদি নম্বর ৩৩২’ গল্পগ্রন্থ, ‘নির্মাতা তারেক মাসুদ’ জীবনীগ্রন্থ, ‘প্রিয় সমুদ্র’ পত্রকাব্য এবং ‘ন মানুষ’ গল্পগ্রন্থ।

নারীরা আগের তুলনায় অনেক এগিয়ে এসেছেন। জীবনের প্রায় সব ক্ষেত্রেই নারীরা অবদান রাখছেন। তবে, গ্রামের বাস্তবতা অনেক ক্ষেত্রেই ভিন্ন। অভাব ও অসচেতনতা একটি শিশুর সুন্দরভাবে বেড়ে ওঠার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এই বাধা দূর করতে মায়েদের সচেতন ও শিক্ষিত করে তোলার কোনো বিকল্প নেই। কারণ, একটি শিশুর প্রথম শিক্ষক তার মা। এই বিশ্বাস থেকেই ‘মায়ের পাঠশালা’কে আরও বড় পরিসরে ছড়িয়ে দেওয়ার স্বপ্ন দেখেন ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা উপজেলার এই মানবিক শিক্ষক। শারমিন রহমানের স্বপ্ন, একদিন দেশের প্রতিটি প্রান্তে মায়েরা সচেতন হবেন, সন্তানদের শিক্ষায় ভূমিকা রাখবেন এবং ‘মায়ের পাঠশালা’ ছড়িয়ে পড়বে পুরো দেশে।

সময়ের আলো/মহু


  বিষয়:   শারমিন  শিক্ষক  মায়ের পাঠশালা  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
ফিচার- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: