মানুষ ঘুমের মধ্যে নানা ধরনের স্বপ্ন দেখে। ইসলামে সব স্বপ্নের একই অর্থ নেই। হাদিসে স্বপ্নকে তিন ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে—আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদ, শয়তানের পক্ষ থেকে ভয় বা কষ্টদায়ক স্বপ্ন এবং মানুষের নিজের চিন্তা-ভাবনার প্রতিফলন।
আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কেয়ামত যতই নিকটবর্তী হবে, মুমিনের স্বপ্ন তত বেশি সত্য হতে থাকবে। যে ব্যক্তি কথায় বেশি সত্যবাদী, তার স্বপ্নও বেশি সত্য হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি স্বপ্নের তিন ধরন উল্লেখ করে বলেন, ভালো স্বপ্ন আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদ, ভয়ংকর স্বপ্ন শয়তানের পক্ষ থেকে এবং কিছু স্বপ্ন মানুষের নিজের চিন্তা-ভাবনার প্রতিফলন। কেউ অপছন্দনীয় স্বপ্ন দেখলে উঠে নামাজ পড়বে এবং তা কারও কাছে বলবে না। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২২৬৩)
আউফ ইবনে মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, স্বপ্ন তিন ধরনের। এর একটি শয়তানের পক্ষ থেকে আসা ভয়ভীতির স্বপ্ন, যা মানুষকে দুশ্চিন্তায় ফেলে। দ্বিতীয়টি হলো জাগ্রত অবস্থায় মানুষের মনে থাকা চিন্তা বা দুশ্চিন্তার প্রতিফলন। আর তৃতীয়টি হলো নবুওয়াতের ৪৬ ভাগের এক ভাগ। (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৩১৫৫)
ইসলামি স্বপ্নতত্ত্বে সত্য স্বপ্নকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। প্রাচীন স্বপ্ন ব্যাখ্যার গ্রন্থগুলোতে বিভিন্ন স্বপ্নের প্রতীকী অর্থও উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে পবিত্র কাবা দেখা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হিসেবে বিবেচিত।
প্রচলিত ব্যাখ্যা অনুযায়ী, স্বপ্নে কাবাঘর দেখা সম্মান, কল্যাণ, নিরাপত্তা ও মর্যাদার ইঙ্গিত হতে পারে। কোনো কোনো ব্যাখ্যায় কাবাকে শাসক, খলিফা, আমির বা রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের প্রতীক হিসেবেও দেখা হয়েছে।
স্বপ্নে কাবার দিকে মুখ করে নামাজ পড়তে দেখা দ্বীন ও বিশ্বাসের সঠিকতার প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। আবার কাবায় প্রবেশের স্বপ্নকে কেউ পবিত্র কাবায় যাওয়ার সৌভাগ্য, আবার কেউ শাসক বা ক্ষমতাবান ব্যক্তির সান্নিধ্য লাভের ইঙ্গিত হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
কেউ স্বপ্নে নিজের ঘরকে কাবার মতো দেখতে পেলে তা উচ্চ মর্যাদা, সম্মান ও মানুষের কাছে সুনাম লাভের ইঙ্গিত হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। একইভাবে কাবার অবস্থাকে সুন্দর ও স্বাভাবিক দেখাকে কল্যাণের প্রতীক এবং কাবার কোনো অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে দেখাকে অশুভ সংকেত হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন স্বপ্নবিশারদরা।
স্বপ্নে কাবার কোনো দেয়াল ভেঙে পড়তে দেখা প্রাচীন ব্যাখ্যায় শাসক বা ক্ষমতাবান ব্যক্তির মৃত্যু কিংবা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বড় পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব ব্যাখ্যা নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী নয়; এগুলো প্রাচীন স্বপ্ন ব্যাখ্যার গ্রন্থে বর্ণিত প্রতীকী ব্যাখ্যা।
কাবার ছাদে উঠে নামাজ পড়ার স্বপ্নকে প্রাচীন স্বপ্ন ব্যাখ্যাকারীরা সতর্কতার বিষয় হিসেবে দেখেছেন। এ বিষয়ে ইমাম ইবনে সিরিন (রহ.)-এর একটি বর্ণনাও পাওয়া যায়। এক ব্যক্তি তাঁকে কাবার ছাদে নামাজ পড়ার স্বপ্নের কথা জানালে তিনি তাকে সতর্ক করেছিলেন এবং এর মধ্যে দ্বীনের ক্ষেত্রে বড় ধরনের বিচ্যুতির ইঙ্গিত দেখেছিলেন।
অন্যদিকে স্বপ্নে মক্কায় অবস্থান করতে দেখা দীর্ঘ জীবন লাভের ইঙ্গিত হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। মক্কায় মৃত ব্যক্তিদের সঙ্গে অবস্থান করা এবং তাদের সঙ্গে কথোপকথনের স্বপ্নকেও প্রাচীন ব্যাখ্যায় বিশেষ অর্থবহ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এক বর্ণনায় এসেছে, এক গণিতবিদ স্বপ্নে নিজেকে হারাম শরিফে প্রবেশ করে কাবার ছাদে নামাজ পড়তে দেখেন। স্বপ্নটি একজন ব্যাখ্যাকারকে জানানো হলে তিনি এর মধ্যে নিরাপত্তা, ক্ষমতা কিংবা প্রশাসনিক দায়িত্ব পাওয়ার ইঙ্গিত দেখতে পান। পরবর্তী সময়ে ওই ব্যক্তির জীবনে এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিছু ঘটনা ঘটেছিল বলে বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে।
তবে ইসলামের দৃষ্টিতে স্বপ্নের ব্যাখ্যা ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে। একই স্বপ্ন সবার জন্য একই অর্থ বহন করবে—এমন কোনো নিশ্চিত নিয়ম নেই। তাই স্বপ্নের ওপর ভিত্তি করে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া বা ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিশ্চিত ধারণা করা উচিত নয়। ভালো স্বপ্ন দেখলে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা এবং খারাপ স্বপ্ন দেখলে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়াই হাদিসের নির্দেশনা।
সূত্র : আল্লামা ইবনে সিরিনের ‘স্বপ্নের ব্যাখ্যা’ গ্রন্থ থেকে।