কক্সবাজারে দ্রুত বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ, হাসপাতালগুলোতে ভর্তি রয়েছেন ধারণক্ষমতার দ্বিগুণ রোগী। কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে চলতি বছরের আগস্টে ২০৪ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হলেও সেপ্টেম্বরে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩২৮ জনে। এছাড়া চলতি অক্টোবরের প্রথম পাঁচ দিনেই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন আরও ৬০ জন। বিগত দুই মাসে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন দুজন।
কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, পুরুষ মেডিসিন ওয়ার্ডের ডেঙ্গু ব্লকে মাত্র ১০টি শয্যার বিপরীতে ভর্তি আছেন ২৪ জন রোগী। নারী ও শিশু মেডিসিনের ডেঙ্গু ব্লকের অবস্থাও একই রকম; জায়গার সংকুলান না হওয়ায় রোগীদের মেঝেতে রেখেই চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। চিকিৎসক ও নার্সরা অতিরিক্ত রোগীর এই চাপ সামলাতে বেশ হিমশিম খাচ্ছেন। ২০ শয্যার ডেঙ্গু ইউনিটে বর্তমানে রোগীর সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হওয়ায় বাধ্য হয়ে অনেককে মেঝেতে রেখেই চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
কক্সবাজার সিভিল সার্জন কার্যালয়ের ৮ অক্টোবরের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১ জানুয়ারি থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত জেলায় মোট ৫ হাজার ১৫১ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে রোহিঙ্গা শিবিরেই আক্রান্ত হয়েছেন ২ হাজার ৮৮৫ জন এবং সেখানে মারা গেছেন ১০ জন; যার মধ্যে ৪ জন প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষ ও ৬ জন শিশু। অপরদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৬২ জনের ডেঙ্গু ধরা পড়েছে, যার মধ্যে ৩৩ জন কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং একই সময়ে ছাড়পত্র পেয়েছেন ২৮ জন।
এদিকে মেঝেতে চিকিৎসা নেওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় মশারি ও অন্যান্য সেবা না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন রোগী ও তাদের স্বজনেরা। হাসপাতালে ভর্তি ইব্রাহীম নামে এক রোগী জানান, গতকাল ভর্তি হলেও এখন পর্যন্ত কোনো সিট পাননি এবং অন্য রোগীর সিটে বসেই তাকে সময় কাটাতে হচ্ছে। মরিয়ম বেগম নামের এক রোগীর স্বজন জানান, তার স্বামী সিট না পেয়ে মেঝেতে শুয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন এবং একজনের সিটে দুজনকে থাকতে হচ্ছে। তাছাড়া রোগীদের মশারি দেওয়া হলেও স্বজনদের জন্য তা দেওয়া হয়নি। ডেঙ্গু আক্রান্ত এক শিশুর বাবা রতন দাস অভিযোগ করেন যে, প্রয়োজনের সময় নার্সদের পাওয়া যায় না এবং বারবার অনুরোধ করলেও অনেক সময় তারা সাড়া দেন না, যা তাদের ভোগান্তি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সদর হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ৪০-এর নিচে থাকলেও জুলাই থেকে তা দ্রুত বাড়তে শুরু করে। তবে রোগীর সংখ্যা বাড়লেও সেই অনুপাতে চিকিৎসক, নার্স ও সহায়ক কর্মীর সংখ্যা বৃদ্ধি পায়নি। শিশু ওয়ার্ডের সিনিয়র স্টাফ নার্স মেরিনা হেমরক জানান, তীব্র জনবল সংকটের কারণে তারা হিমশিম খাচ্ছেন এবং জনবল বাড়ালে সেবার মান আরও উন্নত করা সম্ভব হতো।
অন্যদিকে, ডেঙ্গু ইউনিটের মুখপাত্র ডা. ইয়াছিন আরাফাত বলেন, চিকিৎসকদের সংকট থাকা সত্ত্বেও ডেঙ্গু আক্রান্তদের জন্য আলাদা কর্নার করে সর্বোচ্চ সেবা নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে। জটিল রোগীদের নিয়মিত (সকাল-বিকাল এমনকি প্রয়োজনে প্রতি ঘণ্টায়) পর্যবেক্ষণ করা হয় বলে হাসপাতালে মৃত্যুর হার তুলনামূলক কম। তিনি জানান, আগস্ট, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে সাধারণত ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি থাকে। গত সেপ্টেম্বরে সদর হাসপাতালে প্রায় ২০০ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছিলেন (আগস্টে ভর্তি ছিলেন ১৬৮ জন) এবং অক্টোবরেও এই চাপ অব্যাহত রয়েছে।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ডাবের খোসা, বালতি, পরিত্যক্ত টায়ার, ফুলের টব কিংবা ছাদ ও আঙিনায় যেন পানি জমে না থাকে, সে বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে। এছাড়া দিনের বেলায় ফুলহাতা জামা ও প্যান্ট পরার পাশাপাশি মশার উপদ্রব বেশি থাকা এলাকায় দিনেও মশারি ব্যবহারের আহ্বান জানানো হয়েছে। ডা. ইয়াছিন আরাফাত আরও জানান, ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীকেও মশারির ভেতরে রাখতে হবে, কারণ তাকে কোনো মশা কামড়ালে সেই মশার মাধ্যমে অন্যরাও আক্রান্ত হতে পারেন। তাই মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করার পাশাপাশি রোগীকেও মশার কামড় থেকে রক্ষা করতে হবে।
উল্লেখ্য, গত বছর কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে ১ হাজার ২১০ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছিলেন এবং তাদের মধ্যে দুজনের মৃত্যু হয়েছিল।
সময়ের আলো/আতা