ইসলাম বৈধ ব্যবসাকে অনুমোদন করেছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন’ (সুরা বাকারা : ২৭৫)। ইসলামি ফিকহের সাধারণ নীতি হলো, যে বস্তু নিজস্বভাবে হালাল এবং যার বৈধ ব্যবহার রয়েছে, তার ক্রয়-বিক্রয়ও মূলত বৈধ। চাল, ডাল, নারকেল, ফলমূল, কাপড়, হাঁড়ি-পাতিল কিংবা অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় উপাসনার বস্তু নয়।
তাই এগুলো একজন অমুসলিম ক্রেতার কাছে বিক্রি করলেই লেনদেন হারাম হয়ে যাবে এমন কথা বলা যায় না। নবীজি (সা.)-এর জীবনেও অমুসলিমদের সঙ্গে বৈধ লেনদেনের দৃষ্টান্ত রয়েছে। সহিহ বুখারিতে এসেছে, তিনি এক ইহুদির কাছ থেকে খাদ্য বাকিতে ক্রয় করেছিলেন এবং তাঁর বর্ম বন্ধক রেখেছিলেন। অর্থাৎ অমুসলিমের সঙ্গে বৈধ অর্থনৈতিক সম্পর্ক ইসলামে নিষিদ্ধ নয়।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে। সাধারণ হালাল পণ্য বিক্রি করা এক বিষয়, আর কোনো ধর্মীয় উপাসনা বা আচার পালনের জন্য নির্দিষ্ট বস্তু সরবরাহ করা আরেক বিষয়। অমুসলিমদের উৎসবে মুসলিম ব্যবসায়ীর করণীয় হলো—
প্রথমত সাধারণ হালাল পণ্যের বৈধ বেচাকেনা চালু রাখা। শুধু ক্রেতা অমুসলিম হওয়ার কারণে স্বাভাবিক ব্যবসা বন্ধ করার প্রয়োজন নেই।
দ্বিতীয়ত যেসব পণ্য সরাসরি উপাসনা বা ধর্মীয় আচার পালনের উপকরণ, সেগুলোর বিষয়ে আলাদা শরয়ি বিধান প্রযোজ্য হবে। নির্দিষ্ট কোনো পণ্যের ব্যবহার নিয়ে সংশয় থাকলে বিশ্বস্ত মুফতির কাছে বিস্তারিত পরিস্থিতি তুলে ধরে ফতোয়া নেওয়া উত্তম।
তৃতীয়ত ব্যবসায়িক মূল্যছাড় দিতে হলে সেটিকে সাধারণ ব্যবসায়িক ভাষায় রাখা নিরাপদ।
চতুর্থত কোনো অমুসলিম ধর্মীয় উৎসবের নাম ব্যবহার করে উদযাপনমূলক বা অভিনন্দনমূলক বাণিজ্যিক প্রচার থেকে বিরত থাকা উচিত।
পঞ্চমত সন্দেহ দেখা দিলে ‘সবই হারাম’ বা ‘সবই বৈধ’— এমন চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে না গিয়ে নির্দিষ্ট ঘটনা ও পরিস্থিতি একজন যোগ্য আলেম বা মুফতির সামনে উপস্থাপন করা উচিত। কারণ ফিকহি হুকুম অনেক সময় উদ্দেশ্য, ব্যবহার ও পরিস্থিতির পার্থক্যের কারণে ভিন্ন হতে পারে।
ইসলাম ব্যবসা বন্ধ করতে বলেনি; বরং ব্যবসাকে হালাল, স্বচ্ছ ও নীতিনিষ্ঠ রাখতে বলেছে। বাজারে সবার সঙ্গে ন্যায় ও সৌজন্য থাকবে, কিন্তু একজন মুসলিম তার আকিদার সীমারেখাও অটুট রাখবেন। শেষ পর্যন্ত একজন ব্যবসায়ীর সাফল্য শুধু দিনের শেষে ক্যাশবাক্সে কত টাকা জমল তার হিসাব নয়। সেই অর্থ কীভাবে অর্জিত হলো, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ।
বাজারে দরজা সবার জন্য খোলা থাকতে পারে, কিন্তু ঈমানের সীমারেখা অতিক্রম করার অনুমতি নেই। মুনাফা কম হতে পারে, কোনো সুযোগ হাতছাড়া হতে পারে; তবু একজন মুমিনের কাছে হালাল উপার্জনের স্বস্তিই সবচেয়ে বড় সম্পদ। কারণ ব্যবসার খাতায় যে লাভ লেখা থাকে তা দুনিয়ার হিসাব; আর সেই লাভ কীভাবে অর্জিত হলো, সেটাই আখেরাতের হিসাব।
লেখক : আলেম ও প্রাবন্ধিক
সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও