ভারতের অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (এআইএসএ) সভাপতি নেহা বোরা। ছবি : আলজাজিরা ভারতের যুব আন্দোলনের পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছেন বামপন্থী ছাত্রনেত্রী নেহা বোরা। মোদি সরকারের নীতি ও সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আন্দোলনে তরুণদের মধ্যে বাড়ছে তার জনপ্রিয়তা। তবে জাতীয় রাজনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলতে পারবেন তিনি, তা নিয়ে রয়েছে প্রশ্ন।
দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন সরকারের বিরুদ্ধে তরুণদের আন্দোলনে নতুন করে আলোচনায় এসেছেন ২৯ বছর বয়সী ছাত্রনেত্রী নেহা বোরা। বামপন্থী ছাত্রসংগঠন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (এআইএসএ) এই নেত্রী এখন ভারতের যুব আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখ।
শিক্ষা খাতে অনিয়ম, সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত এবং নির্বাচনী তালিকায় পরিবর্তনের প্রতিবাদে সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের তরুণদের মধ্যে অসন্তোষ বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে রাজপথের আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রেখে নজর কেড়েছেন নেহা।
আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিরোধী দল, তরুণদের প্রতিবাদী সংগঠন এবং ছাত্র আন্দোলনের সম্মিলিত চাপের মুখে রয়েছে মোদি সরকার। এর মধ্যে নেহা নিজের সাহসী প্রতিবাদ, সংগঠক হিসেবে দক্ষতা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয়তার কারণে আলাদা পরিচিতি পেয়েছেন।
পুলিশের চোখ এড়িয়ে আন্দোলনে নেতৃত্ব
গত ১০ অক্টোবর ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে দিল্লিতে বিক্ষোভের প্রস্তুতি নেওয়া হয়। ওই সময় পুলিশ বিভিন্ন জায়গায় আন্দোলনকারীদের আটক করে এবং কয়েকজন নেতাকে বাড়িতে আটকে রাখে।
তবে নেহা পুলিশের নজর এড়িয়ে দক্ষিণ দিল্লিতে সমর্থকদের নিয়ে বিক্ষোভে অংশ নেন। পরে পুলিশ তাকে আটক করে। কয়েক ঘণ্টা পর তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
এরপরও বিভিন্ন বিক্ষোভে অংশ নিয়ে একাধিকবার আটক হন তিনি। পুলিশের সঙ্গে তার ধস্তাধস্তি এবং স্লোগান দেওয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
তাকে নিয়ে তৈরি হয়েছে ভিডিও গেমও। এসব ভিডিওতে কখনো তাকে পুলিশের ব্যারিকেড পার হতে, কখনো আবার গণতন্ত্রের পক্ষে লড়াই করতে দেখা যায়। তরুণদের একাংশের কাছে তিনি এখন প্রতিবাদের প্রতীক।
বামপন্থী রাজনীতি থেকে রাজপথে
নেহা বোরা উত্তর ভারতের উত্তরাখণ্ড রাজ্যের খাতিমা শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ভারতীয় সেনাবাহিনীতে কর্মরত থাকায় পরিবারের সঙ্গে তাঁকে বিভিন্ন শহরে থাকতে হয়েছে।
দিল্লির বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি দীর্ঘদিন ধরে ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। পরে বামপন্থী ছাত্রসংগঠন এআইএসএতে যোগ দেন এবং বর্তমানে সংগঠনটির জাতীয় সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
২০১৯ সালে ভারতের নাগরিকত্ব আইন সংশোধনের বিরুদ্ধে আন্দোলন তাঁর রাজনৈতিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সমালোচকদের মতে, ওই আইনে মুসলিমদের প্রতি বৈষম্যের আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল।
এরপর থেকে ছাত্র আন্দোলন সংগঠিত করা, প্রচার চালানো এবং শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিকভাবে যুক্ত করার কাজে সক্রিয় হন নেহা।
চলতি বছরের শুরুতে দিল্লির যন্তর মন্তরে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনেও অংশ নেন তিনি। একপর্যায়ে টানা ২৩ দিন অনশন করেন। এই কর্মসূচি তাকে জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি এনে দেয়।
কেন জনপ্রিয় হচ্ছেন নেহা?
নেহার জনপ্রিয়তার পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, তিনি শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য দেন না, সরাসরি রাজপথের আন্দোলনে অংশ নেন। দ্বিতীয়ত, তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করেন।
তার ঘনিষ্ঠদের মতে, ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভাষা বোঝার কারণে তরুণদের কাছে নিজের বক্তব্য সহজভাবে তুলে ধরতে পারেন তিনি।
দিল্লির শিক্ষার্থী নিশিতা নাথের মতো অনেক তরুণ নেহার আন্দোলনে অনুপ্রাণিত হচ্ছেন। নাথের ভাষায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই নেহার ভিডিও চোখে পড়ে এবং তার প্রতিবাদী ভূমিকা তরুণদের আকৃষ্ট করছে।
নেহার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত নেতাদের দাবি, সরকারের সমালোচকদের প্রায়ই ‘দেশবিরোধী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। কিন্তু নেহার মতো নেতাদের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তাদের রাজনৈতিক অবস্থান ও ব্যক্তিগত সংগ্রাম সম্পর্কে মানুষ নতুন করে জানার সুযোগ পাচ্ছে।
মোদি সরকারের জন্য কতটা হুমকি?
নেহা বোরা তরুণদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে উঠলেও তাকে এখনই মোদি সরকারের জন্য বড় নির্বাচনী হুমকি হিসেবে দেখার সুযোগ সীমিত।
ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে তার দল এআইএসএর প্রভাব এখনো মূলত বিশ্ববিদ্যালয় ও ছাত্র আন্দোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ। সংগঠনটির সঙ্গে যুক্ত কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া (মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী) লিবারেশনেরও জাতীয় পর্যায়ে সীমিত রাজনৈতিক শক্তি রয়েছে।
দলটির লোকসভায় মাত্র দুজন সদস্য রয়েছেন। এ ছাড়া ভারতের কোনো রাজ্যে এককভাবে সরকার গঠনের ইতিহাসও নেই তাদের।
দিল্লিভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক আসিম আলির মতে, ছাত্ররাজনীতি থেকে জাতীয় নির্বাচনের রাজনীতিতে প্রবেশ করা সহজ নয়। নির্বাচনে সফল হতে হলে কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় শক্তিশালী জনসমর্থন ও ভোটারভিত্তি প্রয়োজন। নেহার এখনো তেমন কোনো স্থায়ী ভোটব্যাংক গড়ে ওঠেনি।
তার সামনে আরেকটি পথ হতে পারে কংগ্রেসের মতো বড় বিরোধী দলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হওয়া। তবে বড় দলে প্রবেশ করলেও প্রতিষ্ঠিত নেতাদের প্রভাবের কারণে নিজের অবস্থান তৈরি করা কঠিন হতে পারে।
আন্দোলনের মুখ, নাকি ভবিষ্যতের রাজনীতিক?
নেহা বোরা এখন এমন এক সময়ে জনপ্রিয়তা অর্জন করছেন, যখন ভারতের তরুণদের একাংশ সরকারের নীতি ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। শিক্ষা খাতের অনিয়ম থেকে শুরু করে নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্ক— বিভিন্ন ইস্যুতে এই অসন্তোষ প্রকাশ পাচ্ছে।
তবে রাজপথের জনপ্রিয়তাকে নির্বাচনী সাফল্যে রূপান্তর করতে পারবেন কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নেহা যদি তরুণদের বর্তমান সমর্থনকে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সংগঠন ও ভোটারভিত্তিতে রূপ দিতে পারেন, তাহলে ভবিষ্যতে ভারতের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন তিনি।
অর্থাৎ, নেহা বোরা এখনই মোদি সরকারের বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি নন। তবে তরুণদের আন্দোলনে তাঁর উত্থান ভারতের রাজনীতিতে নতুন এক প্রজন্মের প্রতিবাদী কণ্ঠের উপস্থিতি তুলে ধরছে।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ