ছবি : সংগৃহীতএকজনকে ক্রমাগত চড় আর ঘুষির সঙ্গে লাথি মারতে থাকে কয়েকজন। একপর্যায়ে মারধরের পর প্রচণ্ড ক্ষুধায় খাবার চান ভুক্তভোগী। পরে তাকে পেটভর্তি ডাল-ভাত খেতে দেওয়া হয়। খাওয়া শেষে তাকে আবারও গেস্ট রুমে নিয়ে চলে নির্যাতন। তখন আর হাতে-পায়ে স্টাম্প, হকিস্টিক আর বাঁশ দিয়ে পেটানো হয় ইচ্ছামতো। একটি হাত জানালার সঙ্গে দড়ি দিয়ে বেঁধে, তার ডান হাত পায়ের তলায় চেপে ধরে ক্রিকেট স্টাম্প দিয়ে পা, উরু, কোমর ও পিঠে— সারা শরীরে পেটানো হয়। একপর্যায়ে অচেতন হয়ে পড়েন তিনি। পরক্ষণেই মৃত্যু হয় তার। ২০২৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটে এই পৈশাচিক হত্যাকাণ্ড।
২৪ সালে চোর সন্দেহে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলের অতিথি কক্ষে মানসিক ভারসাম্যহীন তোফাজ্জল হোসেনকে নির্মম নির্যাতন করে হত্যা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষার্থী। আর হত্যার পূর্বে ভাত খেতে দেওয়ার পর তোফাজ্জলের সেই করুণ চেহারা যেন ভুলতে পারেনি সারা দেশের মানুষ। ভাইরাল হওয়া সেই ভিডিও দেখে চোখ থেকে পানি ঝরেছিল অনেকের। ঘটনায় দুই বছর পার হলেও এখনও শুরু হয়নি এর বিচার।
তবে ২৮ জনকে আসামি করে আদালতে চার্জশিট জমা দেওয়া হয়েছে পুলিশের পক্ষ থেকে। সময়ের সঙ্গে যেন হারিয়ে গেছে তোফাজ্জলের সেই মর্মান্তিক ঘটনার ভয়াবহ চিত্র। হত্যার পরদিন শাহবাগ থানায় মামলা করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের এস্টেট অফিসের সুপারভাইজার আমানুল্লাহ। মামলা তদন্ত করে ২০২৪ সালের ৩০ ডিসেম্বর আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন শাহবাগ থানার ইন্সপেক্টর মো. আসাদুজ্জামান। সেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২১ শিক্ষার্থীর নাম আসে। তবে ওই অভিযোগপত্র নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নারাজি আবেদন দেন।
এরপর গত বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকার সে সময়ের মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সাইফুজ্জামান পিবিআইকে পুনরায় তদন্তের নির্দেশ দেন। পরে পিবিআইয়েরর ওই কর্মকর্তা গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর নতুন করে আরও সাতজনসহ ২৮ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জমা দেন। গত ১০ মার্চ অভিযোগপত্র গ্রহণ করে পলাতকদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে আদালত।
তবে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তোফাজ্জল হোসেন হত্যা মামলায় আসামির মধ্যে ১৬ জন পলাতক রয়েছেন। এ ছাড়া দুজন আসামি গ্রেফতার হয়ে জেলহাজতে আটক আছেন এবং বাকি ১০ আসামি বিভিন্ন সময় আদালত থেকে পাওয়া জামিনে মুক্ত আছেন। এদিকে ১৬ জন আসামি পলাতক থাকায় তাদের বিরুদ্ধে সিএমএম আদালত থেকে অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট ইস্যু করা হয়েছে। সেই সঙ্গে তাদেরকে গ্রেফতারের জন্য এবং সংশ্লিষ্ট শাহবাগ থানার ওসিকে এই বিষয়ে আগামী ৫ নভেম্বর প্রতিবেদন দাখিলের জন্য নির্দেশ দিয়েছেন সিএমএম আদালতের মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ জুয়েল রানা।
পলাতক আসামিদের গ্রেফতারের বিষয়ে প্রতিবেদন এলে এবং মামলাটা বিচারের জন্য প্রস্তুত হলে পরবর্তীতে মামলাটি মহানগর দায়রা জজ আদালতে পাঠানো হবে। সেখানে অভিযোগ গঠন হবে। এরপর সাক্ষীদের হাজির করে মামলার বিচারকাজ চালানো হবে।
মামলাটির সর্বশেষ তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হান্নানুল ইসলাম সময়ের আলোকে বলেন, মামলার তদন্ত শেষে গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর ২৮ জনের নাম উল্লেখ করে আদালতে চার্জশিট জমা দিয়েছি। বাকিটা আদালতের কাজ। যদি আদালত কোনো প্রয়োজনে ডাকে তখন রেসপন্স করব। এদিকে তদন্তে কোনো প্রতিবন্ধকতা ছিল কি না— জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা স্বাধীনভাবে তদন্ত কাজ শেষ করেছি। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও তদন্তের স্বার্থে সহযোগিতা করেছেন।
এদিকে হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তোফাজ্জলের মামাতো বোন আসমা আক্তার তানিয়া। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, দুই বছর হয়ে গেছে এখনও বিচার শুরু হয়নি। আমরা আর কিছু চাই না, এর বিচার চাই। একই সঙ্গে প্রকৃত আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক সাজার দাবি করেছেন মামলার বাদী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এস্টেট অফিসের সুপারভাইজার মোহাম্মদ আমানুল্লাহ।
বিষয়টি নিয়ে শাহবাগ থানার ওসি মনিরুজ্জামান বলেন, ঘটনাটির মামলা শাহবাগ থানায় হয়েছে। তবে যতদূর জানি বিষয়টি এখন ডিবি তদন্ত করছে। সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা যাবে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এমকে