ছবি : সংগৃহীতফুটবল মাঠে তাঁর পরিচয় গোলস্কোরার হিসেবে। প্রতিপক্ষের জালে একের পর এক বল পাঠিয়ে গড়েছেন ইতিহাস, জিতেছেন তিনটি বিশ্বকাপ। কিন্তু গোল করার জন্য যিনি বিশ্বজুড়ে পরিচিত, সেই পেলে একসময় দাঁড়িয়েছিলেন গোলবারের নিচেও। ব্রাজিলের এই কিংবদন্তি সান্তোসের হয়ে চারটি ম্যাচে গোলকিপার হিসেবে খেলেছেন। অবাক করা তথ্য হলো, কোনো ম্যাচেই গোল হজম করেননি তিনি।
পেলের গোলকিপার হয়ে ওঠার গল্পটা অবশ্য কোনো পরিকল্পিত পরিবর্তনের নয়। বরং ফুটবলের প্রয়োজনে, দলের সংকটে গ্লাভস হাতে নিতে হয়েছিল তাকে। আর সেই দায়িত্ব পালন করতে গিয়েও দেখিয়েছেন নিজের অসাধারণ দক্ষতা।
গোলবারের নিচে পেলের অভিষেক
সান্তোসের হয়ে পেলের প্রথম গোলকিপিংয়ের অভিজ্ঞতা হয়েছিল সাও পাওলো রাজ্য চ্যাম্পিয়নশিপে কমের্শিয়ালের বিপক্ষে ম্যাচে। তখন বদলি খেলোয়াড় নামানোর নিয়ম ছিল না। তাই দলের গোলকিপার চোট পেলে কিংবা মাঠ ছাড়তে বাধ্য হলে অন্য কোনো খেলোয়াড়কেই দাঁড়াতে হতো গোলবারের নিচে। সেদিন গোল করার পর গোলকিপারের দায়িত্ব নেন পেলে। ম্যাচের বাকি সময়ে কোনো গোল হজম করেননি তিনি।
তবে গোলকিপার হিসেবে পেলের সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্তটি আসে ১৯৬৪ সালের জানুয়ারিতে। ব্রাজিলিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের সেমিফাইনালে গ্রেমিওর বিপক্ষে খেলছিল সান্তোস। ম্যাচের শেষ দিকে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে হয় সান্তোসের গোলকিপার গিলমারকে। তখন গোলবারের নিচে দাঁড়ান পেলে।
চাপটা ছিল অনেক। সামনে গ্রেমিওর আক্রমণ, গ্যালারিতে হাজারো দর্শক। কিন্তু পেলে সেই চাপ সামলে নেন। সাবেক সতীর্থ পেপের স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, পেলে অন্তত দুটি দুর্দান্ত সেভ করেছিলেন। সংবাদপত্রের প্রতিবেদনেও তার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সেভের কথা উঠে এসেছিল। গোলবারের নিচে তাঁর নৈপুণ্যে ম্যাচের শেষ দিকে আর গোল করতে পারেনি গ্রেমিও।
শুধু গোল করাই নয়, গোল ঠেকাতেও দক্ষ
পেলের গোলকিপিংয়ের গল্প শুধু আনুষ্ঠানিক ম্যাচেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তার সান্তোস-সতীর্থ লিমার স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, অনুশীলন শেষে সতীর্থরা যখন মজার ছলে ফুটবল খেলতেন, পেলে প্রায়ই গোলবারের নিচে দাঁড়াতেন। এমনকি দলের বিশেষজ্ঞ গোলকিপারদের কাছ থেকে কৌশল ও অবস্থান নেওয়ার পরামর্শও চাইতেন তিনি।
নিজের আত্মজীবনীতেও পেলে জানিয়েছিলেন, উচ্চতায় খুব বেশি না হলেও লাফ দেওয়ার ক্ষমতার কারণে তিনি ভালো গোলকিপার ছিলেন। সান্তোসের পাশাপাশি ব্রাজিল জাতীয় দলের হয়েও একবার প্রীতি ম্যাচে গোলবার সামলেছিলেন তিনি।
তিন বিশ্বকাপজয়ী কিংবদন্তি
পেলের পরিচয় অবশ্য গোলকিপার হিসেবে নয়, ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা আক্রমণাত্মক খেলোয়াড় হিসেবে। ১৯৫৮, ১৯৬২ ও ১৯৭০—তিনটি বিশ্বকাপ জিতেছে তাঁর ব্রাজিল। মাত্র ১৭ বছর বয়সে ১৯৫৮ বিশ্বকাপে নিজের প্রতিভার জানান দিয়ে বিশ্ব ফুটবলের নজর কাড়েন তিনি। গোল করা, সতীর্থদের দিয়ে গোল করানো, ড্রিবলিং কিংবা কঠিন মুহূর্তে দলের দায়িত্ব নেওয়া—সব ক্ষেত্রেই ছিল তার অসাধারণ সামর্থ্য।
পেলের ক্যারিয়ারে মোট গোলসংখ্যা নিয়ে অবশ্য বিভিন্ন হিসাব রয়েছে। গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের হিসাবে তাঁর গোল ১ হাজার ২৮৩টি; তবে প্রতিযোগিতামূলক ও আনুষ্ঠানিক ম্যাচের গোলসংখ্যা নিয়ে পরিসংখ্যানবিদদের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
ফুটবল ইতিহাসে আলাদা এক নাম
পেলে শুধু গোলের হিসাব কিংবা বিশ্বকাপের ট্রফিতে সীমাবদ্ধ নন। তার প্রতিভা, সাফল্য ও খেলার ধরন ফুটবলকে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় করে তুলতে বড় ভূমিকা রেখেছে। গোলস্কোরার হিসেবে তিনি যেমন কিংবদন্তি, তেমনি প্রয়োজনের মুহূর্তে গোলবারের নিচে দাঁড়িয়ে দলকে বাঁচানোর গল্পও তাঁকে করেছে ব্যতিক্রমী।
২০২২ সালের ২৯ ডিসেম্বর ৮২ বছর বয়সে পৃথিবী ছেড়ে যান পেলে। কিন্তু ফুটবল ইতিহাসে তার নাম আজও অমলিন। গোলের পর গোল করে যিনি কোটি মানুষের হৃদয় জয় করেছিলেন, সেই তিনিই একসময় গোল ঠেকিয়েও লিখেছিলেন নিজের ক্যারিয়ারের বিরল এক অধ্যায়।
সময়ের আলো/টিকে