বাবার কবর জিয়ারতের সেই ছবি পেল সেরা আলোকচিত্র পুরস্কার

সময়ের আলো ডেস্ক

বিবিধ

সমুদ্রের ভাঙনে বিলীন হতে বসেছে বাবার কবর। আর কিছুক্ষণ পর হয়তো কবরটির অস্তিত্বই থাকবে না। প্রিয় বাবার কবরের সামনে দাঁড়িয়ে

2026-10-23T18:50:51+00:00
2026-10-23T18:50:51+00:00
 
  শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬,
৭ কার্তিক ১৪৩৩
শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬
বিবিধ
বাবার কবর জিয়ারতের সেই ছবি পেল সেরা আলোকচিত্র পুরস্কার
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২৬, ৬:৫০ পিএম 
বাবার কবর জিয়ারতের ছবি। সংগৃহীত ছবি
সমুদ্রের ভাঙনে বিলীন হতে বসেছে বাবার কবর। আর কিছুক্ষণ পর হয়তো কবরটির অস্তিত্বই থাকবে না। প্রিয় বাবার কবরের সামনে দাঁড়িয়ে জিয়ারত করার সুযোগও হারিয়ে যেতে পারে চিরতরে। তাই কবরটি পুরোপুরি বিলীন হওয়ার আগে শেষবারের মতো জিয়ারত করছেন ছেলে। এমনই হৃদয়স্পর্শী মুহূর্ত ক্যামেরায় ধারণ করেছেন ভেটেরিনারি চিকিৎসক ও আলোকচিত্রী ডা. ইমরান পারভেজ। ‘Waves of Life’ শীর্ষক সমুদ্র ও উপকূলবিষয়ক আলোকচিত্র প্রদর্শনীতে দর্শক ভোট ও বিচারকমণ্ডলীর বিবেচনায় প্রতিযোগিতার সেরা ছবি নির্বাচিত হয়েছে এটি।  

গত ১৮ অক্টোবর রাজধানীর জাতীয় শিল্পকলা একাডেমির চিত্রশালায় শুরু হওয়া পাঁচ দিনব্যাপী এ প্রদর্শনীতে ছবিটি দর্শনার্থীদের বিশেষভাবে নাড়া দেয়। ছবিটি দেখে অনেকের মনেই প্রশ্ন জেগেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী রাষ্ট্রগুলোর কাছ থেকে বাংলাদেশ ক্ষতিপূরণ পেলেও হারিয়ে যাওয়া পূর্বপুরুষের কবরের ক্ষতিপূরণ কীভাবে সম্ভব? ছবিটি কেবল দর্শনার্থীদের আবেগাপ্লুতই করেনি, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মানুষের অপূরণীয় ক্ষতির বিষয়টিও সামনে এনেছে।

আলোকচিত্রী ডা. ইমরান পারভেজ জানান, ছবিটি সম্ভবত ২০২১ বা ২০২২ সালে তোলা। সে সময় তিনি ভাষানচরে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কাজ করা একটি এনজিওতে কর্মরত ছিলেন। যাতায়াতের পথে বিভিন্ন দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করতেন তিনি। একদিন ভাষানচরে যাওয়ার পথে নোয়াখালীর জনতাঘাট এলাকায় ছবি তোলার সময় তার চোখে পড়ে সমুদ্রের ভাঙনে বিলীন হতে থাকা একটি কবরস্থান। সেখানে থাকা অনেকগুলো কবরই ধীরে ধীরে সমুদ্রে হারিয়ে যাচ্ছিল।

সেই কবরস্থানেই সমুদ্রের দিকে অবস্থিত একটি কবরের পাশে এক ব্যক্তিকে জিয়ারত করতে দেখেন ইমরান পারভেজ। তখনো কবরটির শেষ অংশ মাটির সঙ্গে যুক্ত ছিল। তার মনে হয়েছিল, হয়তো আর কিছুক্ষণ পরই কবরটি সমুদ্রে বিলীন হয়ে যাবে। সেই মুহূর্তটিই ক্যামেরায় ধারণ করেন তিনি।

ঘটনাটি স্মরণ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন এই আলোকচিত্রী। তিনি জানান, পরে শুধু ওই কবরটি নয়, সেখানকার পুরো কবরস্থানই সমুদ্রে বিলীন হয়ে যায়। এমনকি সেই ঘাটটিরও আর অস্তিত্ব নেই। 

ছবিটি দেখে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকুয়াকালচার বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মীর মোহাম্মদ আলী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী রাষ্ট্রগুলোর বোধোদয় হলে বাংলাদেশ হয়তো কখনো ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড’ থেকে সহায়তা পেতে পারে। কিন্তু বাবার কবর হারানোর ক্ষতি কী দিয়ে পূরণ হবে? কোটি টাকা পেলেও কি কেউ নিজের বাবার কবর বিক্রি করতে চাইবেন?

দর্শনার্থী আতিকুল ইসলাম বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মানুষ যে কত মূল্যবান সম্পদ হারাচ্ছে, ছবিটি তার একটি উদাহরণ। এসব ক্ষতির অনেক কিছুই অর্থের হিসাবে পূরণ করা সম্ভব নয়। তার মতে, ছবিটি সারা বিশ্বের মানুষের সামনে তুলে ধরা উচিত, যাতে তারা বুঝতে পারে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব শুধু অর্থনৈতিক বা শারীরিক ক্ষতিতেই সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় ক্ষতিও জড়িয়ে আছে।

নদী, সমুদ্র, জলজ বাস্তুতন্ত্র, জীববৈচিত্র্য এবং উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকার বাস্তবতা তুলে ধরতে ‘Waves of Life’ শিরোনামে এ জাতীয় আলোকচিত্র প্রতিযোগিতা ও প্রদর্শনীর আয়োজন করে ইয়্যুথ ফর ওশান, ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশ এবং মিশন গ্রিন বাংলাদেশ। পাঁচ দিনব্যাপী আয়োজনে তরুণ আলোকচিত্রীদের ক্যামেরায় ধরা প্রকৃতি, পরিবেশ ও মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের নানা চিত্র প্রদর্শিত হয়। বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) পুরস্কার বিতরণের মধ্য দিয়ে শেষ হয় এ আয়োজন। 

প্রদর্শনীতে জলজ বাস্তুতন্ত্রের সংকট, জীববৈচিত্র্যের গুরুত্ব এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর ওপর পড়া প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির বিষয়টি গুরুত্ব পায়। প্রতিযোগিতায় ‘অ্যাকুয়াটিক লাইভলিহুড’ ও ‘কোস্টাল পলিউশন’ বিভাগে চ্যাম্পিয়ন হন ইমরান পারভেজ। ‘মেরিন বায়োডাইভার্সিটি’ বিভাগে চ্যাম্পিয়ন হন সাঈদ আব্বাস এবং ‘এনার্জি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট’ বিভাগে পুরস্কার পান রাজীব রাইহান। তিনটি বিভাগে রানারআপ হন মোহাম্মদ আমদাদ হোসাইন, মোহাম্মদ তাহিদুল ইসলাম ও আয়মান নাকিব। বিশেষ স্বীকৃতি পেয়েছেন জাকির হোসাইন, গালীব রহমান নাদিম, মোহাম্মদ শাহজাহান ও আয়মান নাকিব।

পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ঢাকা জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ফরিদা খানম বলেন, বাংলাদেশ নদীমাতৃক ও সমুদ্রবেষ্টিত দেশ। বঙ্গোপসাগর, উপকূলীয় অঞ্চল, নদ-নদী ও জলাভূমি দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ। এসব সম্পদ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার পাশাপাশি খাদ্যনিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং অসংখ্য মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। তবে প্লাস্টিক ও বর্জ্যদূষণ, অপরিকল্পিত সম্পদ আহরণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এসব প্রাকৃতিক প্রতিবেশ নানা সংকটের মুখে পড়েছে।


তিনি বলেন, পরিবেশ সংরক্ষণ শুধু সরকারের একার দায়িত্ব নয়; রাষ্ট্র, সমাজ ও প্রতিটি নাগরিকের সম্মিলিতভাবে এ দায়িত্ব পালন করতে হবে। সংকট মোকাবিলায় সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রয়োজন।

আলোকচিত্রের ভূমিকা তুলে ধরে ফরিদা খানম বলেন, অনেক সময় দীর্ঘ বক্তব্য যে বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে না, একটি ছবি মুহূর্তেই তা মানুষের হৃদয় ও বিবেকের কাছে পৌঁছে দিতে পারে। পরিবেশবিষয়ক আলোকচিত্র প্রকৃতির সৌন্দর্য, জীববৈচিত্র্য, মানুষের জীবনসংগ্রাম ও দূষণের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে জনমত গঠনে ভূমিকা রাখতে পারে। তাই ছবি ধারণ ও উপস্থাপনের ক্ষেত্রে সত্যনিষ্ঠা, যথাযথ প্রেক্ষাপট এবং পেশাগত নৈতিকতা বজায় রাখা জরুরি। 

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশের সমন্বয়ক, ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)-এর সদস্য সচিব এবং ইয়্যুথ ফর ওশানের উপদেষ্টা শরীফ জামিল। বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা ও পাখি বিশেষজ্ঞ ইনাম আল হক।

এ ছাড়া অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন সার্ক কৃষি কেন্দ্রের সিনিয়র প্রোগ্রাম অফিসার আবুল বাশার মিরাজ, মেরিন জার্নালিস্ট নেটওয়ার্কের সেক্রেটারি ও মিশন গ্রিন বাংলাদেশের পরিচালক কেফায়েত শাকিল, জীববৈচিত্র্য বিশেষজ্ঞ আবু সাঈদ, মাকজিওন লিমিটেডের চেয়ারম্যান মাকসুদ হোসেন, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকুয়াকালচার বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মীর মোহাম্মদ আলী, মেরিন আন্ডারওয়াটার এক্সপ্লোরার ও সেভ আওয়ার সি-এর পরিচালক সুফি মো. আতিকুর রহমান, আলোকচিত্রী সাঈদ আব্বাস এবং আয়মান নাকিবসহ অনেকে।

বক্তারা বলেন, ‘Waves of Life’ শুধু একটি আলোকচিত্র প্রতিযোগিতা বা প্রদর্শনী নয়; তরুণদের সৃজনশীল দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে প্রকৃতি ও মানুষের সম্পর্ক নতুনভাবে তুলে ধরা এবং পরিবেশ সংরক্ষণে সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোর একটি উদ্যোগ। এ ধরনের আয়োজন তরুণ প্রজন্মকে নদী, সমুদ্র ও জলজ জীববৈচিত্র্য রক্ষায় আরও সক্রিয় হতে উৎসাহিত করবে বলে তাঁরা আশা প্রকাশ করেন।

আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিযোগিতায় দেশের দেড় শতাধিক আলোকচিত্রী তিনটি বিভাগে প্রায় ৬০০ ছবি জমা দেন। সেখান থেকে বিচারকদের বিবেচনায় সেরা ১০৫টি ছবি প্রদর্শনীর জন্য নির্বাচন করা হয়। প্রতিযোগিতার বিচারক ছিলেন আলোকচিত্রী ও আলোকচিত্র শিক্ষাবিদ আবির আবদুল্লাহ, জার্মানির হামবোল্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত সমুদ্রবিষয়ক বিশেষজ্ঞ মফিজ রহমান এবং ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)-এর সদস্য ও রিভার বাংলার সম্পাদক ফয়সাল আহমেদ। 

সময়ের আলো/ইউএমএইচ

  বিষয়:   আলোকচিত্র পুরস্কার  বাবা  কবর  জিয়ারত 


Advertisement
Loading...
Loading...
বিবিধ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: