সংগৃহীত ছবি তাইওয়ান ও পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নৌ তৎপরতা বাড়িয়েছে চীন। এ কাজে দেশটি সামুদ্রিক মিলিশিয়ার মাছ ধরার নৌযানের পাশাপাশি কোস্টগার্ডের জাহাজও ব্যবহার করছে বলে অভিযোগ করেছে তাইওয়ানের কোস্টগার্ড। তাদের দাবি, চীনের এমন তৎপরতায় তাইওয়ানের পাশাপাশি জাপান ও ফিলিপাইনের ওপরও নিরাপত্তার চাপ বাড়ছে।
চলতি মাসে রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে প্রথমবারের মতো তাইওয়ানের প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলের কাছে চীনের একটি সামুদ্রিক মিলিশিয়ার নৌযান শনাক্ত হওয়ার তথ্য প্রকাশিত হয়।
তাইওয়ানের কোস্টগার্ড জানায়, গত আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে নৌযানটি চীনের একটি কোস্টগার্ড জাহাজ ও একটি গবেষণা জাহাজের সঙ্গে চলাচল করছিল। সেটিকে সরিয়ে দিতে সেখানে একটি টহল জাহাজ পাঠানো হয়।
কোস্টগার্ডের তথ্য অনুযায়ী, সন্দেহভাজন মাছ ধরার নৌযানটির নাম ‘মিনফুদিংইউ ০৭৯০২’। গত ১৬ আগস্ট এটি তাইওয়ানের নিয়ন্ত্রিত জলসীমার সীমানা থেকে প্রায় ২ দশমিক ৭ নটিক্যাল মাইল দূরে অবস্থান করছিল।
তাইওয়ানের কোস্টগার্ডের দাবি, গত জুন থেকে তাইওয়ান, জাপান ও ফিলিপাইনের জলসীমাসংলগ্ন এলাকায় এ ধরনের তৎপরতা বাড়িয়েছে চীন। এর আগে জাপান ও ফিলিপাইন নিজেদের একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলের সামুদ্রিক সীমানা নির্ধারণ নিয়ে আলোচনার ঘোষণা দিয়েছিল।
উপকূল থেকে ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলে একটি রাষ্ট্র সামুদ্রিক সম্পদ আহরণ, সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার অধিকার ভোগ করে।
রয়টার্সকে দেওয়া এক বিবৃতিতে তাইওয়ানের কোস্টগার্ড জানায়, চীনের সমন্বিত ‘গ্রে-জোন’ তৎপরতা তাইওয়ান, জাপান ও ফিলিপাইনের সামুদ্রিক নজরদারি এবং এসব কর্মকাণ্ড মোকাবিলার চাপ বাড়াচ্ছে। এ ধরনের কার্যক্রম আঞ্চলিক নিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে এবং আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক ব্যবস্থার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
সামুদ্রিক প্রভাব বাড়ানোর কৌশল
তাইওয়ানের কোস্টগার্ডের ভাষ্য, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, বৈজ্ঞানিক কার্যক্রম ও বেসামরিক পরিচয়কে কাজে লাগিয়ে সমুদ্রে নিজেদের প্রভাব বাড়ানোর কৌশল নিয়েছে চীন। এসব তৎপরতা ‘গ্রে-জোন’ অভিযানের অংশ। সংস্থাটির দাবি, এর মাধ্যমে সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের প্রস্তুতিও জোরদার করা হচ্ছে।
কোস্টগার্ড আরও বলেছে, তাইওয়ানের পূর্ব উপকূল সামুদ্রিক যোগাযোগ ও পণ্য সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে চীনের তৎপরতা অব্যাহত থাকলে দ্বীপটির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়তে পারে।
তাইওয়ানের কর্মকর্তাদের ধারণা, সামরিক, আধাসামরিক ও বেসামরিক বিভিন্ন উপকরণ একসঙ্গে ব্যবহার করে সম্ভাব্য সামুদ্রিক অবরোধের প্রস্তুতি নিচ্ছে চীন।
চীন স্বশাসিত তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে আসছে। এ লক্ষ্য অর্জনে প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগের সম্ভাবনাও নাকচ করেনি বেইজিং। তবে তাইওয়ান সরকার চীনের এ দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, দ্বীপটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার একমাত্র সেখানকার জনগণের।
অন্যদিকে চীনের দাবি, তাইওয়ানের পূর্ব উপকূলে তাদের কার্যক্রম বৈধ ও আইনসম্মত, কারণ ওই এলাকা তাদের জলসীমার অন্তর্ভুক্ত। তবে চীনের এ অবস্থান বরাবরই প্রত্যাখ্যান করে আসছে তাইওয়ান।
সন্দেহভাজন নৌযানের ওপর নজরদারি
তাইওয়ানের কোস্টগার্ড জানিয়েছে, ‘মিনফুদিংইউ ০৭৯০২’ নামের নৌযানটিকে বিশেষ নজরদারির তালিকায় রাখা হয়েছে। নৌযানটির কার্যক্রমে চীনের সামুদ্রিক মিলিশিয়ার বৈশিষ্ট্য রয়েছে বলে মনে করছে সংস্থাটি। এর গতিবিধি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হবে।
১৯৫০-এর দশক থেকে চীন মাছ ধরার নৌযানকে সামুদ্রিক মিলিশিয়ার কাজে ব্যবহার করে আসছে। এসব নৌযানে প্রশিক্ষিত ও রাষ্ট্রীয় সহায়তাপ্রাপ্ত কর্মীরা থাকেন। দক্ষিণ চীন সাগরের বিরোধপূর্ণ এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে তাঁরা প্রায়ই চীনের কোস্টগার্ডের জাহাজের সঙ্গে কাজ করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, বেসামরিক নৌযানের উপস্থিতি কাজে লাগিয়ে সামুদ্রিক বিরোধপূর্ণ এলাকায় নিজেদের দাবিকে শক্তিশালী করার সুযোগ পায় বেইজিং।
রয়টার্সের পর্যালোচনা করা নজরদারি প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে তাইওয়ানের অ্যাপেক্স এভিয়েশন। একটি নজরদারি উড়োজাহাজ থেকে পাওয়া রাডারের ছবি, অবলোহিত চিত্র এবং স্বয়ংক্রিয় জাহাজ শনাক্তকরণ ব্যবস্থার তথ্য ব্যবহার করে নৌযানগুলোর অবস্থান ও তাদের সমন্বিত চলাচলের বিষয়টি নথিভুক্ত করা হয়।
এ বিষয়ে রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধে চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এবং ফিলিপাইনের প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেয়নি। জাপানের কোস্টগার্ডও তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি।
সূত্র : রয়টার্স
সময়ের আলো/ইউএমএইচ