এলিনরের জনসমক্ষে প্রায়শ্চিত্তের দৃশ্য। ছবি : বিবিসি১৪৪১ সালের নভেম্বর মাস। ইংল্যান্ডের লন্ডনের ব্যস্ত রাস্তায় এক অভিজাত নারীকে হাতে ভারী মোমবাতি নিয়ে হেঁটে যেতে হচ্ছে। তার পরনে সাধারণ পোশাক, পায়ে জুতা নেই। তাকে যেতে হচ্ছে একের পর এক গির্জায়, জনসমক্ষে প্রায়শ্চিত্ত করতে। পথের দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের কাছে দৃশ্যটি ছিল কৌতূহল ও আলোচনার। অথচ এই নারী কোনো সাধারণ অপরাধী নন। কিছু দিন আগেও তিনি ছিলেন রাজদরবারের অত্যন্ত প্রভাবশালী একজন। তার স্বামী ছিলেন ইংল্যান্ডের সিংহাসনের সম্ভাব্য উত্তরাধিকারী। ভবিষ্যতে তার রানী হওয়ার সম্ভাবনাও ছিল। সূত্র : বিবিসি।
এলিনর কোবহ্যাম, ডাচেস অব গ্লসেস্টার— এই ছিল তার পরিচয়। কিন্তু রাজদরবারের ক্ষমতার সমীকরণ বদলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার নাম জড়িয়ে গেল জাদুবিদ্যা, ধর্মবিরোধিতা ও রাজা হত্যার ষড়যন্ত্রের ঘটনায়। শেষ পর্যন্ত তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগ করতে হয়। একসময় যার সামনে রানী হওয়ার সম্ভাবনা ছিল, জীবনের বাকি সময় তাকে কাটাতে হয়েছে বন্দিদশায়। প্রায় ছয়শ বছর পরও এলিনরের কাহিনি ইতিহাসপ্রেমীদের আকর্ষণ করে। কারণ এটি শুধু মধ্যযুগের জাদুবিদ্যার অভিযোগে অভিযুক্ত এক নারীর গল্প নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে রাজসিংহাসনের উত্তরাধিকার, অভিজাতদের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, নারীর উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দুর্বল করার কৌশল। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন— এলিনর কি সত্যিই জাদুবিদ্যার সাহায্যে রাজাকে হত্যার ষড়যন্ত্র করেছিলেন, নাকি তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের আড়ালে ছিল আরও বড় রাজনৈতিক হিসাব?
যেভাবে রাজদরবারে উত্থান : এলিনরের জন্ম আনুমানিক ১৪০০ সালে, ইংল্যান্ডের একটি অভিজাত পরিবারে। তবে জন্মপরিচয় তাকে সরাসরি রাজপরিবারের ক্ষমতার কেন্দ্রে নিয়ে যায়নি। তার জীবনের মোড় ঘুরে যায় জ্যাকলিন অব হাইনল্টের পরিচারিকা হিসেবে কাজ করার সময়। জ্যাকলিন ছিলেন হামফ্রে, ডিউক অব গ্লসেস্টারের স্ত্রী।
হামফ্রে ছিলেন রাজা পঞ্চম হেনরির ভাই এবং পরবর্তী রাজা ষষ্ঠ হেনরির চাচা। ১৪২২ সালে ষষ্ঠ হেনরি সিংহাসনে বসেন। তখন তিনি শিশু; ফলে রাজ্যের শাসন ও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে অভিজাতদের প্রভাব ছিল ব্যাপক। হামফ্রেও হয়ে ওঠেন রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। তার অবস্থানের কারণে তাকে সিংহাসনের সম্ভাব্য উত্তরাধিকারী হিসেবে বিবেচনা করা হতো। হামফ্রের সঙ্গে জ্যাকলিনের দাম্পত্যের অবসানের পর এলিনরের সঙ্গে তার সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয়। ১৪২৮ সালে তারা বিয়ে করেন। এই বিয়ে এলিনরের সামাজিক অবস্থান পুরোপুরি বদলে দেয়। তিনি হয়ে ওঠেন ডাচেস অব গ্লসেস্টার— রাজদরবারের উচ্চমর্যাদাসম্পন্ন একজন নারী।
রাজা ষষ্ঠ হেনরের তখন কোনো সন্তান ছিল না। তাই তার মৃত্যুর পর হামফ্রের সিংহাসনে বসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। আর হামফ্রে রাজা হলে এলিনরের রানী হওয়ার পথও খুলে যেতে পারত।
রাজার মৃত্যু সম্পর্কে জানতে চাওয়াই কি অপরাধ?
১৪৪১ সালে রাজদরবারে খবর ছড়িয়ে পড়ে, এলিনর নাকি জ্যোতিষী ও কথিত জাদুবিদ্যায় পারদর্শী কয়েকজনের সহায়তায় রাজা ষষ্ঠ হেনরির ভবিষ্যৎ জানার চেষ্টা করেছেন। তাদের মধ্যে ছিলেন রজার বোলিংব্রোক, একজন শিক্ষিত ধর্মযাজক ও জ্যোতিষী এবং মার্জেরি জার্ডেমেইন, যিনি পরিচিত ছিলেন ‘উইচ অব আই’ নামে।
এলিনরের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তিনি জানতে চেয়েছিলেন রাজা কখন মারা যেতে পারেন। কারণ, রাজা মারা গেলে তার স্বামীর সিংহাসনে বসার সম্ভাবনা তৈরি হতো। অভিযোগকারীদের চোখে এই অনুসন্ধান ছিল রাজাকে সরিয়ে ক্ষমতা দখলের পরিকল্পনারই অংশ।
অভিযোগের পরিধি ছিল আরও বিস্তৃত। এলিনরের বিরুদ্ধে জাদুবিদ্যার মাধ্যমে রাজাকে ক্ষতি করার জন্য বিশেষ পানীয় সংগ্রহ, রাজার মৃত্যুর সময় গণনা করতে জ্যোতিষ চক্র তৈরি এবং রাজার আদলে মোমের মূর্তি বানানোর অভিযোগ আনা হয়। বলা হয়, ওই মূর্তির সাহায্যে জাদুবিদ্যার মাধ্যমে রাজার শরীরে প্রাণঘাতী ক্ষতি করার পরিকল্পনা ছিল।
এসব অভিযোগের মধ্যে কোনটি কতটা সত্য ছিল, তা নিয়ে আজও প্রশ্ন রয়েছে। জ্যোতিষীর মাধ্যমে রাজার ভবিষ্যৎ জানার চেষ্টা করা আর তাকে হত্যা করার পরিকল্পনা করা এক বিষয় নয়। কিন্তু মধ্যযুগীয় ইংল্যান্ডের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় পরিবেশে এই দুইয়ের মধ্যকার সীমারেখা দ্রুত মুছে যেতে পেরেছিল।
তবে প্রেম বা সন্তান ধারণের আশায় পানীয় সংগ্রহের অভিযোগ রাজাকে হত্যা করার ষড়যন্ত্রের সঙ্গে একইভাবে দেখা কতটা যুক্তিসংগত, সেটিই পরবর্তী সময়ে বিতর্কের বিষয় হয়ে ওঠে।
সাজানো মামলা, নাকি উচ্চাকাঙ্ক্ষার পরিণতি?
এলিনরের বিরুদ্ধে তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন কার্ডিনাল হেনরি বিউফোর্ট। তিনি ছিলেন হামফ্রের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী। ফলে এই মামলার পেছনে হামফ্রেকে দুর্বল করার উদ্দেশ্য কাজ করেছিল কি না, সেই প্রশ্ন ইতিহাসবিদদের আলোচনায় বারবার ফিরে আসে।
ইংল্যান্ডের মধ্যযুগের ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করা ইতিহাসবিদ ইউয়ান রজারের মতে, এলিনরের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের প্রমাণ নির্ভরযোগ্য ছিল না। তার সন্দেহ, মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য ও স্বীকারোক্তি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে। বিশেষ করে বোলিংব্রোকের স্বীকারোক্তির ওপর অভিযোগের একটি বড় অংশ নির্ভর করেছিল। রজারের মতে, বোলিংব্রোকের ওপর গোপনে নির্যাতন চালানো হয়ে থাকতে পারে, যদিও বিষয়টি নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত নয়।
রজারের ব্যাখ্যা হলো, এলিনরের বিরুদ্ধে মামলাটি তার স্বামীকে আঘাত করার একটি কার্যকর উপায় হয়ে উঠেছিল। হামফ্রের রাজনৈতিক অবস্থান দুর্বল করতে তার স্ত্রীর সুনাম নষ্ট করা প্রয়োজন ছিল। এলিনরের জ্যোতিষচর্চায় আগ্রহ এবং সন্তান ধারণের জন্য বিশেষ পানীয় ব্যবহারের কথা অভিযোগকারীদের হাতে এমন উপাদান তুলে দিয়েছিল, যা দিয়ে তাকে সহজেই সন্দেহের কেন্দ্রে আনা সম্ভব হয়।
অন্যদিকে ঐতিহাসিক ঔপন্যাসিক ফিলিপা গ্রেগরি এলিনরকে কেবল রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের শিকার হিসেবে দেখতে চান না। তার সাম্প্রতিক উপন্যাস রয়্যাল উইচে এলিনরকে দেখানো হয়েছে উচ্চাকাঙ্ক্ষী, বুদ্ধিমান ও নিজের ভাগ্য নিজে গড়ে নিতে আগ্রহী নারী হিসেবে। গ্রেগরির দৃষ্টিতে, এলিনর কেবল অন্যদের পরিকল্পনার শিকার ছিলেন না; নিজের ক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতেও তিনি সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছিলেন।
গ্রেগরি মনে করেন, এলিনরের বিরুদ্ধে অভিযোগের পক্ষে এমন কিছু তথ্য ছিল, যা সে সময় জাদুবিদ্যা হিসেবে বিবেচিত হতো। বোলিংব্রোক তার স্বীকারোক্তি প্রত্যাহার করেননি— এ বিষয়টিকেও তিনি গুরুত্ব দেন। তার মতে, রাজদরবারের এত উচ্চপর্যায়ের একজন নারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে যথেষ্ট বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ ছিল বলেই তারা মনে করে থাকতে পারেন।
এলিনরকে তিন দিন জনসমক্ষে প্রায়শ্চিত্ত করতে বাধ্য করা হয়। ১৩, ১৫ ও ১৭ নভেম্বর, ১৪৪১ সালে তাকে লন্ডনের বিভিন্ন গির্জায় যেতে হয়। হাতে ভারী মোমবাতি নিয়ে জনসমক্ষে এমন প্রায়শ্চিত্ত ছিল তার সামাজিক মর্যাদা ভেঙে দেওয়ার এক প্রকাশ্য আয়োজন।
পরবর্তী সময়ে ল্যাঙ্কাস্টার ও ইয়র্ক রাজবংশের মধ্যে ইংল্যান্ডের সিংহাসন নিয়ে যে দীর্ঘ গৃহযুদ্ধ শুরু হয়, তা ইতিহাসে পরিচিত ‘ওয়ার্স অব দ্য রোজেস’ বা গোলাপের যুদ্ধ নামে। এলিনরের বিচারকে এই যুদ্ধের একমাত্র কারণ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। রাজবংশীয় বিরোধের পেছনে ছিল উত্তরাধিকার, প্রশাসন, সামরিক ব্যর্থতা এবং অভিজাতদের ক্ষমতার প্রতিযোগিতাসহ বহু কারণ। তবে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, হামফ্রের রাজনৈতিক অসম্মান এবং রাজদরবারের ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস সেই বৃহত্তর সংকটেরই অংশ ছিল।
এ কারণেই এলিনরের কাহিনি কেবল এক নারীর ব্যক্তিগত পতনের ইতিহাস নয়। এটি এমন এক সময়ের দলিল, যখন রাজাকে ঘিরে ভবিষ্যৎ গণনা করা, জ্যোতিষচর্চা কিংবা নিষিদ্ধ আচার-অনুষ্ঠানের অভিযোগও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রশ্নে পরিণত হতে পারত। আর অভিযোগের কেন্দ্রে থাকা ব্যক্তি যদি রাজসিংহাসনের সম্ভাব্য উত্তরাধিকারীর স্ত্রী হন, তা হলে সেই অভিযোগের রাজনৈতিক প্রভাব আরও বহুগুণ বেড়ে যেত।
ছয় শতাব্দী পর ফিলিপা গ্রেগরির রয়্যাল উইচ উপন্যাস এলিনরকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে। সেখানে তিনি এমন এক নারী, যিনি নিজের ভাগ্য নিজেই গড়তে চান এবং ক্ষমতার জন্য ঝুঁকি নিতেও পিছপা হন না। কিন্তু ইতিহাসের এলিনরকে একক কোনো পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করা কঠিন। তিনি কি সত্যিই রাজাকে হত্যার ষড়যন্ত্র করেছিলেন, নাকি তার ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষাকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছিল— এ প্রশ্নের নির্ভুল উত্তর আজও অজানা।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/কেএইচও